আবুবকর খান ভাসানীর ৮ম মৃত্যুবার্ষিকী

মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর কনিষ্ঠ পূত্র আবুবকর খান ভাসানীর ৮ম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০১২ সালের এই দিনে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন।

আবুবকর খান ভাসানী ১৯৪৭ সালের ২৪ এপ্রিল আসামের ধুবড়ী জেলার দক্ষিণ শালমারা থানা, আমতলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

তিনি ছিলেন মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী ও হামিদা খানম ভাসানীর কণিষ্ঠ পূত্র।

‘শোষণকে নির্মূল করে দাও, দারিদ্র্যকে শেষ করে দাও, তাহলেই আমার সংগ্রাম ফুরাবে’ বলে উপনিবেশপীড়িত উপমহাদেশের মাটিতে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। আমাদের জাতীয় রাজনীতির প্রথম এবং শেষ প্রমিথিউস। তাঁরই কনিষ্ঠ পুত্র আবুবকর খান ভাসানী গত ১৮ সেপ্টেম্বর (২০১২) মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কিছুটা যেন অভিমান নিয়েই, কাউকে কিছু না বলে নীরবে-নিভৃতে চলে যান।

মেট্রিকুলেশন টাঙ্গাইলের জাহ্নবী স্কুল থেকে। তারপর কুড়িগ্রাম সরকারী কলেজ হয়ে রংপুরের ঐতিহ্যবাহী কারমাইকেল কলেজে ভর্তি হন ১৯৬৩-৬৪ সালে। এখান থেকেই তিনি বি.এ. পাশ করেন।

কলেজ জীবন থেকেই রাজনীতির হাতেখড়ি ছাত্র ইউনিয়নের হাত ধরে। পরে ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ) এর উত্তরাঞ্চলের কর্ণধার হয়ে ওঠেন তিনি। পাশাপাশি বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে তাঁর নেতৃত্বে গড়ে তোলেন শক্তিশালী কৃষক সংগঠন।

১৯৬৫ সালের ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারী অনুষ্ঠিত ভুরুঙ্গামারীর ঐতিহাসিক কৃষক সম্মেলনের তিনি সক্রীয় কর্মী ও সংগঠক ছিলেন।

‘৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান এবং ‘৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ শেষে স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি ভাসানীর রাজনৈতিক আদর্শ প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করেন। স্বপ্ন দেখতে থাকেন কৃষি বিপ্লবের মাধ্যমে সাধারণ কৃষক-মেহনতি মানুষের মুখে হাসি ফোটাবার। হয়ে ওঠেন পুরদস্তুর একজন রাজনীতিবিদ।

এই সময়ে কুড়িগ্রাম জেলার ভুরুঙ্গামারী উপজেলায় ভাসানী নগর গ্রামে গড়ে তোলেন মাতা হামিদা খানম ভাসানীর নামে জুনিয়র স্কুল। এখানেই তিনি শিক্ষকতা দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন।

১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর পিতা মওলানা ভাসানীর মৃত্যুর পর তিনি তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী সুফী জীবনযাপনের দিকে ঝুঁকে পরেন। ক্রমে তাঁর লক্ষ লক্ষ ভক্ত, মুরীদান, অনুসারীর একান্ত অবিভাবক হয়ে ওঠেন তিনি। হয়ে ওঠেন আধ্যাত্মিক জগতের বাসিন্দা। বেছে নেন লুঙ্গি, পাঞ্জাবি আর বেতের টুপির অনাড়ম্বর জীবনযাপন। বাকি জীবন তিনি এভাবেই কাটিয়েছেন।

টাঙ্গাইলের চরাঞ্চলে “চোরমারা আন্দোলন” করে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন তিনি। পরবর্তীতে এই চরাঞ্চলেই তিনি গড়ে তোলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী প্রাথমিক বিদ্যালয়, মওলানা ভাসানী মাদ্রাসা, দরবার শরীফ, মসজিদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।

