সুদানের প্রেসিডেন্ট বশিরকে সেনাবাহিনীর উৎখাত ও ক্ষমতা দখল

সুদানের গণবিক্ষোভের মুখে প্রেসিডেন্ট ওমর আল বশিরকে সেনাবাহিনী উৎখাত এবং গ্রেফতার করেছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বৃহস্পতিবার টিভিতে এক ঘোষণায় বলেছেন, একটি সামরিক কাউন্সিল দু”বছর মেয়াদের এক অন্তর্বর্তী প্রশাসন পরিচালনা করবে এবং তার পর নতুন সংবিধানের আওতায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ওমর আল বশির ১৯৮৯ সাল থেকে সুদানের ক্ষমতায় ছিলেন।

গত ডিসেম্বর মাস থেকেই মি. বশিরের বিরুদ্ধে জনতার বিক্ষোভ চলছিল এবং এসময় সহিংসতায় বেশি কিছু লোক নিহত হয়েছে।

উনিশশো উননব্বই সালে ব্রিগেডিয়ার ওমর আল বশির আরো কিছু ইসলামপন্থী সেনাকর্মকর্তাকে সাথে নিয়ে সুদানের সর্বময় ক্ষমতা দখল করেন। তিনিই হচ্ছেন দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট। ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তাকে উৎখাতের চেষ্টা এর আগেও হয়েছে – তবে তা সফল হয় নি।

গত বছর ডিসেম্বর মাস থেকে যে গণবিক্ষোভ শুরু হয় – তা প্রথমে ছিল দেশটির অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে। তবে ধীরে ধীরে তা মি. বশিরের বিরুদ্ধে আন্দোলনে পরিণত হয়।

তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল আওয়াদ ইবনে আউফ টিভিতে বলেন, দেশে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল এবং জনগণ গরিব থেকে আরো গরিব হয়ে পড়ছিল। এই বিক্ষোভে যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের জন্য তিনি দু:খ প্রকাশ করেন।

জেনারেল ইবনে আউফ বলেন, ওমর আল বশিরকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর একটি সামরিক কাউন্সিল দু’বছরব্যাপী অন্তর্বতী প্রশাসন চালাবে, এবং তার পর নতুন সংবিধানের অধীনে নির্বাচন হবে।

এ ছাড়া এক মাসব্যাপী কারফিউ এবং সব সীমান্ত বন্ধ রাখার কথাও ঘোষণা করা হয়। বলা হচ্ছে, ৭৫ বছর-বয়স্ক মি. বশিরকে গ্রেফতার করে গোপন স্থানে নিরাপত্তা হেফাজতে রাখা হয়েছে।

তবে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হচ্ছে, খার্তুমের বিক্ষোভকারীরা অভ্যুত্থান নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে। একটি গ্রুপ বলছে, অন্তর্বর্তী সামরিক সরকার প্রতিষ্ঠার এই ঘোষণা তারা প্রত্যাখ্যান করছে, কারণ তারা বেসামরিক লোকদের দিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার চায়, সামরিক বাহিনীর লোকদের নয়।

কয়েক দশকের যুদ্ধ

আল-বশিরের রাজনৈতিক জীবনকে যুদ্ধ দিয়েই সবচেয়ে ভালোভাবে বর্ণনা করা যায়। ১৯৮৯ সালে তিনি ক্ষমতায় আসেন এবং শক্ত হাতে দেশ পরিচালনা করেছেন। ২০১১ সালে বিভক্ত হয়ে দক্ষিণ সুদানের জন্ম না হওয়া পর্যন্ত এই দেশটি ছিল আফ্রিকার সবচেয়ে বড় দেশ।

যখন তিনি ক্ষমতা দখল করেন, সুদান তখন উত্তর আর দক্ষিণের মধ্যে ২১ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধের মধ্যে রয়েছে।

মি. বশির শক্ত হাতে জবাব দিতে শুরু করেন। তার বিরুদ্ধে দমন পীড়ন এবং যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ আনে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত। তার বিরুদ্ধে ২০০৯ ও ২০১০ সালে দুইটি আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারের পরোয়ানা জারি করা হয়। যদিও তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও তিনি ২০১০ ও ২০১৫ সালের দুইটি নির্বাচনে বিজয়ী হন। তার সর্বশেষ নির্বাচন বিরোধীরা বর্জন করে।

এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কারণে তার ওপর আন্তর্জাতিক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা তৈরি হয়। তারপরেও মি. বশির মিশর, সৌদি আরব আর দক্ষিণ আফ্রিকায় ভ্রমণ করেন।

২০১৫ সালের জুনে তিনি অনেকটা বিব্রতকর ভাবে দক্ষিণ আফ্রিকা ত্যাগ করতে বাধ্য হন, কারণ দেশটির একটি আদালত বিবেচনা করছিল যে, তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাটি কার্যকর করা হবে কিনা।

একীভূত সুদান

ক্ষমতা গ্রহণের আগে সেনাবাহিনীর একজন কমান্ডার ছিলেন মি. বশির। তিনি বিদ্রোহী নেতা জন গ্যারাঙ্গের বিরুদ্ধে বেশিরভাগ অভিযান পরিচালনা করেন। যখন তিনি সুদানিজ পিপলস লিবারেশন মুভমেন্টের পক্ষে গ্যারাঙ্গের সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন, তখন তিনি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছিলেন যাতে চুক্তিটি পরাজয় বলে মনে না হয়।

তিনি বলেছিলেন,” আমরা অসহায় হয়ে ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করিনি, বরং আমরা যখন বিজয়ের শীর্ষে ছিলাম, তখনি তাতে স্বাক্ষর করেছি।”

তার সবসময়েই লক্ষ্য ছিল একটি একীভূত সুদান রক্ষা করা, কিন্তু শান্তি চুক্তির অংশ হিসাবে দক্ষিণ সুদানের বিষয়ে একটি গণভোট আয়োজন করতে বাধ্য হন। ২০১১ সালের জানুয়ারির গণভোটে ৯৯ শতাংশ দক্ষিণ সুদানিজ ভোটার আলাদা হয়ে যাওয়ার পক্ষে ভোট দেন। ছয় মাস পরে স্বাধীন দক্ষিণ সুদান ঘোষিত হয়।

যখন তিনি দক্ষিণ সুদানের স্বাধীনতার পক্ষে সম্মত হন, তখনো দারফুরের প্রতি তার মনোভাব ছিল আগ্রাসী।

(বিবিসি, ঘাটাইলডটকম)/-

66total visits,3visits today