ঢাকার ৫১ খাল দখল করে গড়ে উঠেছে অট্টালিকা

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরস্থ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিমাংশ হয়ে মাহবুব মোরশেদ সরণী দিয়ে প্রবাহিত কল্যাণপুর ‘চ’ খাল। কাগজে বা মানচিত্রে এ খালের দৈর্ঘ্য এক হাজার ১২০ মিটার। প্রস্থ ১৮ মিটার। দৃশ্যমান মাত্র ৭ মিটার। খালটি দখল করে  অবৈধ স্থাপনা করা হয়েছে  ৬৫০ বর্গমিটার এলাকাজুড়ে। পুরো খালের পানির উপর ময়লা-আবর্জনার স্তর। তাই পানি প্রবাহ বন্ধ। ফলে বৃষ্টি হলেই পুরো এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।
গতকাল পানিতে ডুবে যায় ঢাকা। অসহনীয় দুর্ভোগে রাজধানীবাসী নাকাল। পানি সরার কোনো পথ নেই। দিনভর পানির সঙ্গে একরকম যুদ্ধ করেই চলে জনজীবন।
এ বিষয়ে গতকাল বুধবার কথা হয় ঢাকা সিটি করপোরেশন উত্তরের মেয়র আসিনুল হকের সঙ্গে। তার মতে, পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছাড়া কিভাবে পানি সরবে। তিনি বলেন, ‘রাজউক থেকে কিভাবে অনুমোদন নিয়ে খাল দখল করে সুরম্ম অট্টালিকা করা হয়েছে তা তারাই বলুক। অবৈধ হলে তারা উচ্ছেদ করুক। সিটি করপোরেশন শুধু সমন্বয় বা সহযোগিতা করতে পারে মাত্র’।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বলেন, ‘ঢাকার জন্য জলাবদ্ধতা বড় একটি সমস্যা। আমরা বিভিন্ন খাল উদ্ধারে বিভিন্ন সময় অভিযান করেছি। নন্দীপাড়া খালের ওপর স্থাপিত মার্কেট ভেঙে দিয়েছি। কিন্তু দখল হওয়া কিছু কিছু স্থাপনায় উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা আছে। আমরা আইনিভাবে সেগুলো মোকাবিলার চেষ্টা করছি।’
বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হোসেন গতকাল জানান, রাজধানী ঢাকার আশপাশে মানচিত্র অনুযায়ী ৫১টি খালের অস্থিত্ব পাওয়া যায়। রাজউক, সিটি করপোরেশনের মতে এ সংখ্যা ৪৬টি। ওয়াসার নথিতে ২৬টি খালের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। বাকি সব খাল বিলীন। তবে প্রাকৃতিক কারণে এই বিলীনের ঘটনা ঘটেনি। রাজউক থকে বেআইনী অনুমোদনপত্র নিয়ে খাল ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে অট্টালিকা। ফলে ভারী বা হালকা কিংবা মাঝারি যে ধরনের বৃষ্টিই হোক না কেন সে পানি আর নিষ্কাশন হতে পারছে না। এক কথায় ফুসফুসে আক্রান্ত রাজধানী ঢাকা।
রাজধানীর খিলগাঁও রেলগেট ফ্লাইওভার সংলগ্ন ফার্নিচার দোকানগুলোর সামনে দিয়ে ছিল খিলগাঁও-বাসাবো খাল। দখলমুক্ত রাখতে ঢাকা ওয়াসার একটি নির্দেশনামূলক ফলকও আছে। কিন্তু তার উপর দখলদারিত্ব ফার্নিচারের দোকানের। ফলকটির আশপাশের কোথাও খালের কোনো অস্তিত্ব দেখা যায় না। কয়েক বছর আগে স্থানীয় প্রভাবশালীরা খালটি ভরাট করে বহুতল ভবন গড়ে তুলেছেন। এ খালটি খিলগাঁওয়ের ভেতর দিয়ে বাসাবো হয়ে মা খালের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। ওয়াসার নথিপত্রে খালটির প্রস্থ স্থানভেদে ৫-১০ মিটার।
জলাবদ্ধতার মূলকারণ নিয়ে ঢাকার খালগুলো নিয়ে সম্প্রতি একটি সচিত্র প্রতিবেদন তৈরি করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। এতে দেখা গেছে, ঢাকা মহানগরীতে খালের সংখ্যা ৪৩টি। এর মধ্যে ঢাকা ওয়াসা রক্ষণাবেক্ষণ করে ২৬টি। ৯টি খাল রাস্তা, বক্সকালভার্ট ও ব্রিক স্যুয়ারেজ লাইনে পরিবর্তন করা হয়েছে। বাকি ৮টি খাল রয়েছে জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে। গত ১৬ জুলাই নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ডিএনসিসির আন্তঃবিভাগীয় সমন্বয় সভায় ‘ঢাকায় জলাবদ্ধতার কারণ এবং রাজধানীর খালগুলোর বর্তমান অবস্থা’ নিয়ে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়।