১৯৭৯ সালে তিনি টাঙ্গাইল জেলা ঠিকাদার মজদুর সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৩ সালে টাঙ্গাইলে গড়ে তোলেন বাংলাদেশ কৃষক মুক্তি আন্দোলন। ২০০২ সালে তিনি মওলানা ভাসানীর পক্ষে মরনোত্তর ২১শে পদক গ্রহণ অনুষ্ঠানে খোদা-ই-খেদমতগার পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে রবুবিয়্যাত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরুর ঘোষণা দেন। এভাবেই তিনি জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত কৃষক শ্রমিক সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার আদায়ের কর্মী হিসেবে নিজেকে সক্রিয় রেখেছিলেন।

২০১২ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন।

এক

টাঙ্গাইলের সন্তোষে মওলানা ভাসানীর মাজার মসজিদ থেকে তখন প্রচারিত হচ্ছিল মাগরিবের আজান। সেই সময় মাজারের পূর্ব প্রান্তে নিজের কুটির থেকে জীবনের সঙ্গে সব লেনদেন চুকিয়ে আবুবকর খান ভাসানী পাখা মেললেন অনন্তের দিকে। যে অনন্ত থেকে কেউ কখনও ফিরে আসে না।

জীবনের সঙ্গে তার সম্পর্ক মাত্র ৬৭ বছরের। পিজি হাসপাতালের (এখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয়) ডাক্তারদের ভুল চিকিৎসার কারণে ২০০৩ থেকে ভুগছিলেন অসুস্থতায়। মৃত্যুর এক মাস আগের থেকে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল খাওয়া-দাওয়া ও কথা বলা। পরিবারের সবাই জানতো কী ঘটতে যাচ্ছে। জানতো না শুধু বাংলাদেশের মানুষ। কারণ তাদের জানার উপায়ও ছিল না।

কর্ণপটাহ বিদারণকারী রাজনৈতিক ডামাডোল তাদের শ্রবণশক্তিকে করে রেখেছে অস্থির। দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা করেছে বেঁচে থাকার জন্য উদ্বাহু সংগ্রাম। এর পাশে গুম, খুন, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, অবিচার, মিথ্যাচার, প্রতিকারহীন শক্তির দম্ভ, জুলুম, নির্যাতন, অন্যায় ও অনৈতিকতা চলার পথকে করে রেখেছে কণ্টকাকীর্ণ। ভরসা শুধু গণমাধ্যম। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, এখনকার অপগ ভূঁইফোড় গণমাধ্যম তো আবুবকর খান ভাসানীকে চিনেই না।

তারা তো জানেও না যে আবুবকর ভাসানী শুধু যে মওলানা ভাসানীর ছেলে ছিলেন তা-ই নয়, তিনি ন্যাপ ও কৃষক সমিতির একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ও নেতা হিসেবে ষাটের দশকে কুড়িগ্রাম জেলার প্রতিটি থানার প্রতিটি গ্রামে গড়ে তুলেছিলেন শক্তিশালী কৃষক সংগঠন। ঐক্যবদ্ধ কৃষকদের জড়ো করেছিলেন কৃষক সমিতির পতাকাতলে। সমাজতন্ত্রকে পৌঁছে দিয়েছিলেন কৃষকের ঘরে ঘরে। কৃষক নেতা কেতাবউল্লাহ এবং মহিউদ্দীন মাস্টারের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পটভূমি নির্মাণ করেছিলেন গণআন্দোলনের। ভুরুঙ্গামারী কিংবা রৌমারী থানার প্রতিজন মানুষ, প্রতিটি পথ সাক্ষী দেবে তার অপরিসীম আত্মত্যাগ ও আদর্শবাদিতার। ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধেও তিনি রেখেছেন উল্লেখযোগ্য অবদান।

১৯৭১ সালের পর শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সীমাহীন লুণ্ঠন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে নির্বিচার হত্যাকা , জাসদের ইনুদের শেখ মুজিব উৎখাত এবং তথাকথিত বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে উদীয়মান তরুণ সমাজকে রক্ষীবাহিনীর হৃদয়হীন বুলেটের মুখে ঠেলে দেয়ার ষড়যন্ত্র তাকে হতাশ করেছিল। একই সঙ্গে কাজী জাফর ও মেননদের ভূমিকাকেও তিনি সমর্থন করতে পারেননি। ফলে পর্যায়ক্রমে রাজনীতি থেকে সরে আসতে থাকেন তিনি।

