হাতিয়ায় ভাঙন কবলিত মানুষের আর্তনাদ,

আর কত? আর কতদিন আমরা নদী ভাঙনের শিকার হবো? আর কত লোক পূর্বপুরুষের ভিটে-মাটি হারিয়ে নিঃস্ব হবে? নদী কি এভাবে ভাঙতে থাকবে? আমরা কি এদেশের মানুষ না? আমাদের জন্য কি কেউ নেই? দয়া করে আপনারা আমাদের জন্য কিছু করেন। ভাঙনের এই আর্তচিৎকার হাতিয়ার আকাশে বাতাসে।

হাতিয়ার ‘দুঃখ’ নদীভাঙন। ভাঙন কবলিত মানুষের আর্তনাদ শোনা যায় সুখচর নলচিরা চরঈশ্বর এলাকায়। এ আর্তনাদ ধনী-গরিব সবার। হাতিয়া দ্বীপের ছয় লাখ মানুষের এই আর্তনাদ শোনার যেন কেউ নেই।

হাতিয়ায় নদী ভাঙনের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। HELP-২০০৪ এর সংকলনে ১৭৮৯ সালের দেখানো ম্যাপে এবং তারও পূর্বে সুধারাম থানা ও হাতিয়া থানাকে বিভাজনকারী হাতিয়া প্রণালী হাতিয়া-রামগতি, হাতিয়া-মনপুরার অবস্থান ছিল অনেক কাছাকাছি। সন্দীপ কিছুটা পূর্বদিকে অবস্থিত। কথিত আছে- হাতিয়ার মোরগের ডাক মনপুরা ও রামগতির লোকেরা শুনতে পেত। ১৯১৩ সালের জেলা জরিপ নকশায় হাতিয়ার উত্তরাংশ পূর্ব-পশ্চিমে অনেক বিস্তৃতি ছিল। উজানের স্রোতধারা হাতিয়া দ্বীপকে অনেকটা চোখের আড়ালে দিন দিন দক্ষিণে নিয়ে গেছে। তবে ভাঙনের তীব্রতা বৃদ্ধি পায় মূলতঃ ১৯৫০ দশকের গোড়ার দিকে রামগতির ও লক্ষ্মীপুর সদরের সাথে তোয়াহ্ বাঁধ নির্মাণের কারণে। এ বাঁধটির ফলে মেঘনা হাতিয়ার মানচিত্র আমুল পরিবর্তন করে দিয়েছে।

মেঘনার অবিরাম ভাঙনে নীলক্ষ্মী ইউনিয়ন হাসান-হোসেন, চরবাটা, স্টিমারঘাট এলাকার হাজার হাজার একর ফসলী জমি ও ডুবোচর এবং হরনী চানন্দী ইউনিয়নের সাগরদী হজিমিজির ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ও এর তদসংলগ্ন বিশাল বিশাল চর নদীগর্ভে বিলীন হয়।

নদীর প্রকৃতির নিয়মানুযায়ী এসব এলাকা পরবর্তীতে নোয়াখালীর সুধারাম ও রামগতি ভূখণ্ডের সাথে নতুন চর হিসেবে জেগে উঠে।

হাতিয়া থানা সীমানা নির্ধারণ ও পূনর্বাসন পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, জেগে উঠা চরমজিদ, পূর্বচরমজিদ, দক্ষিণ চরমজিদ, চরবাটা, মধ্য চরবাটা, পশ্চিম উরিরচর, চর বায়োজিদ, চর মোজাম্মেল, কনকগ্রাম মৌজাগুলো হাতিয়ার অংশ হলেও সুধারাম থানার অধীন দিয়ারা জরিপে এবং রামগতি থানার দক্ষিণাংশে জেগে উঠা চর আনিস তাদের অন্তর্ভূক্ত করে নেয়।
এদিকে ১৯৫১ সালে হাতিয়ার পশ্চিমাংশে জেগে উঠা ঢালচর মনপুরার সীমান্ত জটিলতা নিয়ে হাতছাড়ার উপক্রম। তবে পয়স্তিলদ্ধ বয়ার চর, নলের চর, কেরিং চরকে হাতিয়ার ভূমি হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করা গেছে।

