সেলফি রোগে আক্রান্ত অনেকে, ঘটছে অনভিপ্রেত ঘটনা

সেলফি। প্রত্যেকের কাছে পরিচিত একটি শব্দ। প্রতিদিন নানাভাবে ধারণ করা হচ্ছে সেলফি। খাবার টেবিল থেকে ঘুমানোর রুম, যানবাহনে চলাচল, দুর্ঘটনাকবলিত ব্যক্তির সঙ্গে, অনভিপ্রেত নানা বিষয়-বস্তুর সঙ্গে ধারণ করা হচ্ছে সেলফি নামক এই আলোকচিত্র। এমনকি মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর পাশে দাঁড়িয়েও সেলফি তুলতে দেখা গেছে অনেককে। ঝুঁকিপূর্ণভাবে সেলফি তুলতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন অনেকে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের মানুষের সেলফির প্রতি রয়েছে দুর্বলতা। সেলফি ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে মুহূর্তের মধ্যেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আকর্ষণীয়, সুন্দর সেলফিতে বিপুল বন্ধুদের লাইক, প্রশংসনীয় কমেন্টের জন্য অনেকে নিয়মিত সেলফি ধারণ করে তা প্রকাশ করেন। এটি ‘সেলিফ রোগ’ বলে আখ্যায়িত করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, তথ্য-প্রযুক্তির অপব্যবহার করছে অনেকে। নৈতিকতার চর্চার অভাবে মানবিকবোধের বিকাশ ঘটছে না সেভাবে। যে কারণে সেলফি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে তরুণ-তরুণীদের অনেকে। ঘটছে নানা অনভিপ্রেত ঘটনা।

একটি সেলফি ধারণ করতে গিয়ে প্রাণ হারাতে হয়েছিল আসাদুজ্জামান রণিকে। দুঃসাহস নিয়েই কুমিরের সঙ্গে সেলফি ধারণ করতে গিয়েছিলেন তিনি। বিপদসীমার প্রাচীর টপকে কুমিরের কাছাকাছি চলে যান তিনি। সেলফি তোলার প্রস্তুতি নিতেই আকস্মিকভাবে একটি কুমির তাকে আক্রমণ করে। কুমিরটি তাকে টেনে পুকুরে পানিতে নিয়ে যায়। রক্তে লাল হয়ে যায় পুকুরের পানি। আশপাশে দাঁড়িয়ে সে দৃশ্য দেখছেন অনেকে। সেই দৃশ্যেরও সেলফি ও ভিডিও চিত্র ধারণ করেছেন কেউ কেউ। এক পর্যায়ে তার রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটি ঘটেছে গত ২৫শে মার্চ বরগুনার তালতলীর ট্যাড়াগিরি ইকোপার্কে। নিহত আসাদুজ্জামান রণি পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের হিসাব রক্ষক মো. গোলাম মোস্তফার ছেলে।

সুন্দর একটি সেলফি তুলতে ঝুঁকি নিয়েছিল অষ্টম শ্রেণির ছাত্র ইশতিয়াক আহমেদ রিদু। গত ৩০শে জুন শহরের একটি পার্কে চলন্ত নাগরদোলায় দাঁড়িয়ে সেলফি তুলতে গিয়ে পড়ে গুরুতর আহত হয় রিদু। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। নিহত ইশতিয়াক আহমেদ রিদু অষ্টম শ্রেণির ছাত্র ছিল। সে কোর্টপাড়ার আইনজীবী ইমতিয়াজ হোসেন উজ্জ্বলের সন্তান। অনেকেই পশু-পাখির সঙ্গে যেমন সেলফি ধারণ করেন তেমনি চলন্ত ট্রেনের সঙ্গেও সেলফি ধারণ করেন কেউ কেউ। এতে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। গত বছরের ২২শে মার্চ মোবাইলফোনে চলন্ত ট্রেনের সামনে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলেছিলেন সায়েদ আহমেদ নামে এক তরুণ। সেলফি তুলে দৌড়ে রেলপথ পার হওয়ার সময় ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত হন তিনি। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর স্টেশনের এ ঘটনা। নিহত যুবকের বাড়ি বড়লেখা উপজেলার চান্দগ্রামে।

বিভিন্ন ফ্লাইওভারে প্রায়ই সেলফি তুলতে দেখা যায় তরুণ-তরুণীদের। গতকাল রাত ৯টার দিকে হাতিরঝিলের নিকেতন সংলগ্ন ফ্লাইওভারে শতাধিক তরুণ-তরুণীকে দেখা গেছে সেখানে বসে-দাঁড়িয়ে আড্ডা দিতে। ফ্লাইওভারে মোটরসাইকেল পার্কিং করে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন তারা। এরমধ্যে কিছুক্ষণ পরপরই সেলফি তুলতে দেখা গেছে তরুণ-তরুণীদের অনেককে। ঝুঁকিপূর্ণভাবে ফ্লাইওভারের দাঁড়িয়ে একে-অন্যকে জড়িয়ে ধরে সেলফি তুলছিলেন তারা। কথা হয় সেখানে সেলফি ধারণকারী একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আহমেদ আদনানের সঙ্গে।