১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর তার মহান পিতার মৃত্যুর পর তিনি পুরোপুরি ঝুঁকে পড়েন ধর্মের দিকে। রাজনীতিক মওলানা ভাসানী নয়, তিনি অভিভাবক হয়ে ওঠেন ধর্মীয় নেতা পীর মওলানা ভাসানীর লাখ লাখ অনুসারীর। তাঁর মুরিদদের। ধর্মপীর মওলানা ভাসানীর মিশনকে সমুন্নত রাখা এবং তাঁর কাজকে এগিয়ে নেয়ার জন্যই তিনি ঢেলে দেন মনপ্রাণ। হয়ে ওঠেন আধ্যাত্মিক নেতা এবং মওলানার ধর্মীয় উত্তরাধিকারী।

সেই মানুষটির চলে যাওয়ার খবর আমি প্রথমে পাই মহেশখালী দ্বীপ থেকে আমার ‘বনবাসী’ বন্ধু মাহমুদুল হোসাইনের কাছ থেকে। আর সত্যতা নিশ্চিত করেন ভুরুঙ্গামারী থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহীন শিকদার। দেশের দু’প্রান্ত থেকে প্রাপ্ত খবরটি ব্যক্তিগতভাবে আমাকে শোকাতুর করে তোলে। এই শোক শুধু এই কারণে নয় যে, তিনি মওলানা ভাসানীর ছেলে। আসলে তার রাজনৈতিক জীবনের একজন সামান্য সঙ্গী হিসেবে, পারিবারিকভাবে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তার এই চলে যাওয়া বুকে বেজেছে।

রাতেই চ্যানেলগুলোতে রিমোট টিপে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। পরদিন তন্ন তন্ন খুঁজলাম দেশের প্রধান প্রধান দৈনিকগুলো। আমি অবাক হয়ে দেখলাম কোথাও তার মৃত্যু সংবাদটি ছাপা হয়নি। ব্যতিক্রম শুধু দৈনিক ‘নয়া দিগন্ত’। তারা ১৫ নম্বর পাতায় সংক্ষিপ্ত কলেবরে ছবিসহ ছেপেছে খবরটি। চ্যানেলগুলোর মধ্যে বাংলা ভিশন দেখলাম স্ক্রলে দেখালো কয়েকবার। ব্যস।

গণমাধ্যমকে দোষ দিয়েই বা কী হবে? তারা জানে খবরের মূল লক্ষ্য এখন নেতিবাচকতাকে উপস্থাপন করা। দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ, কালো টাকার মালিক, ব্যাংক ডাকাত, জালিয়াত, প্রতারক, ভূমিদস্যুরাই এখন ‘হিরো’। আর তাছাড়া বাংলাদেশের রাজনীতির মেরুকরণে যেসব পরিবার অগ্রগণ্য, তাদের কারও মধ্যেই আবুবকর খান ভাসানী পড়েন না।

দুই.

আবুবকর খান ভাসানী সম্পর্কে আরও কিছু জানতে একটু পেছনের দিকে ফিরতে হবে।

বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে জমিদারবিরোধী আন্দোলনের কারণে প্রথমে ময়মনসিংহ থেকে, পরে বাংলা থেকে বহিষ্কার হন মওলানা ভাসানী। মওলানা ভাসানীর সঙ্গে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন আরও কয়েকজন কৃষক নেতা, যারা ছিলেন আসলে মওলানার দক্ষিণ হস্ত। এই কৃষক নেতাদের একজন ছিলেন আমার পিতামহ নাজিম উদ্দীন শিকদার। টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থানার বেগম দুল্লা, নীলজা কিংবা কুচতারা গ্রামের প্রবীণদের হয়তো এখনও মনে আছে এই বিস্মৃত কৃষক নেতার নাম।

