শব-ই-বরাতের তারিখ নির্ধারণ বিতর্কে আদালতের সিদ্ধান্ত ১৭ এপ্রিল

শাবান মাসের চাঁদ দেখা নিয়ে হাইকোর্টে দেয়া আবেদনকারীর বক্তব্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালককে লিখিত আকারে গ্রহণ করার জন্য বলেছেন আদালত। একই সঙ্গে আদালত আবেদনকারীকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেছেন।

সোমবার (১৫ এপ্রিল) বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ কথা বলেন। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ সাইফুল আলম। আবেদনের পক্ষে ছিলেন মো. খুরশিদ আলম খান।

পরে মোহাম্মদ সাইফুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, আবুল বাশার মুহম্মদ রুহুল হাসান একটি রিট পিটিশন নিয়ে আসেন কোর্টে। শাবান মাসের তারিখ নিয়ে দ্বিমত দেখা দিয়েছে। তার পক্ষে আইনজীবী খুরশিদ আলম আবেদনটি উপস্থাপন করেন কোর্টে।

আদালত বলেন, এটা ধর্মীয় সেনসেটিভ ইস্যু। এটা আদালতের বিষয়বস্তু না করাই ভালো। আপনাদের (আবেদনকারীদের) বক্তব্য আপাতত ইসলামিক ফাউন্ডেশনে লিখিত আকারে জমা দেন। তারা যদি কনসিডারেশনে না নেন, তাহলে আমাদের কাছে আসবেন। আমরা তখন ব্যবস্থা নেব।

তিনি আরও বলেন, আদালত বলেছেন ডিজিকে (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) জানাতে, যেন আবেদনকারীদের আবেদন গ্রহণ করেন। এবং ১৭ তারিখের মিটিংয়ে আলোচনায় নেন। খুরশিদ আলম খান জানান, আদালত অপেক্ষা করতে বলেছেন ১৭ তারিখ পর্যন্ত। এর মধ্যে আবেদনকারীদের লিখিত আবেদন নিতে বলেছেন।

জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির বৈঠকের পর ইসলামিক ফাউন্ডেশন (ইফা) গত ৬ই এপ্রিল জানিয়েছিলো যে আগামী ২১ই এপ্রিল [রবিবার] দিবাগত রাতে মুসলমানদের শব-ই-বরাত পালিত হবে। তারা বলেছিলো: “ওই দিন [৬ই এপ্রিল] দেশের কোথাও চাঁদ দেখা যায়নি। সে কারণে ৮ই এপ্রিল সোমবার থেকে শাবান মাস গণনা শুরু হবে।”

ইফা সচিব কাজী নূরুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ৬৪ জেলার প্রতিটিতে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে যে কমিটি রয়েছে সেসব কমিটি ও আবহাওয়া অফিস থেকে প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করে শাবান মাস ও শব-ই-বরাতের বিষয়ে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিলো।

মিস্টার ইসলাম বলছেন, চাঁদ দেখা কমিটিগুলোতে ডিসি, থানা নির্বাহী কর্মকর্তা, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি ছাড়াও স্থানীয় আলেমদের প্রতিনিধিরা থাকেন।

“দেশের প্রতিটি জেলা কমিটি নিশ্চিত হয়ে জানিয়ে ছিলো যে তাদের জেলায় কেউ চাঁদ দেখেনি সেদিন [৬ই এপ্রিল]।”

জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির যে সভায় ২১শে এপ্রিল শব-ই-বরাত পালনের সিদ্ধান্ত হয়েছে তাতে সভাপতিত্ব করেছিলেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী নিজেই।

ধর্ম সচিবসহ মন্ত্রণালয়, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারা ছাড়াও মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন এবং আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রতিনিধিরা ওই বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন।

কমিটির সদস্য তালিকায় কয়েকটি মসজিদের খতিব ও ইমামসহ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ আলেমও রয়েছেন।

কিন্তু চাঁদ দেখা নিয়ে ইফা’র সিদ্ধান্ত সঠিক নয় দাবি করে মজলিসে রুইয়াতুল হিলাল নামে একটি সংগঠন।

মজলিসে রুইয়াতুল হিলালের প্রেসিডেন্ট এ বি এম রুহুল হাসান বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, তারা নিয়মিত চাঁদ পর্যবেক্ষণ করেন এবং চাঁদ সংক্রান্ত গবেষণার পাশাপাশি সারাদেশে তাদের স্বেচ্ছাসেবীরাও চাঁদ উঠেছে কি-না সেটি দেখতে কাজ করেন।

“যেদিন আমরা চাঁদ খুঁজি তার আগেই আমরা তা অনুধাবন করি। কয়েকটি প্যারামিটার আছে। সবগুলো প্যারামিটারেই অত্যন্ত সম্ভাবনা ছিলো।”

তিনি জানান: “সেদিন কিছু জায়গায় আকাশ মেঘলা ও কিছু জায়গায় পরিষ্কার ছিলো। সেজন্যই স্বেচ্ছাসেবীদের আমরা বিশেষভাবে দৃষ্টি রাখতে বলেছিলাম।”

তার দাবি, ৬ই এপ্রিলেই খাগড়াছড়িতে চাঁদ দেখা গেছে ৬টা ৩৫মিনিটে যা স্থানীয় পর্যায়ে অনেকে দেখেছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, মুন্সিগঞ্জেও চাঁদ দেখা গেছে সেদিন।

