সখীপুরের বেশ কয়েকটি গ্রামে গড়ে উঠেছে হাতে ভাজা মুড়ির কারখানা

ইফতার মুড়ি ছাড়া কল্পনাই করা যায় না। আবার সেই মুড়ি যদি হয় হাতে ভাজা, তাহলে তো কথাই নেই। হাতে ভাজা মুড়ির স্বাদই অন্য রকম। টাঙ্গাইলের সখীপুরের বেশ কয়েকটি গ্রামে গড়ে উঠেছে হাতে ভাজা মুড়ির কারখানা। উপজেলার কৈয়ামধু, বেড়বাড়ী, রতনপুর ও কালীদাস গ্রামে স্বল্প আয়ের লোকজন মুড়ি বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন। এই হাতে ভাজা মুড়ি সখীপুর সদরের চাহিদা মিটিয়ে জেলা শহর টাঙ্গাইল ও রাজধানী ঢাকাতেও রপ্তানি হচ্ছে। বিশেষ করে রমজান মাসে এই মুড়ির চাহিদা কয়েক গুণ বেশি।

উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পশ্চিমে কৈয়ামধু গ্রাম। এ গ্রামকে সখীপুরের অনেকেই মুড়ির গ্রাম হিসেবেই চেনেন। গত শুক্রবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে ওই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, লোকজন কোনো রাসায়নিক পদার্থ ছাড়াই মুড়ি ভাজছেন। গ্রামের নুর ভানু ও তাঁর ছেলের বউ রোজিনা বেগম পাশাপাশি দুটি চুলায় মাটির হাঁড়িতে মুড়ি ভাজছিলেন।

দেখা গেল, একজন চাল ভাজছেন। চালের সঙ্গে লবণের পানি মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। আরেকটি চুলায় বড় একটি হাঁড়িতে বালু গরম করা হচ্ছে। বালু গরমের কাজটি করছেন শাশুড়ি নুর ভানু। একপর্যায়ে চাল ও বালু গরম হলে চাল তুলে বালুর হাঁড়িতে ঢেলে দেওয়া হয়। নুর ভানু তখন বালুর হাঁড়িটি ঘোরাতে থাকেন। ৩০ সেকেন্ডের ভেতর সেই হাঁড়িতে চাল ফুটে মুড়ি তৈরি হয়। সঙ্গে সঙ্গে হাজার ফোঁড়ের একটি হাঁড়িতে (স্থানীয় ভাষায় ঝাঁঞ্জর) বালুসহ মুড়ি ঢেলে দেওয়া হয়। ওই ঝাঁঞ্জরে মুড়ি আটকা পড়ে আর বালু ফোঁড়ের ভেতর দিয়ে নিচের পাতিলে ঝরে পড়ে। এভাবেই হাতে ভাজা মুড়ি তৈরি হয়।

নুর ভানু জানান, এক কেজি চালে ৯০০ গ্রাম মুড়ি হয়। ভোর থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত একতালে মুড়ি ভেজে গেলে এক দিনে প্রায় দুই মণ চালের মুড়ি ভাজা যায়। দিনে দুজনে মিলে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা আয় করা যায়। তবে মুড়ি ভাজায় অনেক পরিশ্রম। সংসার চালাতে গেলে পরিশ্রম করতেই হবে।

নুর ভানুর ছেলের বউ রোজিনা বলেন, ‘বাজারের কারখানার মুড়িতে ভেজাল আছে শুনেছি, তবে আমাদের হাতে ভাজা মুড়িতে কোনো ভেজাল নেই।’

নুর ভানুর বাড়ির উত্তর পাশে রুনিয়াদের বাড়ি। রুনিয়ার স্বামী জয়নাল আবেদীন অনেক ঋণ করে বিদেশে গেছেন। তবে সেখানে তেমন সুবিধা করতে পারছেন না। রুনিয়া তাঁর শাশুড়িকে নিয়ে মুড়ি ভেজে সংসার চালাচ্ছেন। রুনিয়া বলেন, তাঁর স্বামী টাকা পাঠাতে পারছেন না। তাঁদের দুই মেয়ে পড়াশোনা করছে। শাশুড়িসহ চারজনের সংসার মুড়ি ভেজেই চালাতে হচ্ছে। ঋণের সাপ্তাহিক কিস্তি তো আছেই।

