শাহনাজ রহমতউল্লাহ- এক অমীমাংসিত রহস্যমানবী!

শাহনাজ রহমতউল্লাহকে নিয়ে আমি বরাবরই দ্বিধা-দ্বন্দ্বে থাকি। প্রায়ই ভাবতে বসেছি তিনি বস্তুত কোন দলের, কী তার রাজনৈতিক বিশ্বাস। ‘কোন দল’ কোন্দলের সুরাহা করতে না পেরে পরক্ষণেই ভেবেছি- শিল্পের কোনো দল নেই, শিল্প নির্দলীয়, শিল্প সর্বজনীন। সদ্যপ্রয়াত শাহনাজের দুই সহোদরও বাংলাদেশের দুই অঙ্গনের দুই দিকপাল— বড়ভাই কিংবদন্তি সুরকার আনোয়ার পারভেজ, মেজোভাই ডাকসাইটে নায়ক-গায়ক জাফর ইকবাল। একই পরিবারে এমন ত্রিরত্নের অস্তিত্বও মোটামুটি বিরল। ত্রিরত্নের দ্বিতীয়জন পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন আটাশ বছর আগে, প্রথমজন তেরো বছর আগে, শেষজনের জীবনপ্রদীপও নিভে গেল আজ। ত্রিরত্নের কেউই আর বেঁচে রইলেন না।

সর্বকালের সেরা বাংলা গান নির্বাচনের উদ্দেশ্যে একটা জরিপ করেছিল বিবিসি বাংলা। তখন প্রতিদিন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় বিবিসির প্রবাহ শুনতাম। বিশতম থেকে শুরু করে একেকদিন এক-এক করে যখন গানগুলো ঘোষিত হতো, তীব্র শিহরণ বোধ করতাম। একেকটি গান ঘোষণা করে জীবিত থাকা সাপেক্ষে গানটির গীতিকার, সুরকার, শিল্পীর সাক্ষাৎকারও প্রচার করত বিবিসি। সেইসূত্রে বিবিসিতে শাহনাজের সাক্ষাৎকার চারবার শুনেছি; সর্বকালের সেরা বিশ বাংলা গানের তালিকায় উঠে এসেছিল তার গাওয়া চারটি গান, যা অন্য কোনো শিল্পীর ভাগ্যে জোটেনি।

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খুব পছন্দের গান ছিল ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’। গানটিকে তিনি বিএনপির দলীয় সংগীত বানিয়ে গেছেন। গানটির গায়িকা শাহনাজ রহমতউল্লাহ। আওয়ামীপন্থিদের বড় অভিযোগ— শাহনাজ বিএনপির দলীয় সংগীত গেয়েছেন। জিয়ার পছন্দের হওয়ায় আওয়ামী লীগের আমলে সরকারি গণমাধ্যমে গানটাও অঘোষিতভাবে নিষিদ্ধ থাকে, আওয়ামীপন্থিদের কাছে শাহনাজও মোটামুটি অপাঙক্তেয়।

আমি কথা বলেছিলাম গানটির সুরকার আলাউদ্দীন আলীর সাথে। তিনি বলেছিলেন সত্তরের দশকে বিটিভিতে ‘বর্ণালি’ নামক একটা অনুষ্ঠানের জন্য দেশাত্মবোধক আটটা গান তৈরি করা হয়েছিল তার সুরে। এর মধ্যে মনিরুজ্জামান মনিরের লেখা এই গানটা জিয়ার পছন্দ হয় এবং জিয়া গানটাকে বিএনপির দলীয় সংগীত বানিয়ে ফেলেন, এ ক্ষেত্রে বিএনপি আলাউদ্দীনের কাছ থেকে কোনো অনুমতি নেয়নি। একই ধরনের বক্তব্য শুনেছি শাহনাজের সাক্ষাৎকারেও, বিএনপি শাহনাজের কাছ থেকেও নাকি অনুমতি নেয়নি।

জিয়া অবশ্য শিল্পকলা একাডেমীতে চাকরি দিয়ে মনিরকে পুষিয়ে দিয়েছিলেন বলে বিডিনিউজের একটা প্রতিবেদনে দেখেছি। মোদ্দা কথা— গানটা বিএনপির দলীয় সংগীত হিসেবে রচিত ছিল না, রচিত ছিল আর দশটা গানের মতো একটা দেশাত্মবোধক গান হিসেবে। জিয়াউর রহমানের মনে ধরায় নিরীহ গানটা চার দশক ধরে কাকরাইলে আটকে আছে।