উত্থাপিত প্রতিবেদনে বিদ্যমান খালগুলোর মধ্যে রামচন্দ্রপুর খাল ১০০ ফুটের জায়গায় ৬০ ফুট, মহাখালী খাল ৬০ ফুটের জায়গায় ৩০ ফুট, প্যারিস খাল ২০ ফুটের স্থলে ১০-১২ ফুট, বাইশটেকি খাল ৩০ ফুটের স্থলে ১৮-২০ ফুট, বাউনিয়া খাল ৬০ ফুটের বদলে ৩৫-৪০ ফুট, দ্বিগুণ খাল ২০০ ফুটের বদলে ১৭০ ফুট, আবদুল্লাহপুর খাল ১০০ ফুটের বদলে ৬৫ ফুট, কল্যাণপুর প্রধান খাল ১২০ ফুটের স্থলে স্থানভেদে ৬০ থেকে ৭০ ফুট, কল্যাণপুর ‘ক’ খালের বিশাল অংশ এখন সরু ড্রেন, রূপনগর খাল ৬০ ফুটের স্থলে ২৫ থেকে ৩০ ফুট, কাটাসুর খাল ২০ মিটারের বদলে ১৪ মিটার, ইব্রাহিমপুর খালের কচুক্ষেত সংলগ্ন মাঝামাঝি স্থানে ৩০ ফুটের স্থলে ১৮ ফুট রয়েছে। এসব খালের অধিকাংশ স্থানে প্রভাবশালীরা দখল করে বহুতল ভবন, দোকানপাট ও ময়লা অবর্জনায় ভরাট করে রেখেছে। ফলে খালে পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক জায়গায় বিলীন হয়ে গেছে অস্তিত্ব।
রামচন্দ্রপুর খাল শুরু নবোদয় প্রধান সড়কের ৮ নং রোড থেকে। খালটির এ অংশ থেকে ৬০০ মিটার পর ওয়াসা পাম্প সংলগ্ন অংশে অবৈধ বহুতল স্থাপনা নির্মাণ ও ময়লা আবর্জনার স্তূপ জমে আছে। এ খাল পাড়ের ৩০ ফুট জায়গা ভরাট করে রাস্তা তৈরি করেছে সিটি করপোরেশন। এছাড়া নবোদয় প্রধান সড়কের ১০নং রোডস্থ সুনিবিড় হাউজিং বিশাল অংশ দখল করে স্থাপনা তৈরি করেছে।
ডিএনসিসির ৩৩ ও ৩৪ নং ওয়ার্ডের বিশাল অংশ জুড়ে কাটাসুর খালের অবস্থান। এ খালটির দৈর্ঘ্য এক হাজার ৭১৫ মিটার। বর্তমানে খালের শুরুর অংশে ১৪ মিটার এবং শেষাংশে ২০ মিটার প্রস্থ রয়েছে। ১৫০ বর্গমিটার জুড়ে গড়ে উঠেছে অবৈধ স্থাপনা। তাছাড়া এক হাজার ৫৪৫ মিটার অংশ ময়লা ও আবর্জনায় ভরা। এ খালটির ১৬৫/৫, পুলপার ৬৭/৫ পশ্চিম কাটাসুর, ২৫২/১ বসিলা রোড, বেড়িবাঁধ রোড কালভার্ট, মোহাম্মদপুর হাউজিং, নবোদয় হাউজিং ও ৩ নং রোড কালভার্টের দক্ষিণ পাশে খালের মধ্যে একটি মসজিদ ও একটি গির্জা গড়ে ?উঠেছে।
কসাইবাড়ী খালের অস্তিত্বই নেই। উত্তরার দক্ষিণ আজমপুর থেকে শুরু হয়ে কসাইবাড়ী হয়ে মোল্লারটেক পর্যন্ত বিস্তৃতি ছিল এ খালটির এখন এটি পরিণত হয়েছে ড্রেনে।
কল্যাণপুর ‘খ’ খাল কাগজে-কলমে ৪০ ফুট হলেও অনেক জায়গায় খালের কোনো অস্তিত্ব নেই। কোথাও কোথাও ময়লা আবর্জনা ভরে প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এ খালটির দৈর্ঘ্য দুই দশমিক ৪০ কিলোমিটার।
শীতলক্ষ্যা নদী হতে উত্পন্ন হয়ে ক্রমশ সরু হয়ে ঘোপদক্ষিণ মৌজার পশ্চিমপ্রান্তে বাওয়ানী জুট মিলের ভেতরে গিয়েছিল ঘোপদক্ষিণ খাল। এ খালটির বর্তমানে কোনো অস্তিত্ব নেই। খালটি অধিগ্রহণ করে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় লতিফ বাওয়ানী জুট মিলস তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে জলাবদ্ধতা দূর করতে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য খালের উপর নির্মিত অবৈধ স্থাপনা অপসারণ, প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ, বিলীন হওয়া খাল উদ্ধার,পুনঃখনন ও বর্ষা মৌসুমের আগে খাল পরিষ্কার করতে হবে।
১৬ জুলাইয়ের ওই সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় স্থায়ীয় সরকার মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন ওয়াসা থেকে নিয়ে ঢাকার খালগুলো সিটি করপোরেশনকে দেওয়ার ঘোষণা দেন। তখন ?ডিএনসিসির মেয়র আনিসুল হক বলেছিলেন, ‘আমরা তো খাল নিতে চাই। কিন্তু ওয়াসার খালতো বিকলাঙ্গ রোগী। রোগী ভালো করে বাচ্চা আমাদেরকে দিয়ে  দেন।’
(ঘাটাইল.কম)/-

169total visits,1visits today

Leave a Reply