সোয়া চার লাখ মানুষ পানিবন্দি “টাঙ্গাইলে”

টাঙ্গাইল অংশে যমুনা নদীর পানি দুই সেন্টিমিটার কমলেও জেলার অভ্যন্তরে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। জেলার ৬টি উপজেলা ও দুইটি পৌরসভার সোয়া চার লাখ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। প্রশাসনের ১২টি আশ্রয়কেন্দ্রে গাদাগাদি করে বানভাসী মানুষ বাস করছে। বানভাসীদের মাঝে পানিবাহিত নানা রোগ দেখা দিচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে যৎসামান্য ত্রাণ বিতরণ করা হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা একেবারেই অপ্রতুল বলে জানা গেছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রাথমিক হিসাব মতে, এবারের বন্যায় জেলার টাঙ্গাইল সদর, ভূয়াপুর, কালিহাতী, গোপালপুর, নাগরপুর ও মির্জাপুর উপজেলার ৪৯টি ইউনিয়নের ৬১৮টি গ্রাম বন্যা কবলিত হয়েছে। এছাড়া এলেঙ্গা ও মির্জাপুর পৌরসভাও বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে। বন্যা কবলিত জেলার ৬টি উপজেলার এক লাখ ১৪ হাজার ২৯০টি পরিবারের চার লাখ ২৭ হাজার ১৪০ জন মানুষ পানিবন্দি রয়েছে।
জেলার স্কুল, কলেজ, মাদরাসাসহ অন্তত ১৭২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্যা কবলিত হয়ে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। জেলায় ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চার হাজার ৬০৪টি এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৬৫ হাজার ৫৮৪টি। বন্যার পানিতে তলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জেলার ১০ হাজার ৯১৬ হেক্টর জমির ফসল। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৬ হাজার পোল্ট্রি ফার্ম। এর মধ্যে শুধু ভূয়াপুর উপজেলাতেই ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে ১০ লাখ লেয়ার মুরগি। ফার্ম মালিকরা মুরগি নিয়ে সড়কের উঁচু জায়গা বা আত্মীয়দের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।

ভূয়াপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আ. হালিম অ্যাডভোকেট জানান, উপজেলার প্রায় সবগুলো গ্রাম বন্যা কবলিত হয়েছে। উপজেলার জমির ফসল ও পোল্ট্রি ফার্মের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বানভাসি মানুষ আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি, সড়ক ও বাঁধের উঁচু জায়গায় অস্থায়ীভাবে বসবাস করছে। সরকারিভাবে ত্রাণ বিতরণ করা হলেও তা অপ্রতুল, আরো ত্রাণ সামগ্রী দরকার। তিনি বেসরকারি পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সামর্থবানদের ভূয়াপুরে ত্রাণ সামগ্রী দেওয়ার আহ্বান জানান।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভূয়াপুর উপজেলায় ১১টি ও নাগরপুরে একটি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। ১২টি আশ্রয় কেন্দ্রে তিন হাজার ২৬৫টি পরিবারের ১২ হাজার ৬১০জন মানুষ গাদাগাদি করে মানবেতর দিন কাটাচ্ছে। বানভাসিদের মাঝে ডায়রিয়া, আমাশয়, জ্বরসহ নানাবিধ পানি বাহিত রোগ দেখা দিচ্ছে। এছাড়া সব সময় পানিতে থাকায় অনেকের শরীরে ক্ষয় রোগও দেখা দিয়েছে। প্রশাসনের উদ্যোগে বানভাসিদের মাঝে নগদ টাকা, শুকনো খাবার ও জিআর প্রকল্পের চাল বিতরণ করা হচ্ছে।

জেলা প্রশাসনের দেয়া তথ্যে জানা গেছে, এবারের বন্যায় জেলার ৬টি উপজেলা ও দুইটি পৌরসভায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন লাখ ৫৫ হাজার নগদ টাকা ও ৮৩ মেট্রিকটন জিআর চাল বন্যার্তদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে।
ভারপ্রাপ্ত জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মাসুম রেজা প্রধান (নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট) জানান, জেলার ৬টি উপজেলা ও দুটি পৌরসভার ৬১৮টি গ্রামের চার লাখ ২৭ হাজার ১৪০জন মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। আমরা ১২টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছি। যমুনার পানি গত ২৪ ঘণ্টায় দুই সেন্টিমিটার কমলেও জেলার অভ্যন্তরে পানি বাড়ছে। এতে নতুন কোনো এলাকা প্লাবিত না হলেও প্লাবিত এলাকায় বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যা কবলিতদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক (ডিসি) খান মো. নুরুল আমিন জানান, বন্যার্তদের জন্য ১২টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। জেলার বন্যা কবলিত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে। যোকারচর-তারাকান্দি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের লিকেজ পয়েন্টে পাউবো সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রেখেছে। তাছাড়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে টাঙ্গাইলের বন্যা পরিস্থিতি জানানো হয়েছে। যেকোনো ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলায় জেলা প্রশাসন তৎপর রয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।