আওয়ামী লীগের দলীয় সংগীত কিনা, জানি না; তবে আওয়ামীপন্থিদের সবচেয়ে পছন্দের গান নিঃসন্দেহে ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’। আওয়ামী লীগ তাদের সব ধরনের কর্মসূচিতে গানটা বাজায় তো বটেই, এই গান ছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রেরও সূচনাসংগীত। ১৯৭০ সালের মার্চে রচিত গানটা মুক্তিযুদ্ধে প্রবল ভূমিকা তো রেখেছেই, পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছে সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়েও। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই গানেরও মূল শিল্পী শাহনাজ রহমতউল্লাহ। অর্থাৎ বাংলাদেশের দুই বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের প্রিয়তম দুই গানের শিল্পী একই ব্যক্তি। বিএনপির দলীয় সংগীত গাওয়ার অভিযোগে আওয়ামী লীগ যে শাহনাজকে অভিযুক্ত করে থাকে, ঐ শাহনাজই আওয়ামী লীগেরও প্রিয়তম গানের শিল্পী।

(আরো মজার ব্যাপার হচ্ছে গানটার রচয়িতা গাজী মাজহারুল আনোয়ার পুরোদস্তুর বিএনপিপন্থি। অর্ধযুগ আগে তিনি একটা কোচিং সেন্টারের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে এসেছিলেন, আমি ছিলাম ঐ অনুষ্ঠানের উপস্থাপক। তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম তার বিএনপি-প্রীতির কারণ। তিনি বলেছিলেন— মুক্তিযুদ্ধের আগে বা মুক্তিযুদ্ধকালে মোটামুটি প্রত্যেকেই ছিলেন আওয়ামী লীগ সমর্থক, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী হিসেব-নিকেশ ও মান-অভিমানে একেকজন একেক দলে ছিটকে গেছেন।)

শাহনাজ রহমতউল্লাহ মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ছিলেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রিয় পাত্রী ছিলেন— ইত্যাকার নানাবিধ কথা শোনা যায়। প্রাপ্তবয়সে পাকিস্তানি টিভিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বন্দনা করে শাহনাজের গাওয়া ‘জিভে পাকিস্তান’ গান এবং পাকিস্তান টিভি কর্তৃক শাহনাজকে প্রদত্ত আজীবন সম্মাননা এই অভিযোগের খানিকটা সত্যতাও প্রমাণ করে। অবশ্য এও বলা হয়ে থাকে— নাসিরউদ্দিন ইউসুফের ‘গেরিলা’ চলচ্চিত্রে শম্পা রেজার যে চরিত্রটি দেখানো হয়েছে, যেখানে গায়িকা শম্পা পাকপ্রেমী সেজে পাকবাহিনীর ভেতরকার খবর এনে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে দিতেন; ঐ চরিত্রটি আসলে শাহনাজ রহমতউল্লাহর আদলে তৈরি। শাহনাজপন্থিরা বলে থাকেন তিনি আসলে পাকবাহিনীর সাথে মিশে তাদের খবরাখবর মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সরবরাহ করতেন।

মুক্তিযুদ্ধের পরও শাহনাজ দেশের গান গেয়েছেন— এক নদী রক্ত পেরিয়ে বাংলার আকাশে রক্তিম সূর্য আনলে যারা। একজন মুক্তিযুদ্ধবিরোধীর পক্ষে এমন গান গাওয়া সম্ভব কি না, এমন প্রশ্নও করে থাকেন অনেকে। অবশ্য এই গান যার লেখা, মুক্তিযুদ্ধে সেই খান আতাউর রহমানের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক আছে। খান আতাকে কেউ বলেন মুক্তিযোদ্ধা, কেউ বলেন রাজাকার।

শাহনাজ মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, নাকি পাকবাহিনীর খবর এনে দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তাকারী— এ নিয়ে কথা বলতে গেলে কথা শেষ হবে না, জল ব্যাপক ঘোলা হবে। তবে এক শাহনাজকে নিয়ে ভাবতে গেলে অন্তত একটা ব্যাপার টের পাওয়া যায়— আণবিক বোমার চেয়েও শক্তিশালী অস্ত্রের নাম গান। একটিমাত্র গান একটা নির্বাচনের ফল ঘুরিয়ে দিতে পারে, একটা যুদ্ধকে আমূল প্রভাবিত করতে পারে, একটা রাজনৈতিক দলকে দশকের পর দশক ধরে উজ্জীবিত করে রাখতে পারে, একই শিল্পীর গাওয়া দুটো গান সাপে-নেউলে সম্পর্ক থাকা দুটো দলের দলীয় সংগীত হতে পারে। অর্থাৎ রাজনীতি আর গান-কবিতা পরস্পর হাত ধরাধরি করে চলে, রাজনীতি প্রভাবিত করে গানকে, গান বদলে দেয় রাজনীতিকে, একটা গান উলটে দিতে পারে একটা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের গতিপ্রকৃতিকে।

