অসিমের বাড়ী ফেরা

বৃষ্টিস্নাত নিস্তব্ধ রাত। পিচঢালা পথ সোডিয়ামের আলোয় চকচক করছে। অসিমের দুচোখ যেন পিকআপ ভ্যানের কালো চাকায় আটকে গেছে। মাথাটা পলিথিনে মোড়ানো। চাকার ঘূর্ণাবর্তে বৃষ্টির পানি ধূমায়িত হচ্ছে। ছপ ছপ শব্দে জীবনের ভেজা করুণ সুর কানে বাজছে। তখনো ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, মাঝেমধ্যে বইছে দমকা বাতাস।

অসিমের কাছে পালানোর সময়টা রাতই ভালো। কি জীবন থেকে, কি মানুষের কাছ থেকে। তাই সে বউ ও মেয়েকে নিয়ে রাতেই রওনা দিয়েছে।

রাত এখন প্রায় সাড়ে ১১টা। সবে এয়ারপোর্ট পেরিয়েছে। এই যাত্রা শূন্য ও পূর্ণতার মিশ্র এক যাত্রা। গড়ি যাচ্ছে তো যাচ্ছেই।

আট বছর আগের এক ঝোড়ো রাতে এভাবেই সে নৈশকোচে ঢাকায় এসেছিল। তার পকেটে ছিল একটি বেসরকারি চাকরির যোগদানপত্র, আর হাজার দু-এক টাকা। বুকে ছিল রাজ্যের স্বপ্ন। তাই নিয়ে বন্ধুর মেসে উঠেছিল। পরে সেখানকার বোর্ডার। বেতন সাকল্যে ১২ হাজার টাকা।

তিন বছর পর বাড়িতে গেলে মা–বাবার পছন্দ করা মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হলো অসিমের। কন্যা আহামরি কেউ নয়। পাশের জেলার বাবার বন্ধুর মেয়ে। সবে বাংলায় অনার্স শেষ করে এমএতে ভর্তি হয়েছে। সাহিত্যের মেয়ে বলে অসিমেরও অন্য রকম একটা ভালো লাগা কাজ করল।

মাসতিনেক পর জীবনসঙ্গীকে নিয়ে ঢাকায় পাড়ি জমাল অসিম। এবার আর মেসে নয়। বাসা আগেই ঠিক করা ছিল, মিরপুরে। এক রুম, কিচেনসহ আট হাজার টাকা ভাড়া। সৌভাগ্যক্রমে দক্ষিণ দ্বারে একটা ছোট্ট বেলকনি আছে। এটাই এই বাড়ির ঐশ্বর্য বটে। তার ধারে আগুনমুখো কৃষ্ণচূড়াগাছ। ডালপালাগুলো গ্রিল ভেদ করে হুমড়ি খাচ্ছে।

বছর ঘুরতেই কোলজুড়ে তাদের ফুটফুটে এক কন্যাসন্তান জন্ম নিল। এরই মধ্যে টিএডিএসহ অসিমের বেতন বেড়ে হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার টাকা। বেতন কম হলেও চাকরিটা অসিমের মনমতোই। ফলে সে সানন্দে কাজ করে যাচ্ছে। এভাবে টোনাটুনির সংসার ভালোই চলছিল।

অসিম ইংরেজি সাহিত্যে এমএ করেছে। ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখির প্রতি নিমগ্নতা। একসময় স্থানীয় একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় কাজ করেছে। সাহিত্যপাগল অসিম কবি হিসেবে ক্যাম্পাসপ্রিয় হলেও রেজাল্ট তার নামের সঙ্গে খুব একটা যায় না। যাবেই বা কী করে, সব সময় পড়ার টেবিলজুড়ে ছড়ানো ছিটানো থাকত দেশ-বিদেশের সাহিত্যের নানা বই।

পরীক্ষার আগের দিনও তাকে ‘চিলেকোঠার সেপাই’ পড়তে দেখা যায়। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তার প্রিয় লেখক।

হঠাৎ এল করোনাকাল। প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপের দিকে। দেখা দিয়েছে ছাঁটাই–আতঙ্ক। রাত দশ-এগারোটার দিকে বাসায় ফিরে নিজেকে স্যানিটাইজ করে নাওয়া-খাওয়া সেরে মেয়েটাকে আদর করতেও বুকে ভয় জাগে তার।

মেয়ের বয়স এখন প্রায় চার বছর। পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়ংকর হয়ে উঠছে। এরই মধ্যে তার বেতন গেছে কমে। গত মাসে ১৫ হাজার পেয়েছে। এ মাসে কী হবে কে জানে?

