হোসাইন উচ্ছ্বাসের ছোট গল্প ‘হয়তো দেখা হবে না কথা হবে না’

রাত ১ টা। চাঁদনী রাত। আকাশে চাঁদ ছাড়া একটা তারাও খুঁজে পাচ্ছি না। চোখের সামনে এক বিস্তৃত আকাশ। হাওয়ার ভেলায় ভাসছি। যেন ট্রেন নয়, হাওয়ার ভেলা। ৩ জন বন্ধু মিলে যাচ্ছি। জানালা দিয়ে চাঁদ দেখে, তার সাথে আলিঙ্গন করার ইচ্ছাটা আর লুকাতে পারলাম না। জংশন পড়তেই, ট্রেনের ছাদে একাই এসে শুয়ে শুয়ে, ভাবছি,
__আমি যদি একইভাবে আজীবন চলতে পারতাম।
চাঁদ আর আমার আলিঙ্গন, হাজারো বাতাস আমাদের পাহাড়া দিচ্ছে। আলিঙ্গন যেন ছুটবার নয়, ফুরবার নয়। হটাত করেই চিন্তা করলাম তাকে না জানিয়া যাচ্ছি হয়তো সে কাল ব্যস্তও থাকতে পারে। তাকে চমক দেখাতে চেয়েছিলাম। না থাক ফোন দেই। তাকে ফোন দিলাম।

__ ভাল আছো। তোমাকে খুব মনে পড়তেছে। আমি সকালে তোমার সাথে দেখা করব।

ট্রেনের শব্দেই সে বুঝেছে যে আমি আসতেছি। আধোআধো ঘুম সে বলল –
__ আসো সকালে দেখা হচ্ছে।কোথায় আছো?
__ ভৈরব।
__সাবধানে এসো।

বলে ফোন রেখে দিল। আমি আর কথা এগুলাম না। কারণ তার সাথে আমার গত ৩ দিন কথা হয়নি। ছেলেমানুষি অভিমান তার।