“আমরা বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে জানিয়েছিলাম। ইসলামিক ফাউন্ডেশনকেও জানিয়েছিলাম। কিন্তু তারা কেউ আমলে না নিয়ে শাবান মাস ও শব-ই-বরাতের তারিখ ঘোষণা করেছেন।”

এ বি এম রুহুল হাসান বলেন, শরিয়ত অনুযায়ী দুজন মুসলমান পুরুষ যদি চাঁদ দেখেন তাহলে তার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে।

“আমরা খাগড়াছড়ি ও মুন্সিগঞ্জ থেকে সতেরো জন সাক্ষী এনেছিলাম, যার মধ্যে মসজিদ মাদ্রাসার ইমামও রয়েছেন।”

মজলিসে রুইয়াতুল হিলালের পক্ষ থেকে পরে সংবাদ সম্মেলন করা হলে জরুরি সভা ডাকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন।

ইফা সচিব কাজী নূরুল ইসলাম বলেন, ভিন্নমত আসায় শনিবার তারা বৈঠক করেছেন যেখানে ভিন্নমত প্রদানকারীরাও যোগ দিয়েছিলেন।

“আমরা আলেম-ওলামাদের সমন্বয়ে এগারো সদস্যের একটি উপ-কমিটি করেছি। আশা করছি আগামী দুদিনের মধ্যেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আমরা পাবো।”

তবে মজলিসে রুইয়াতুল হিলালের প্রেসিডেন্ট এবিএম রুহুল হাসান বলেন, ওই বৈঠকে তাদের বক্তব্য ঠিক মতো শোনা হয়নি।

তিনি বলেন, “২০শে এপ্রিল শব-ই-বরাত পালনের কথা। অথচ তারা ২১শে এপ্রিল [পালনের] ঘোষণা দিয়েছে।”

“কিন্তু আমরা চাই শরিয়ত অনুযায়ী কাজ হোক। সঠিক তারিখে হোক। ধর্মীয় চেতনা থেকেই এটা বলছি আমরা।”

জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটিতে আছেন এমন কয়েকজন বলছেন, দেশে একটি সম্প্রদায় আছে যারা একদিন আগে রোজা শুরু বা ঈদ পালন করে তাদেরই একটি অংশ এবার ‘শব-ই-বরাত নিয়ে বিতর্ক তৈরির চেষ্টা করছে’।

যদিও ভিন্নমত পোষণকারী মজলিসে রুইয়াতুল হিলালের প্রেসিডেন্ট এবিএম রুহুল হাসান বলছেন, চাঁদ দেখার বিষয়টি যথাযথ পালনর সক্ষমতাই ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নাই।

“চাঁদের জন্ম ও দেশের আকাশে চাঁদ দেখা যাওয়া এগুলোর যথাযথ প্রশিক্ষিত পর্যবেক্ষকও এ প্রতিষ্ঠানটির নেই। সে কারণেই চাঁদ দেখা নিয়ে সমস্যা হয়।”

“আবার স্থানীয় পর্যায়ে কেউ চাঁদ দেখলে সেটি প্রশাসনকে জানানোও সহজ কাজ নয়। ফলে অনেকে দেখেও আগ্রহী হননা।”

তবে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বলছে, খালি চোখে দেখা না গেলে তখন বাংলাদেশের আবহাওয়া বিভাগ ও মহাকাশ গবেষণার সাথে জড়িতরা চাঁদ নিয়ে নির্ভুল তথ্যই দিয়ে থাকে বলে মনে করেন তারা। সে কারণেই এ নিয়ে বিভ্রান্তির অবকাশ নেই বলে মনে করছেন তারা। কিন্তু যেহেতু এখন একটি উপ-কমিটি কাজ করছে তাই আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য তারা করতে রাজী হননি।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের যে বিভাগটি চাঁদ দেখার মূল দায়িত্ব পালন করেন সেটি হলো প্রতিষ্ঠানটির দ্বীনি দাওয়াত ও সংস্কৃতি বিভাগ।

বিভাগটির কর্মকর্তারা বলছেন, সাধারণত ঢাকায় ধর্ম মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে বৈঠকে বসেন চাঁদ দেখা কমিটির সদস্যরা। এ কমিটির মাধ্যমেই প্রতিমাসের চাঁদ দেখার সিদ্ধান্ত জানানো হয়।

এই মূল চাঁদ দেখা কমিটির সাথে একযোগে প্রতিটি জেলায় একটি করে কমিটি কাজ করে। দেশের কোথাও চাঁদ দেখা গেলে সেটি স্থানীয় প্রশাসন বা ইসলামিক ফাউন্ডেশন সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে জেলা কমিটির কাছে পৌঁছায়।

পরে জেলা প্রশাসন দ্রুত সেটি নিশ্চিত করে বিভিন্ন ভাবে- যেমন স্থানীয় অনেকে চাঁদ দেখেছে কি-না কিংবা স্থিরচিত্র বা ভিডিও চিত্র এসব দ্রুত সংগ্রহ করে নিশ্চিত হয়ে থাকে স্থানীয় প্রশাসন।

(বিবিসি, যুগান্তর, ঘাটাইলডটকম)/-

224total visits,2visits today