অনেক ভেবেচিন্তে সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, গ্রামে ফিরে যাবে। গত মাসেই বাড়িওয়ালাকে বলে রেখেছে সে কথা।

আজ মাসের ৩০ তারিখ। অসিম বেতনটা আগেভাগেই চেয়ে নিয়েছে। এবার ১২ হাজার টাকা। কুড়িগ্রাম পর্যন্ত পিকআপ ভ্যানের ভাড়া ১০ হাজার টাকা। বাসার দারোয়ান মালসামানা গুছিয়ে পিকআপে উঠিয়ে দিয়েছে। তাকে কিছু বকশিশ দিয়ে এবং বাড়িওয়ালাকে রুমের চাবি দিয়ে পিকআপে চড়ে সে। বউ আর ছোট্ট মেয়েকে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসিয়ে নিজে পিকআপের পেছনে মালসামানার মধ্যে টুল পেতে বসেছে।

মেয়েটি বারবার পেছন ফিরে তাকায় আর জিজ্ঞেস করে, ‘বাবা, তুমি ভিজছো কেন?’

—যাতে তোমার খেলনাগুলো ভিজে না যায়।

বাবা আমরা কোথায় যাচ্ছি?

—গ্রামে, তোমার দাদুবাড়িতে।

আর কত দূর? বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়ে মেয়েটা।

সবার মুখে মাস্ক। ছোট্ট মেয়েটি মুখে মাস্ক রাখতে চায় না।

অসিমের মনে পড়ে—ছোটবেলা বাবার সঙ্গে মলন ঘোরানোর সময় গরুর মুখে ঠোনা পরিয়ে দেওয়ার কথা। হালচাষ করার সময়ও গরুর মুখে ঠোনা দিতে হতো। নিশ্চয়ই তখন গরুগুলো এমন লাগত। আজ মাস্ক পরে মানুষের যেমন লাগে।

আচ্ছা, কেন এমন হলো? আমরা বেশি কথা বলি এ জন্য, না প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ করছি, সে জন্য? এটিকে প্রকৃতি পাপও তো বলা যেতে পারে।

ভাবতে ভাবতে প্রায় শেষরাত। পিকআপ এসে থেমেছে রংপুর মডার্ন মোড়ে। তেল নিতে হবে। মডার্ন মোড়ে সুন্দর একটি স্বাধীনতাস্তম্ভ আছে। কিন্তু স্তম্ভটির চেয়ে পেছনের চকচকে বিলবোর্ডটাই যেন বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। হায়রে বহুজাতিক পুঁজি, চকচকে সভ্যতা।

গাড়ি আবার চলতে থাকে। একটু সামনে ক্যাডেট কলেজটা পার হলেই অসিমের মনের বিস্তৃত ক্যানভাসজুড়ে থাকা প্রিয় সেই নস্টালজিক কারমাইকেল কলেজ ক্যাম্পাস। তার মনে উত্তেজনা কাজ করছে। কিন্তু চিরচেনা সেই ক্যাম্পাসটা যেন আর দেখা যাচ্ছে না।

সামনেই নতুন করে নির্মিত হয়েছে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। সেটা আবার নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার নামে। উদ্যোগটি যেকোনো বিবেচনায় প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু স্থান নির্বাচন? একটু প্রচ্ছন্ন দৃষ্টি মেললেই বোঝা যায়—কী শ্রীহীনভাবে ঐতিহ্যবাহী ও শতবর্ষী কারমাইকেল কলেজটাকে আড়াল করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

একদা ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছি। কিন্তু লর্ড ব্যারন কারমাইকেল, যিনি সেই ১৯১৬ সালে অবহেলিত উত্তরের এই জনপদে কলেজটি স্থাপন করেছিলেন। পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য এক আলোর ভুবন গড়ে তুলেছিলেন। কতশত শিক্ষিত আলোকিত মানুষ জন্ম দিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

গাড়ির দুলনিতে অসিমের নিউরোনে অনুরণিত হলো এসব নানা কথা।

তিস্তা সেতু পার হতেই প্রিয় সাহিত্যিক টমাস হার্ডির ‘দ্য রিটার্ন অব দ্য নেটিভ’–এর ক্লাইম ইয়োব্রাইটের কথা মনে পড়ে অসিমের। ভাবে জীবন ও ভাগ্যের দ্বৈরথের কথা। এ–ও ভাবে, হারবে না সে। তার সামনে এখন অবারিত গ্রাম আর স্রোতস্বিনী দুধকুমার নদের হাতছানি।

বাকি জীবন সে দুধকুমার তীরের পৈতৃক ভিটায় কৃষিকাজ করে কাটিয়ে দেবে। আর অভিজ্ঞতা যেটুকু প্রাপ্তি লেখালেখিটা চালিয়ে যাবে।

নতুন স্পৃহায় অসিমের অসীম হৃদয় থেকে রবীন্দ্রনাথ থেকে উচ্চারিত হলো, ‘মনেরে আজ কহ যে/ ভালো মন্দ যাহাই আসুক/ সত্যেরে লও সহজে।’

লেখক: সভাপতি, মাওলানা ভাসানী কৃষক সমিতি, সন্তোষ, টাঙ্গাইল