চাঁদের সাথে আরো বেশ ঘন্টাখানিক কাটানোর লোভটা সামলাতে পারলাম না।কিছুক্ষণ পর পাহাড়ি রাস্তা শুরু হলো তাই বাধ্য হয়েই ট্রেনের ভেতরে হলো। কারণ অগণিত গাছ। লেবুগাছ আর চা পাতায় ছেয়ে গেছে দুই পাশ। চা বাগান দেখেই বুঝতে পারলাম সিলেট হয়তো এসেই পড়লাম প্রায়। পাশের সিটের মাঝ বয়সী এর যুবক। তাকেই জিজ্ঞেস করলাম-
__ ভাই সিলেট আর কতো দূর?
কারণ সকাল ৮ টা বাজে। শুনেছি সিলেট যেতে সারা রাতে লাগে। প্রথম যাচ্ছি তো তাই। লোকটা বলল-
__ শ্রীমঙ্গল আছি, ১ ঘন্টা লাগবে।
আমার কাছে এই এক ঘন্টা যেন একযুগ। সময় ৯:১৪ সিলেট স্টেশনে এসে নামলাম। ফোন দিতে সে লাফিয়ে ঘুম থেকে ওঠে আতংকের সাথে বলে –
__ আমি কাল রাতে স্বপ্নে দেখেছি যে তুমি আসতেছো।
সে মনে করেছে মাঝরাতে স্বপ্ন দেখেছে। আমি যে ফোন দিয়েছিলাম সেটা তার কাছে স্বপ্ন ছিল। কারণ আমার প্রিয়দর্শিনীর মাঝে দূরত্ব ছিল ৩১৯ কি.মি.। ইচ্ছা হলেই দেখা করা সম্ভব নয়, আর এর আগে দেখাও হয়নি কোনো দিন। ফেসবুক এ কবিতায় কবিতায় মনে লেনদেন। অনেক টা পথ অজান্তেই পড়িয়ে, জানতে পারি প্রিয়দর্শিনী আর আমার বয়সের পার্থক্য ৮ বছর।অর্থাৎ প্রিয়দর্শিনী আমার থেকে ৮ বছরের বড়। এ যুগে একটা অস্বাভাবিক প্রেম। তাই সে আমাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টাই করত বেশি। তাই তিন দিন যাবত রাগ করে কথা বলে। চলে আসায় তাকে স্বপ্ন মনে করতেছে প্রিয়দর্শিনী। আমি বললাম-
___ তুমি কাল রাতে স্বপ্ন দেখনি। আমি সত্যি এসেছি। আমি এখন স্টেশনে আছি। তুমি আসো দেখা করে চলে যাবো আমি।
___ না। তুমি স্টেশন থেকে সি.এন.জি নিয়ে জিলা স্টেডিয়াম এর সামনে আসো।
হ্যা বোধক উত্তর দিয়ে ৩ বন্ধু মিলে রওনা দিলাম। মিনিট বিশেক পর চলে এলাম। প্রিয়দর্শিনীকে আমি দূর থেকে দেখছি – সে প্রধান ফটকে দাঁড়িয়ে আছে, এক লাজুক নয়নে। আমি ভেবেছিলাম সে আমাকে চিনবে না। কারণ ছবি তার গলার স্বর ছাড়া আমাকে ছোঁয়াতো দূরের কথা, চোখে দেখেও নি কোনো দিন। আমি রাস্তা পার হবার আগেই সে আমাকে ডেকে বসে –
__ ধ্রুব এই ধ্রুব।
রাস্তা পার হয়ে কাছে গেলাম। বন্ধুরা জানে না যে তার সাথে আমার ৮ মাসে প্রেম। বন্ধুদের কাছে পরে ইচ্ছা মতো কথা শুনতে হবে তাও আমি জানি। যাই হোক তাও ভালবাসাকে কাছে পেয়ে বেশ ভালই লাগল। চা, সহ আরো অন্যান্য খাবার খেলাম। সবাই মিলে রওনা হলাম জাফলং এর দিকে।
প্রায় ২ ঘন্টার রাস্তা। দুজনে পাশাপাশি বসে বেশ কথা বার্তা বললাম। আমি তার প্রেমে সাড়া দিয়ে আসব সে ভাবতেও পারে নি। কারণ এর মাঝে ৮ বছরের বিশাল ফারাক।
অনেক ঘুরাঘুরি। ঝরনায় উঠলাম বেয়ে। মেয়ে মানুষ বলে ওকে নিয়ে ওঠি নি। কারণ জামা কাপড় ভিজে যাবে পোশাক বদলানোর ভালো ব্যবস্থা সেখানে নেই। তাই উপরে উঠলাম ৩ বন্ধু। অনেক উপরে, যেখানে কেউ যায় যাবার সাহস পায় না।
নিচে নামতেই এক ধমক দিয়ে বসল।
___ আমার তোমাকে উঠতে দেওয়াই ভুল হয়েছে। এত উপরে উঠেছো কেন? তুমি পরে গেলে আমার কী হতো? বলেই টলমল চোখ..
আমি নিরব হয়ে তাকিয়ে রইলাম প্রিয়দর্শিনীর পায়ের দিকে। বললাম
__ সরি
__ থাক, আর বলতে হবে না।
বলে হাত ধরে বসল আমার, কাধে মাথা রেখে হাটতে লাগল। প্রথম তার স্পর্শ পেলাম। চোখ দিয়ে নিরবেই একফোঁটা জল বয়ে গেল। কিছু ছবিও তুললাম আমরা একসাথে। তারপর আমরা হাত স্টেশনে যাবার আগে মনে হয় ছেড়েছিলাম না।
সকাল গড়িয়ে দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা। তখন সন্ধ্যা পার হয়ে, রাত ৮ টা তাকে আর স্টেশনে নিয়ে এলাম না স্টেশনে সামন থেকে রিকশায় তুলে দিয়ে চলে যাবো স্টেশন। রিকশায় উঠার পর আমি বিদায় নিলাম। জাফলং থেকে আসার পথে তার চোখের জলও পড়েছে আমি চলে যাবো বলে। চলে যাচ্ছি পেছোন ফিরে তাকাচ্ছি না। তাকালেই দুজনে কেঁদে দিব তাই। সে আমাকে পেছন থেকে ডাক দেয়।
__ শোনো।
পিছন ফিরে এলাম। চোখ টলমল। একটা উষ্ণ চুমু দিয়ে বলল-
___ যাও পাখী।
চোখ মুছতে মুছতে চললাম স্টেশনের দিকে। বিনিদ্র রাত কাটিয়ে ট্রেনের সাথে চলে এলাম। আজ আকাশে চাঁদ নেই।
ঢাকা ফিরেও বেশ ভাল প্রেম আমাদের। তারপর কথা গড়ালো বিয়ের দিকে নিজেদের মধ্যেই। আমি এইচ.এস.সি পড়ছি। আর তার স্নাতকোত্তর শেষ হয়ে গেল এই বছরেই। সে আমাকে বলে-
__ ৩ দিন যোগাযোগ বন্ধ থাকার সময়। আমার মা আমার বিয়ের কথা বলছিল।( সে আমাকে বলে আমার জীবনের শেষ ইচ্ছা আমার পছন্দ করা ছেলেকে বিয়ে কর।)আমি মাকে কথা দিয়েছি।
আমি নিরবে কেঁদে দিলাম। আমি আর সেদিন তেমন কথা বললাম না। ভাবলাম ত্রিস্তান আর দেবদাসে মতো আমৃত্যু ভালবেসে যাবো। আমি নিজের সাথে যুদ্ধো করে স্থির করলাম, তার সাথে আমার কথা হচ্ছে–
___ তোমার স্বামী হবে সংসার হবে। সব হবে আমার তো কিচ্ছু হবে। আমাকে একটা সন্তান দেও। আমি তাকে আঁকড়ে ধরে বেচে থাকব।
__ পাগল তুমি এটা কিভাবে সম্ভব। তুমি আমার সাথে কথা বলা কমিয়ে দেও। নতুন করে সব ভাবো আবার।
___ একটা সন্তান দেও। আমি আর কোনো দিন তোমার সামনে আসবো না। ( আমার ধারনা ছিল একটা বাচ্চা নিলেই সে আর আমাকে ছেড়ে যেতে পারবে না।)
ফোন কেটে দিল। আমি জানি, সে কাঁদছে। তাও কথা হচ্ছে আমাদের মাঝে। একদিন সারাদিন সে ফেসবুক এ নেই.। ফোন দিয়ে বলল রাতে।
__ আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে। তুমি আমার ফেইসবুক এ এমন কোনো কমেন্ট না, যাতে আমাকে ছোট হতে হয়।
___ বাহ। আজকাল আমি তোমার ছোট হবার কারণ বুঝি।
___ তার সাথে আমার আংটি বদল হয়ে গিয়েছে। সে আমার ফ্রেন্ডলিস্ট এ আছে।
__ আমি কী? তার ছবি দেখতে পারি।
__ না! দরকার মনে করছি না।
__ আমাকে ভালোবাসো।
__ হ্যা! আমার জীবনের থেকেও বেশি।
__ বিয়ে করবে আমাকে? আমাকে বেশি ভালবাসো না তাকে।
__পরে কথা হবে বলে
ফোন কেটে দিল। অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। আমি তার ফেইসবুক ঘুরে দেখলাম যে কে কে কমেন্ট করে। একজন প্রায় সব পোস্ট এই কমেন্ট করেছে। আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম এটা কে? বলল- ভার্সিটির ছোট ভাই।
মনে অনেক দুঃখ জমে গিয়েছিল। তার ছোট ভাই মনের আনন্দে কমেন্ট করতে পারে, আর আমি তাকে ভালবাসি আমার এতে বাধা।
বুক ভরা কষ্ট নিয়ে। একটা স্টেটাচ দিলাম। আর কতো ছোট ভাই দেখাবে? তাকে ট্যাগ বা ম্যানশন করি নাই।
সে আমাকে ইনবক্স এ একটা মেসেজ দিলো।
____তুমি টোটালি নিচ মেন্টালিটির ছেলে,আমার প্রচন্ড ভুল হইছে তোমার মত একজনকে প্রশ্রয় দেয়া।
সাইকো কোথাকার।