রুনিয়াদের বাড়ির পাশেই এসহাক ও কামাল হোসেনের বাড়ি। ওই বাড়িতেও হাতে ভাজা মুড়ি তৈরি হয়। কামালদের বাড়ির পাশেই আলাউদ্দিনের বাড়ি। ওই বাড়িতে গিয়েও দেখা যায়, স্ত্রী ফাহিমা আক্তারের সঙ্গে আলাউদ্দিন মুড়ি ভাজছেন। স্বামী মুড়ির চাল ভাজছেন আর স্ত্রী বালুর পাতিল গরম করছেন। এভাবে দুজনে মিলেমিশে মুড়ি ভাজার কাজ করছেন।

আলাউদ্দিন বলেন, রমজান মাস এলেই হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা বাড়ে। রোজার আগের সপ্তাহে ১০ মণ মুড়ি টাঙ্গাইল শহরের এক ব্যাপারীর কাছে এবং গত বৃহস্পতিবার ঢাকার কারওয়ান বাজারের এক ব্যবসায়ীর কাছে ১০ মণ মুড়ি বিক্রি করেছেন। ট্রাকে করে ব্যবসায়ীরা গ্রাম থেকে ২০ মণ মুড়ি নিয়ে গেছেন। ফাহিমা আক্তার জানান, দুই মণ চালের মুড়ি ভাজতে এক কেজি লবণ, ৫০০ টাকার লাকড়ি খরচ হয়। তবে যে পরিশ্রম হয়, তাতে টাকায় পোষে না।

আলাউদ্দিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ওই গ্রামের রোকসানা নামের এক গৃহবধূ ঢাকায় থাকেন। স্বামী ব্যাংকে চাকরি করেন। তিনি গ্রামে বেড়াতে এসেছেন। ওই গৃহবধূ নিজে মুড়ি ভাজা দেখে কিনে নিয়ে যেতে ওই বাড়িতে এসেছেন।

রোকসানা বলেন, ‘ঢাকার বাজারে সবকিছুতেই ভেজাল। কিন্তু আমার দেখা এই মুড়িতে কোনো ভেজাল নেই। তাই এক বস্তা কিনে নিয়ে যাচ্ছি।’

একই গ্রামের ইয়াকুব আলী ও ঘুঘুর আলী বলেন, আগে তাঁরাও মুড়ি ভাজার ব্যবসা করতেন। এ ব্যবসায় পরিশ্রম বেশি, লাভ কম। এখন মহিষের গাড়ি চালান। তাঁদের মতো অনেকেই মুড়ি ভাজার ব্যবসা ছেড়ে অন্য পেশায় যোগ দিচ্ছেন।

সখীপুরের মুড়ি ব্যবসায়ী তমিজ উদ্দিন জানান, উপজেলায় বর্তমানে কৈয়ামধু, বেড়বাড়ী, কালীদাস ও রতনপুর গ্রামে হাতে ভাজা মুড়ির বাড়ি বাড়ি কারখানা গড়ে উঠেছে। এসব গ্রাম থেকে মুড়ি কিনে টাঙ্গাইল, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও ঢাকা শহরের বড় বড় ব্যবসায়ীর গুদামে পাঠিয়ে দেন তিনি।

তমিজ উদ্দিন বলেন, হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা সারা বছর থাকলেও রমজান মাসে এর পাঁচ গুণ চাহিদা বাড়ে। ফলে এ মাসে লাভ হয়। কিন্তু অন্য মাসে চাহিদা তেমন না থাকায় অনেকেই মুড়ি ভাজার কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।

(ইকবাল গফুর, ঘাটাইলডটকম)/-