এরা মওলানার নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় প্রথমে আসামের ভাষানচরে, পরে খাঘমারীতে এবং তিনডুবিতে গড়ে তোলেন আবাস। এদেরই পরিচালনায় আসামের পতিত জমিতে গড়ে উঠতে থাকে বাঙালিদের বসতবাড়ি। এই বাঙালিরা আসামের গোয়ালপাড়া, কাছাড়, নওগাঁ, দরং, শিলচর, ধুবড়ি, কোকরাঝাড়, বঙ্গাইগাঁও, শালমারা প্রভৃতি বিরান অঞ্চলকে শস্য ও সুষমায় ভরে তুলতে থাকেন। এই বাঙালিদের প্রতিরোধে আসাম সরকার ১৯২৪ সলে জারি করে কুখ্যাত ‘লাইন প্রথা’। যে লাইন প্রথার পথ ধরে শুরু হয় ‘বাঙাল খেদাও’ অভিযান।

এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে মওলানা রুখে দাঁড়ান। দরিদ্র কৃষক প্রজাদের সংগঠিত করে গড়ে তোলেন দুর্বার আন্দোলন। কংগ্রেস এই আন্দোলনে সায় না দিলে ১৯৩০ সালে তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করে মুসলিম লীগে যোগ দেন। মওলানার নেতৃত্বে আসাম মুসলিম লীগ অতি দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯৩৭ সালে স্যার শাদুল্লাহর নেতৃত্বে আসামে গঠিত হয় মুসলিম লীগ সরকার। স্যার শাদুল্লাহ লাইন প্রথা বিলোপ করে বাঙাল খেদাও অভিযান বন্ধ করতে অস্বীকার করলে বিরোধ বাধে সেখানেও।

১৯৪৭ সালের ৩ ও ৪ মার্চ আসাম বেঙ্গল মুজাহিদ ও সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করেন মওলানা। এরপরই কারারুদ্ধ হন তিনি। মওলানা যখন কারান্তরালে, সেই সময় জন্ম নেয় পাকিস্তান।

মওলানা ভাসানী বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকেই আসামের তিনডুবিতে প্রতিষ্ঠা করেন একটি স্কুল। এই স্কুলের প্রথম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন আমার পিতা ওয়াজেদ আলী শিকদার। শিক্ষক মাত্র ২ জন। একজন মওলানা ভাসানী, অন্যজন ময়মনসিংহ থেকে আগত এক মাদ্রাসার ছাত্র।

প্রথমদিকে এই স্কুলের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ঘর ছিল না। কারো বাড়িতে কিংবা কারো গোয়ালঘর ঝাড়-পোচ করে কাজ চলতো স্কুলের। রাতে থাকার ব্যবস্থাও হতো গোয়ালঘরের এক কোণে। এমনি এক গোয়ালঘরে মওলানার সঙ্গে রাত্রিবাস করতেন আমার মরহুম পিতাসহ আরও কয়েকজন ছাত্র।

পরবর্তীকালে মওলানা তার দফতর সরিয়ে আনেন ভাসানচরে। ভাসানচর থেকে ব্রহ্মপুত্র পাড়ি দিয়ে মূল আস্তানা গড়ে তোলেন ঘাঘমারীতে। ঘাঘমারীর ঝাড়-জঙ্গল কেটে মওলানার অনুসারীরা এখানে একে একে প্রতিষ্ঠা করেন স্কুল, কলেজ, দাতব্য চিকিৎ্সালয়, উইভিং কলেজ, মাদ্রাসা, পশু হাসপাতাল।

কয়েক বছরের মধ্যে পাল্টে যায় ঘাঘমারীর চেহারা ও গুরুত্ব। পরে আমার পিতামহসহ অন্যদের প্রচেষ্টায় মওলানার নামে নামকরণ করা হয় জায়গাটির। ঘাঘমারী হয়ে ওঠে হামিদাবাদ। ১৯৭১ সালে ওই হামিদাবাদ দেখার সুযোগ হয়েছিল এই লেখকের।

এসময় মওলানার মাথায় আসে, আসামে তিনি কৃষি বিপ্লব করবেন। এজন্যই বাছাই করা কিছু ছাত্রকে পাঠান জোড়হাট কৃষি কলেজে পড়তে। কৃষি কলেজের এই ছাত্রদের মধ্যে একমাত্র মুসলমান ছাত্র ছিলেন আমার পিতা।