নিরবে কেঁদে ফেললাম। সরি বলতে গিয়ে দেখি ফেইসবুক ব্লক করেছে। ফোন দিতে সে কেটে দিয়ে, মেসেজ করল-
Don’t call me again…never.
তারপর কেয়েকদিন ফোন দিলাম। ধরে না। পালটা কোনো যবাও দেয় না।
নিরবে বই পড়ে পড়ে কেঁদে কেঁদে কাটে সময়। ঝরনা থেকে নামার সময় আমাকে মাথা মুছবার জন্য রুমাল আর একটা কলম দিয়েছিল উপহার দিয়েছিল প্রিয়দর্শিনী । সেটা জড়িয়ে ধরে কাদি। জানি না সে ভাল আছে কি না? আমার কথা ভাবছে কী না? শুধু জানি কাদে সে কাদে। সর্বত্র বিলিয়ে কাদে। তার একটি ফোনের জন্য মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রহর গুণে যাবো। নিজে একজন লেখক হিসেবে, আত্মহত্যার শিক্ষা আমি দিতে পারি না।তাই নিরবে কাদি।
রাত ১ টার চাঁদের মতো আজ আমি একা বড়ই একা। তারা নেই আলো নেই আমি একা, আমি অন্ধকারে হারিয়ে গিয়েছি আজ।বই এর সাথেই হয়তো শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করা হবে। তুমি চলে গেলেও বই আমাকে ছাড়বে না। আমাদের আমৃত্যু বন্ধন।তুমি ভালো থেকে আমি ভাল থাকব। হয়তো দেখা হবে না কথা হবে না। আমৃত্যু কেঁদে কেঁদে জল বিলিয়ে পানিশূন্য এ প্রাণ ছাড়বে দেহ। হয়তো দেখা হবে না. কথা হবে না।
একটা ফোন কল। আদৌ কী পাবো? নাকি
দেখা হবে না না কথা হবে না।

 

(হোসাইন উচ্ছ্বাস…ঘাটাইল.কম)/-

127total visits,1visits today