ঝুঁকি নিয়ে সেলফি ধারণ প্রসঙ্গে তিনি জানান, ভালো সেলফির জন্য একটু আধটু ঝুঁকি নিতেই হয়। সাধরণ ছবিতে বন্ধুরা তেমন লাইক-কমেন্ট করে না। তাই একটু সুন্দর ও ব্যতিক্রম ছবির জন্য ঝুঁকি নিতেই হয় বলে জানান এই যুবক। তবে তার সঙ্গে থাকা বান্ধবী ঝুঁকি নিয়ে সেলফি ধারণের বিষয়ে বলেন, আমিতো তাকে মানা করেছি এভাবে সেলফি তোলতে। এমনকি ফ্লাইওভারে এভাবে বসে থাকাও তো নিরাপদ না বলে স্বীকার করেন ওই তরুণী। এভাবে ঝুঁকির বিষয়টি জেনে-বুঝেই ফ্লাইওভারে সেলফি ধারণ করছেন তরুণ-তরুণীরা। ২০১৫ সালে রাজধানীর দক্ষিণ যাত্রাবাড়ী হানিফ ফ্লাইওভারে দাঁড়িয়ে সেলফি ধারণ করতে গিয়ে নিহত হন আনোয়ার হোসেন নামে এক যুবক। সেলফি ধারণের সময় পিছন থেকে একটি মোটরসাইকেল তাকে ধাক্কা দেয়। তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে। নিহত আনোয়ারের বাসা দক্ষিণখানের ফায়দাবাদে।

মুমূর্ষু রোগীর সঙ্গে সেলফি তোলে সমালোচনার মুখোমুখি হচ্ছেন অনেকে। এরমধ্যে সাধারণ মানুষ যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছেন বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও। গত ৩০শে জুন রাতে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উখিয়া বঙ্গমাতা মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরীকে মুমূর্ষু অবস্থায় চট্টগ্রাম থেকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সযোগে ঢাকায় আনা হচ্ছিল। পথিমধ্যে অ্যাম্বুলেন্স থামিয়ে ওই রোগীর সঙ্গে সেলফি তুলেন এমপি আবদুর রহমান বদি। সেলফটি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ হওয়ায় ব্যাপক সমালোচনা হয়।

সিলেটের এমসি কলেজে ছাত্রলীগ নেতার হামলায় গুরুতর আহত খাদিজা আক্তারকে গত বছরের অক্টোবরে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে দেখতে যান আওয়ামী লীগের তিন নেত্রী। এ সময় খাদিজার সঙ্গে সেলফি ধারণ করেন তারা। সেলফিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার হলে তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হন তারা।

এসব বিষয়ে সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক মাসুদা এম রশিদ চৌধুরী বলেন, হাতে হাতে স্মার্টফোন। যেখানে ক্যামেরা, ভিডিও ও ইন্টারনেটের সুবিধা থাকে। বেশিরভাগ তরুণ-তরুণী এখন ইন্টারনেটে আসক্ত। তারা গোসল, খাওয়া-দাওয়া, যেনতেন অবস্থার ছবি ফেসবুকে প্রদর্শন করছে। সুন্দর, ব্যতিক্রম ছবি দিলে বন্ধুরা বেশি প্রশংসা করবে। লাইক দেবে। এতেই মজা পাচ্ছে। এজন্য প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে সেলফি ধারণ করে পোস্ট করা হচ্ছে। সময়ক্ষেপণ ছাড়াও মস্তিষ্ককে এই কাজে ব্যস্ত রাখছে তারা। এটি যতোটা বিনোদন তারচেয়ে বেশি ক্ষতির কারণ। রাস্তায় দুর্ঘটনাকবলিতদের সহযোগিতা না করে পাশে দাঁড়িয়ে সেলফি, সংকটাপন্ন রোগীর সঙ্গে সেলফি ধারণ করে ফেসবুকে পোস্ট দেয়া হচ্ছে। এটি এক ধরনের অসুস্থতা। এ থেকে সবাইকে সচেতন করতে হবে। মানসিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করতে হবে। এজন্য নৈতিক শিক্ষার বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি।

(পূর্বপশ্চিম/ঘাটাইল.কম)/-

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।