১৯৭৫ থেকে ২০০০ সালের সময়ে চরম নদী ভাঙনের শিকার হয় দ্বীপবাসী।

দ্বীপের মাইজচরা, রাধাখালি, চিত্রাখালি, বাথানখালি, চর ভারতসেন, গোডাউন বাজার, সাহেবানী, চৌরঙ্গী, মফিজিয়া, সুখচর নলচিরা পুরান বাজারসহ অনেক চর বিলীন হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষা-সাহিত্য সংস্কৃতি ব্যবসা-বাণিজ্যে সমৃদ্ধ ছিল এসব জনপদ। এসময়টাতে প্রায় ৫০ বর্গ কিলোমিটারেরও বেশি এলাকা বিলীন হয়েছে। শতবছরের নামকরা হাতিয়া মডেল হাই স্কুল, হাতিয়া বালিকা বিদ্যালয়, দ্বীপ সরকারি কলেজ, এএম হাই স্কুল, রহমানিয়া মাদরাসাসহ অনেক প্রতিষ্ঠান, টার্মিনাল ভবন, বৃটিশ স্থাপত্য কোর্ট ভবন, হাতিয়া টাউন ও কারুকার্য্য খচিত হাতিয়া জামে মসজিদ, নামকরা রাজনৈতিক ও ধনাঢ্য বাড়েগুলো সবই এখন ইতিহাস।

নদীভাঙন রোধকল্পে ১৯৯৫ সালে মেঘনা এসচুয়ারি স্ট্যাডি কর্তৃক ৪০০ কোটি টাকার একটি প্রজেক্ট পানি উন্নয়ন বোর্ড সরকারের কাছে প্রস্তাব করলে আলোর মুখ দেখিনি।

অব্যাহত ভাঙনে সুখচর ও নলচিরা ইউনিয়নের সিকি ভাগেরও অস্তিত্ব নেই। যে কারণে ২০০৩ সালের পর এখানে ইউপি নির্বাচন বন্ধ রয়েছে।

এদিকে তমরদ্দি, চরঈশ্বর, সোনাদিয়া ও জাহাজমারা ইউনিয়নের মোক্তারিয়ায় তীব্র নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। পয়স্তিলদ্ধ বয়ারচর, নলেরচর, কেরিংচরে পুনরায় ভাঙন দেখা দিয়েছে।

তমরদ্দি বাজার রক্ষাকল্পে ব্লক ফেলে সফল হলেও অন্যদিকে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।

চরঈশ্বর এলাকার ঐতিহ্যবাহী আফাজিয়া বাজার ভাঙনের মুখে।

বাজার সংলগ্ন হাতিয়ার একমাত্র কামিল মাদরাসাটি ও এর প্রতিষ্ঠাতা হাতিয়ার প্রথম জাতীয় পরিষদ সদস্য মাওলানা আবদুল হাইয়ের বাড়িটিও মেঘনায় বিলীন হয়েছে।

ভাঙনের হুমকিতে দাঁড়িয়ে আছে হাতিয়া ডিগ্রি কলেজ।

স্থানীয় অভিজ্ঞদের মতে এ পর্যন্ত প্রায় ৯০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

হাতিয়ায় নদীভাঙনে ক্ষয়ক্ষতির মূল্য নিরূপন করা সহজ নয়। তবে হাতিয়া থানা সীমানা নির্ধারণ ও পুনর্বাসন পরিষদের এক সমীক্ষাতে জানা গেছে, নদী ভাঙনে হাতিয়ার নয়শ’ বর্গ কিলোমিটার বা পাঁচ লাখ ৭৬ হাজার একর ভূমি বিলীন হয়েছে। প্রতি একর প্রতি গড়ে ক্ষতি কমপক্ষে পাঁচ লাখ টাকা হিসাবে ২৮ হাজার ৮০০ কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হয়

উপকূলীয় গবেষণায় সম্পৃক্ত ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম) অ্যাকচুয়ারি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (ইডিপি) ও সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিস (সিইজিআইএস) সূত্রে প্রকাশ, হাতিয়ার চারদিকে ১৯টি চরের আয়তনকে আরেক বাংলাদেশ বলে আশার আলো জানানো হচ্ছে। বস্তুতপক্ষে সে চরগুলোতেও নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে।

এছাড়া এসব চর মানুষ বসবাসের জন্য উপযোগী নয়।

প্রতি বছর নদী ভাঙনে লাখ লাখ লোক ভিটে মাটি হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। তাদের কেউ কেউ দেশের বিভিন্ন স্থানে বসতি স্থাপন করলেও অধিকাংশই উদ্বাস্তু।

হাতিয়াবাসীর প্রাণের দাবি মেঘনা নদীর ভাঙনের কবল থেকে রক্ষার জন্য এখানে ব্লক বাঁধ দেয়া। এ বাঁধের ফলে একদিকে যেমন প্রাচীন জনপদ হাতিয়া দ্বীপ রক্ষা পাবে অন্যদিকে অসংখ্য ভূমি জাগ্রত হতে সহায়ক হবে।

137total visits,1visits today

Leave a Reply