আরও একটা বিষয় উল্লেখ করতে হয়। হিজরতের পর মদিনায় রাসুলে খোদা আনসার ও মুহাজিদদের মধ্যে প্রীতির সম্পর্ক বাড়াতে যা যা করেছিলেন, আসামেও সেই কৌশল প্রয়োগ করেন ভাসানী। এই কৌশলের কারণেই অহমিয়া মুসলমান ও বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের দিকে নজর দেন তিনি। এক্ষেত্রে নিজের সংগঠনের নেতাদেরই প্রথমে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

এভাবেই আমার পিতামহ ও মাতামহ কাছাকাছি চলে আসেন। এই দুই কৃষক নেতার ছেলে-মেয়েদের মধ্যে স্থাপিত হয় বৈবাহিক সম্পর্ক। মওলানা ভাসানী নিজে আমার বাবা-মার বিয়ে পড়িয়েছিলেন। তাছাড়া আমার মা হালিমা খাতুন ছিলেন মওলানার অত্যন্ত আদরের। এই বিয়ে পড়ানো নিয়ে আমার মায়ের মধ্যে সবসময়ই একটা গর্ব ও কৃতজ্ঞতা দেখেছি আমি।

আমার পিতামহের মৃত্যুর পর আমাদের পরিবারের হাল ধরেন বড় চাচা হাজী সেফাতউল্লাহ শিকদার। তিনি সে সময় আসাম মুসলিম লীগের বড়সড় নেতা। পৈতৃক সূত্রেই তিনি ছিলেন মওলানার খুবই ঘনিষ্ঠ এবং স্নেহধন্য।

১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তানের জন্ম হলে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। মওলানার নির্দেশে আমার বড় চাচা হাজী সেফাতউল্লাহ শিকদার মওলানার পরিবার-পরিজনকে নিরাপদে রাখার জন্য তাদের নিয়ে আসেন রংপুর জেলার (এখন কুড়িগ্রাম) ভুরুঙ্গামারীতে।

আলেমা খাতুন ভাসানীসহ অন্যরা টাঙ্গাইল চলে গেলেও মওলানার দ্বিতীয় স্ত্রী হামিদা খানম ভুরুঙ্গামারীতেই থাকার নির্দেশ পান ভাসানীর কাছ থেকে।

ভুরুঙ্গামারীতে আমাদের কারোরই কোন থাকার বাড়ি ছিল না। বড় চাচার উদ্যোগে দ্রুত গড়ে তোলা হয় বাসস্থান। অভিভাবক না থাকা এবং নিরাপত্তার কারণে এ সময় হামিদা খানম ভাসানী (পীর মা হিসেবে ভুরুঙ্গামারীতে খ্যাত) ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে আবুবকর খান ভাসানী, আনোয়ারা খানম এবং মনোয়ারা খানমসহ একই বাড়িতে অবস্থান নেন। এরপর দীর্ঘ সময় এই দুটি পরিবার এক পরিবার হিসেবেই থেকে যায়। মওলানা ভাসানী পাকিস্তানে চলে আসার পর এ ব্যবস্থাকে অনুমোদন করেন। অনেক পরে মুরিদ ও অনুসারীরা ভুরুঙ্গামারীতে ভাসানীর পরিবারের জন্য আলাদা বাড়ি নির্মাণ করে দেয়। আমার বড় চাচাসহ আমার পিতা ওয়াজেদ আলী শিকদার, বোরহান উদ্দিন ফকির, আবুল হাশেম মিয়া, আনসার আলী মধু ফকির, বাহার উদ্দিন খান, হাজী ওয়াল উদ্দিন, আবু সাঈদ মাস্টার প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তির চেষ্টায় বেশকিছু জমি-জমারও ব্যবস্থা হয়।

ভাসানীর সেই বাড়িটি আজও মাথা উঁচু করে আছে। এখানে আবুবকর খান ভাসানীর চেষ্টায় পরবর্তীকালে গড়ে উঠে মুসাফিরখানা, মসজিদ, হামিদা খানম হাই স্কুল, প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং মওলানা ভাসানী স্মৃতি সেবা সংঘ।

