আজ টাঙ্গাইল হানাদার মুক্ত দিবস

আজ ১১ ডিসেম্বর টাঙ্গাইল মুক্ত দিবস। দিনটি টাঙ্গাইল জেলার ইতিহাসে এক চিরস্মরণীয় দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর কবল থেকে টাঙ্গাইল মুক্ত করে টাঙ্গাইল জেলা সদর গেটে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে। অবশ্য এর আগেই টাঙ্গাইলের অধিকাংশ অঞ্চল বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা মুক্ত করেন। মুক্তিযুদ্ধে টাঙ্গাইলের কাদেরিয়া বাহিনীর সাফল্যের কাহিনী দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

’৭০ এর নির্বাচনের পর পাকিস্তানের সামরিক শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করলে বাংলার মানুষ এক দফার আন্দোলন শুরু করে। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক ও মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর জেলা টাঙ্গাইল রাজনৈতিকভাবে সব সময় দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে অনেকটা সচেতন ভূমিকা পালন করেছে।

এ অবস্থায় ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের পর থেকেই টাঙ্গাইল জেলায় যুবকদের সংগঠিত করে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়। এ কার্যক্রম জেলার প্রবেশপথ মির্জাপুর থেকে মধুপুর পর্যন্ত চলে।

জেনারেল ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করে পাক হানাদার বাহিনী ঢাকায় বিপুল সংখ্যক সৈন্য সমাবেশ ঘটায়। পাক হানাদার বাহিনী ২৫ মার্চের কালরাতে ঢাকায় ইপিআর সদর দপ্তর, পিলখানা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় বর্বরোচিত হামলা করে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায়।

পর দিন ২৬ মার্চ সকালেই উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে এক জরুরি বৈঠকে বসেন সর্বদলীয় নেতৃবৃন্দ। এই বৈঠকে জেলা আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট বদিউজ্জামান খানকে চেয়ারম্যান ও আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীকে আহ্বায়ক করে `স্বাধীন বাংলা গণমুক্তি পরিষদ` গঠন করা হয়।

স্বাধীনতার নয় মাস দেশের ভেতরে থেকে বেসামরিক গেরিলা যোদ্ধা কাদের সিদ্দিকী গড়ে তোলেন ১৭ হাজার নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধা ও ৭০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক দলের বিশাল বাহিনী। টাঙ্গাইল এবং পার্শ্ববর্তী তিন জেলা ঢাকা, ময়মনসিংহ ও পাবনার বিস্তীর্ণ এলাকায় কাদেরিয়া বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা একের পর এক আঘাত হেনে হানাদার বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ছোট আকারে হলেও খন্দকার আবদুল বাতেনের নেতৃত্বে গড়ে উঠে ‘বাতেন বাহিনী’। তারাও অনেক জায়গায় হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। মূলতঃ জেলার দক্ষিণাঞ্চলের নাগরপুর এবং এর আশপাশ এলাকায় এ বাহিনী হানাদারদের প্রতিহত করে।

পাক হানাদার বাহিনী সবচেয়ে টাঙ্গাইল জেলায় বেশি মার খেয়েছে। টাঙ্গাইলের মুক্তিযোদ্ধারা অসংখ্য গেরিলা যুদ্ধসহ বেশ কয়েকটি সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেয় এবং অধিকাংশ যুদ্ধেই তারা সফল হয়। হতাহত করে অসংখ্য হানাদার সেনা ও তাদের দোসরদের। শহীদ হয় অনেক মুক্তিযোদ্ধা।

সম্মুখ যুদ্ধগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মাকড়াই, ধলাপাড়া, কামুটিয়া, বল্লা, ফুলতলা, বাথুলি, পাথরঘাটা ও ঘাটাইলের যুদ্ধ। এছাড়া মাটিকাটা যুদ্ধ বা `জাহাজমারা যুদ্ধ` নামে খ্যাত। এখানে সম্মুখ যুদ্ধে হানাদার বাহিনীর বিপুল পরিমাণ অস্ত্র বহনকারী জাহাজ মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের দখলে নেয়। পরবর্তীতে জানা গেছে দেশের উত্তরাঞ্চলে এসব অস্ত্র পৌঁছাতে পারলে হানাদার বাহিনীর শক্তি আরো বেড়ে যেতো।

এদিকে টাঙ্গাইল মুক্তদিবস উপলক্ষে টাঙ্গাইল পৌরসভা ৬দিন ব্যাপী কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। প্রথমদিন ১১ ডিসেম্বর বুধবার সকালে শহরের শহীদ স্মৃতি পৌর উদ্যানে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন, জাতীয় পতাকা উত্তোলন, শান্তির কপোত ও বেলুন উড়ানো, সূচনা সঙ্গীত ও শোভাযাত্রার আয়োজন করা হবে।

শোভাযাত্রা উদ্বোধন করবেন টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান খান ফারুক। বিকেলে আয়োজন করা হবে আলোচনা সভা ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি থাকবেন কৃষিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক এমপি।

(নিজস্ব প্রতিবেদক, ঘাটাইলডটকম)/-