রাজনীতিকরা গীতিকার-সুরকার-শিল্পীদেরকে খুব একটা গুরুত্ব না দিলেও তাদের সৃষ্ট গান-কবিতা রাজনীতিকদের ভীষণ কাজে লাগে, গানের মালিকানা নিয়ে রাজনীতিকরা ক্ষেত্রবিশেষে খণ্ডযুদ্ধেও লিপ্ত হন। কবি-সাহিত্যিকদেরকে আগা-গোড়া তাচ্ছিল্য করে এলেও, বিরোধিতাকারী কবিদেরকে কারাগারে পুরলেও, মুমূর্ষু কবিদের চিকিৎসার বন্দোবস্ত না করলেও তাদের লেখা গানকে দলীয় সংগীত করার সময়ে রাজনীতিকরা তাদের অনুমতি নেওয়া দূরে থাক; তাদেরকে জানানোরও দরকার মনে করেন না। রাজনীতিকদের সোনার তরিতে ধানের ঠাঁই হলেও কৃষকের ঠাঁই মেলে না।

গীতিকার-সুরকারের নাম জানি না, শাহনাজ রহমতউল্লাহর গাওয়া একটা গান আছে— ‘আমার স্বপ্ন দেখার দুটি আঁখি আছে, তুমি স্বপ্ন দেখে যাও’। কৈশোরে শোনা গানটা আমাকে ভীষণ আলোড়িত করেছিল। এই দুই পঙক্তির ওপর ভর করে এক দশক আগে ‘স্বপ্নবন্দনা’ নামে একটা কবিতা লিখেছিলাম, যেটি ছিল নয় বছর আগে প্রকাশিত আমার প্রথম বইয়ের প্রথম কবিতা; কবিতাটির শেষ দুই চরণ— ‘স্বপ্ন তুমি দেখতে পারো দু-চোখ দিয়ে আমার, চাইলে তুমি গড়তে পারো স্বপ্নে যৌথ খামার।’ পরবর্তীকালে গুগলে-ইউটিউবে গানটা হন্যে হয়ে খুঁজেছি, এক দশক কেটে গেলেও প্রিয় গানটা আর কখনও শুনতে পারিনি।

আশির দশকে পাকিস্তান টিভির রজতজয়ন্তীতে পাকিস্তানকে বন্দনা করা গান গেয়ে প্রমাণ করেছেন তিনি বাংলাদেশপ্রেমী নন; আবার তিনি যদি পাকিস্তানকে নিজ দেশ মনে করে থাকেন, সেক্ষেত্রে মধ্য-সত্তরে ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’ গেয়ে প্রমাণ করেছেন তিনি আসলে পাকিস্তানপ্রেমীও নন। তার সুনির্দিষ্ট বা নিজস্ব কোনো মতাদর্শ ছিল বলে মনে হয় না। কখনও-কখনও মনে হয় শাহনাজ একজন কণ্ঠরোবট; যে গীতিকার যা লিখে দিয়েছেন, লিরিকে যে সুরকার যে সুর বসিয়ে তার কণ্ঠে বসিয়ে দিয়েছেন; যন্ত্রের মতো তিনি তা-ই গেয়ে দিয়েছেন। রাজনৈতিক ঘটনাচক্রে গানগুলো ইতিহাসে স্থায়ীভাবে খোদাই হয়ে যাওয়ায় শাহনাজ কিংবদন্তির মর্যাদা পেয়ে গেছেন।

শাহনাজ মুক্তিযুদ্ধের কোন পক্ষে ছিলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি কোন রাজনৈতিক বলয়ে ছিলেন— এই দ্বন্দ্বের অবসান হবে না কখনোই। ইত্যবসরে গোটা শাহনাজ-অধ্যায়েরই অবসান ঘটল।

ভারতীয় উপমহাদেশের বিরলকণ্ঠ শাহনাজ আর কখনও গাইবেন না, তার মুখ থেকে আর উচ্চারিত হবে না ‘একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়’ কিংবা ‘একতারা, তুই দেশের কথা বল রে এবার, বল।’ শাহনাজ যার কাছে যা-ই হন না কেন; শাহনাজ আমার কাছে একজন সার্থক শিল্পী হয়ে থাকবেন, আমার মাঝে শাহনাজ বিরাজ করবেন এক অমীমাংসিত রহস্যমানবী হিসেবে।

(আখতারুজ্জামান আজাদ, ঘাটাইলডটকম)/-