আমার জন্ম হয় ১৯৫৭ সালে। দুধকুমার নদীর কিনারে শাপলা ফোটা বিল শৈলধুবড়ির পাশে আনন্দ ও মমতার রেণু জড়ানো একটি চমৎকার যৌথ পরিবারে। আমার শৈশব কেটেছে আনোয়ারা খানম, মনোয়ারা খানম ও আমার বোনদের কোলে কোলে। আনোয়ারা খানম ভাসানীর অত্যধিক আদরে আমি তার ‘নেওটা’ হয়ে গিয়েছিলাম। রূপকথার গল্প শোনাতে শোনাতে তিনি আমাকে ঘুম পাড়াতেন।

আনোয়ারা খানম ভাসানী ছিলেন আমার ‘আনু ফুপু’। দশ-এগার বছর বয়স পর্যন্ত আমি কোনোদিন বুঝতেই পারিনি যে আনোয়ারা ফুপু, মনোয়ারা ফুপু এবং আবুবকর চাচা আমাদের আপন ফুপু বা চাচা নন। এতটাই নিবিড় আন্তরিক ছিল আমাদের বাড়ির পরিবেশ। আমার চাচাতো ভাই-বোনরাও ছিল একই রকম স্নেহময়। গ্রামবাসীও। দু’এক বছর পর পর যখন মওলানা ভাসানী ভুরুঙ্গামারী আসতেন তখন আদর আপ্যায়নের বান ডাকতো গ্রামে। আমার মা ও রহিমা খালার ছিট রুটি আর গোস্তের ভুনা ছিল ভাসানীর প্রিয় খাবার।

তিন

সেই ষাটের দশকের প্রথমার্ধে ভুরুঙ্গামারীর মতো ছোট্ট একটি প্রান্তিক থানা শহর থেকে জয়নাল আবেদীন ভা ারী নামে সাহিত্য অন্তঃপ্রাণ একজন মানুষ ‘বার্তাবহ’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করতেন। তার নিজের হস্তচালিত ‘ভা ারী প্রিন্টিং প্রেস’ থেকে ছাপা হতো এই সাহিত্য পত্রিকা। এই পত্রিকার উদ্যোগে প্রতি মাসে একবার বসতো সাহিত্য আসর। আমার মেজো ভাই আবদুল হাকিম শিকদার ও আবুবকর খান ভাসানী ছিলেন এই পত্রিকার নিয়মিত লেখক ও সাহিত্য অনুষ্ঠানের সদস্য। আমার লেখা-লেখির হাতে খড়ি যদিও আমার পিতার হাতে, তবে আবুবকর ভাসানী ও মেজো ভাই ছিলেন উৎসাহদাতা। এদের উদ্যোগেই ‘বার্তাবহ’ পত্রিকায় প্রথম ছড়া ছাপা হয় আমার। আমি যখন সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র, সে সময় এই আবুবকর চাচাই আমাকে প্রথমবারের মতো নিয়ে যান বার্তাবহ আয়োজিত সাহিত্য অনুষ্ঠানে। সেখানে আমি একটি গল্প পড়েছিলাম। যথেষ্ট পিঠ চাপড়ানি জুটেছিল আমার। জয়নাল আবেদীন ভা ারী আদর করে আসার কপালে চুমু খেয়েছিলেন।

আমার লেখালেখির জীবনের সেই ঊষালগ্নে ভুরুঙ্গামারীর অন্যান্য মানুষের মতো আমিও জানতাম আবুবকর চাচা এবং মেজো ভাই একদিন অনেক বড় লেখক কবি হবেন। তারাই ছিলেন আমার মডেল। দুর্ভাগ্যের বিষয় এই দুটি মডেলই পরে রাজনৈতিক কারণে ঝরে যায়। আমি কেমন করে যেন রয়ে গেলাম লেখালেখিতে।

সমাজতন্ত্র, কম্যুনিজম বিশেষ করে মার্কসবাদ, লেনিনবাদ ও মাও সে তুঙের চিন্তাধারার সঙ্গে আমার পরিচয়ও ঘটে আবু বকর খান ভাসানীর মাধ্যমে। আমার মতো অনেক তরুণ সে সময় সমাজ বিপ্লব ঘটানোর জন্য তার হাতে প্রশিক্ষিত হয়েছিল। গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে তিনি তরুণদের মার্কসবাদ শেখাতেন। জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন।

চার.

