সাগর-রুনী হত্যার ৭ বছর, বিচার পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছেন সাগরের মা

সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনী হত্যা মামলার তদন্ত কাজ সাত বছরেও শেষ করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশ, গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য বিভাগের (ডিবি) পর বর্তমানে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) তদন্তেও নেমে এসেছে স্থবিরতা। যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো আলামতের ডিএনএ পরীক্ষা করে ঘটনাস্থলে দু’জন অজ্ঞাত পুরুষের ডিএনএ পাওয়া গেছে। তবে তাদের শনাক্ত করতে পারেনি তদন্ত সংস্থা। এ অবস্থায় বিচার পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছেন গোলাম মোস্তফা সারোয়ার ওরফে সাগর সারোয়ারের মা।

শিগগিরই তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে বলে আশা করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। এদিকে দীর্ঘদিনেও চাঞ্চল্যকর এ মামলার তদন্ত শেষ না হওয়ায় নিহতের পরিবার ও গণমাধ্যম কর্মীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের বাসায় মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক গোলাম মোস্তফা সারোয়ার ওরফে সাগর সারোয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন নাহার রুনা ওরফে মেহেরুন রুনী দম্পতি খুন হন। ঘটনার পরের দিন রুনীর ভাই নওশের আলম রোমান রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় এ হত্যা মামলা করেন।

জানতে চাইলে সাগরের মা সালেহা মনির বলেন, দীর্ঘদিনেও কোনো তদন্ত সংস্থা এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দিতে পারেনি। এ হত্যার বিচার হবে- এমন আশা আর করি না। এ বিষয়ে কিছু জানতে চাওয়ার অর্থ হল- শুধু শুধু মনের আগুন আবার জ্বালানো। তিনি বলেন, সরকার একটু সহানুভূতি দেখালে রহস্য বেরিয়ে আসত।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তদন্ত কর্মকর্তাদের জানিয়েছি- যতই মহড়া দেয়া হোক না কেন, গ্রিল কেটে এত ছোট জায়গা দিয়ে চোর ঢুকবে তা বিশ্বাস করি না। এটা সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। ছোটখাটো ছিঁচকে চোরকে আসামি করে চার্জশিট দেয়া হলে তা মানব না।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা র‌্যাব সদর দফতরের সহকারী পরিচালক ও সহকারী পুলিশ সুপার শহিদা রহমান বলেন, তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ডিএনএ রিপোর্ট অনুসারে দুই অজ্ঞাত পুরুষ আসামির সন্ধান করা হচ্ছে। শিগগির এ মামলায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে বলে আশা করছি।

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের বাসায় মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক গোলাম মোস্তফা সারোয়ার ওরফে সাগর সারোয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন নাহার রুনা ওরফে মেহেরুন রুনী দম্পতি খুন হন। ঘটনার পরের দিন রুনীর ভাই নওশের আলম রোমান রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় এ হত্যা মামলা করেন।

১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের কথা থাকলেও ৬২ বার সময় নেয়া হয়েছে। সর্বশেষ ৯ জানুয়ারি এ মামলার প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল। কিন্তু ওইদিনও র‌্যাব তা দাখিল করেনি। এ জন্য আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পরবর্তী দিন ধার্য করেন আদালত।

দফায় দফায় তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন : এ মামলার তদন্ত কাজ প্রথমে শেরেবাংলা নগর থানার এসআই মো. জহুরুল ইসলাম শুরু করেন। ২০১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ডিবি উত্তরের পুলিশ পরিদর্শক মো. রবিউল আলম তদন্তভার নেন। এরপর হাইকোর্ট বিভাগের এক রিট পিটিশনে ১৮ এপ্রিল তদন্তভার র‌্যাবের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেয়া হয়।

১৯ এপ্রিল র‌্যাব সদর দফতরের সিনিয়র পুলিশ সুপার মো. জাফর উল্লাহ মামলার তদন্তভার গ্রহণ করেন। র‌্যাবের এ কর্মকর্তা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে যাওয়ায় ২০১৪ সালের ১২ মার্চ এ মামলার তদন্তভার পান র‌্যাব সদর দফতরের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মো. ওয়ারেছ আলী মিয়া। নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি এ কর্মকর্তা মামলার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী সাগর-রুনীর ছেলে মাহির সরোয়ার মেঘকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

যুক্তরাষ্ট্রে আসামি ও সন্দেহভাজনদের ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। ২০১৫ সালের মাঝামাঝি র‌্যাব সদর দফতরের সহকারী পরিচালক সহকারী পুলিশ সুপার মহিউদ্দিন আহম্মদকে এ মামলার তদন্তভার দেয়া হয়। এরপর গত বছরের ২৫ নভেম্বর সহকারী পুলিশ সুপার শহিদা রহমান তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি আগের সাক্ষীদের পর্যালোচনা করে তদন্ত অব্যাহত রেখেছেন।

তদন্তের অগ্রগতি যতটুকু : সাত বছরের তদন্তে র‌্যাব আদালতে পাঁচটি তদন্ত অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রথমে ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর, এরপর ২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি, ওই বছরের ৭ জুন, ২০১৬ সালের ২ অক্টোবর ও সর্বশেষ ২০১৭ বছরের ২১ মার্চ তদন্ত অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। তদন্ত অগ্রগতি সংক্রান্ত প্রতিটি প্রতিবেদনে প্রায় একই ধরনের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

সর্বশেষ তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো আলামতের ডিএনএ পরীক্ষা করে ঘটনাস্থলে দু’জন অজ্ঞাত পুরুষের ডিএনএ পাওয়া গেছে। তাদের শনাক্ত করতে চেষ্টা অব্যাহত আছে। এ ছাড়া অন্যসব অগ্রগতি প্রতিবেদনের মতো সর্বশেষ অগ্রগতি প্রতিবেদনেও বলা হয়, ‘ঘটনাস্থল থেকে চুরি যাওয়া ল্যাপটপ বর্তমানে ব্যবহার হচ্ছে কি না- এ ব্যাপারে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে একটি চিঠি দেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। চুরি করা ল্যাপটপ কখনও ব্যবহার করা হলে তা থেকে তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

মামলার ভিকটিম মিডিয়া কর্মী হওয়ায় তদন্তকালে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে তদন্ত করা হচ্ছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন, বিভিন্ন আলামত পরীক্ষা, বিদেশি বিশেষজ্ঞদের মতামত, বিভিন্ন ব্যক্তির সাক্ষ্য, সমসাময়িক অন্যসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বিশ্লেষণ, ঘটনাস্থলের কাছের থানাগুলোয় একই ধরনের অপরাধ সংঘটিত ও অপরাধীদের বিষয়ে বিস্তারিতভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। গ্রিল কাটা চোর-ডাকাতদের বিষয়েও নিবিড়ভাবে তদন্ত অব্যাহত আছে।’

আসামিদের বর্তমান অবস্থান :

চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডে তদন্তের দায়িত্বে থাকা র‌্যাব এ পর্যন্ত আটজনকে গ্রেফতার করেছে। আসামিরা হলেন- মিন্টু ওরফে বারগিরা মিন্টু ওরফে মামুন, মো. কামরুল হাসান অরুণ, বকুল মিয়া, রফিকুল ইসলাম, আবু সাঈদ, এনাম আহাম্মদ ওরফে হুমায়ুন কবির, পলাশ রুদ্র্র পাল ও তানভীর রহমান। আসামিদের মধ্যে শেষের দু’জন জামিনে ও বাকি আসামিরা কারাগারে আছেন।

(যুগান্তর, ঘাটাইলডটকম)/-

104total visits,3visits today