আবুবকর খান ভাসানীর সঙ্গে শেষ চাক্ষুষ সাক্ষাত্ হয় ২০০২ সালে আমার মীরপুরের ঝুপড়িতে। তিনি মওলানা ভাসানীর পক্ষ থেকে স্বাধীনতার পদক গ্রহণ করতে এসেছিলেন। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ের বিবর্তনে ততদিনে পুরোদস্তুর পরিণত হয়েছেন ‘পীর’-এ। খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলাম, চাচা আপনার এই পরিবর্তনের কারণ কী?

হাসতে হাসতে বললেন, কোনোই পরিবর্তন হয়নি। মওলানা ভাসানীর জীবন দর্শনের মূল কেন্দ্রেই ছিল হক্কুল এবাদ। রবুবিয়াত কায়েম। এই লক্ষ্যেই তিনি চালিয়ে গেছেন তার সংগ্রাম। আমি তার সেই সংগ্রামের একজন সামান্য সৈনিক। তাছাড়া দেশে এখন সবচেয়ে বড় ঘাটতি হয়েছে নৈতিকতার। এই নৈতিক শিক্ষার অনুপস্থিতির কারণে অকল্যাণ ও অমঙ্গলে ছেয়ে গেছে আমাদের জীবন। এই দূষিত মেঘ আকাশ থেকে সরানোর জন্যই আমি মানুষকে ভেতর থেকে আত্মিকভাবে সমৃদ্ধ করার উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। ধর্মকে বাদ দিয়ে এদেশে কিছু হবে না। সে কথা মওলানা ভাসানী বলে গেছেন। আমি তারই নির্দেশিত পথে এগিয়ে চলেছি।

পিতার মতো খুবই সাদামাটা জীবনযাপন করে গেছেন আবুবকর খান ভাসানী। কোন কিছু নিয়েই তার আদেখলেপনা ছিল না। ছিল না প্রদর্শনবাদিতা। শেষের দিকে নামাজ, রোজা, জিকির-আজকার এবং বয়ান নিয়েই পড়ে থাকতেন সবসময়।

তার তিন সন্তানের নামও তার অন্তরের ঐতিহ্যপ্রীতি ও সৌন্দর্যই প্রকাশ করে। মওলানা ভাসানীর আদর্শিক নেতা, উপমহাদেশের তিন মহাপুরুষ মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, মওলানা হাসরত মোহানী এবং মওলানা আজাদ সোবহানীর সঙ্গে মিল রেখে তিনি তিন ছেলের নাম রেখেছেন মনিরুজ্জামান খান ভাসানী, হাসরত খান ভাসানী এবং আজাদ খান ভাসানী।

আবুবকর খান ভাসানীর জীবনকথা ও অবদান হয়তো আমাদের মতলববাজ ইতিহাসবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের গবেষণার টেবিলে ঠাঁই পাবে না। হয়তো তার নামে কোনো রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হবে না। আমাদের নেতা-নেত্রীদের সময় কোথায় একটা শোকবাণী পাঠানোর? তাই বলে মিথ্যা হয়ে যাবে না তার সংগ্রাম। তার নাম রয়ে যাবে এদেশের সাধারণ মানুষের ভিড়ে। ধরলা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র আর ধলেশ্বরীর তীরে তীরে। সেইখানে তিনি জেগে থাকবেন মানুষের অন্তরে।

আজ এই মুহূর্তে এই নিভৃতচারী আমার প্রিয় মানুষ আবুবকর খান ভাসানীর স্মৃতির প্রতি জানাচ্ছি গভীর শ্রদ্ধা এবং আমার ব্যক্তিগত কৃতজ্ঞতা।

আবুবকর খান ভাসানীর ৮ম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর মাজার প্রাঙ্গণ, সন্তোষ, টাঙ্গাইলে ‘আবুবকর ভাসানী ফাউন্ডেশন’ এর পক্ষ থেকে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।

(আবদুল হাই শিকদার, ঘাটাইল ডট কম)/-