রুটির দোকান থেকে দেলদুয়ারের রাসেল এখন স্কুলে

ছোট্ট ছেলে রাসেল। বয়স এগারোর মতো। ভারী লাবণ্যময় চেহারা। বড় বড় দুটি চোখে বিস্ময়কর চাহনি। ভীষণ চঞ্চল হলেও স্বভাবটি মনকাড়া। সময়বয়সীদের সঙ্গে মেশার মতো সময় রাসেলের হাতে নেই। সকাল হলেই নানার রুটির দোকানে। চলে সন্ধ্যাঅব্দি। দোকানে ক্রেতাদের ভিড়ে বন্ধুদের সঙ্গ পাওয়াটা অনেকটাই ভুলে গেছে রাসেল। ওর জীবন যেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ছোটবেলার দুখু মিয়ার গল্পের প্রতিচ্ছবি। তবে রাসেলের বাড়ি আসানসোল শহরে না। রুটির দোকানটা টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার সদরে দক্ষিণ বাজারে কদমতলা পুরাতন থানার সামনে।

বছর ১৪ আগে উপজেলার কুমারজানী গ্রামের বাবলু মিয়ার সঙ্গে বিয়ে হয় দেলদুয়ার উত্তর পাড়ার নারজিনের। বাবা বাবলু মিয়া ও মাতা নারজিন বেগমের ঘরেই রাসেলের জন্ম। সামান্য মনোমালিন্যে নারজিন ও বাবলুর মধ্যে ঘটে বিবাহ বিচ্ছেদ। মায়ের সঙ্গে নানাবাড়ি আসতে হয়েছে রাসেলকেও। বাবা থাকতেও যেন বাবাহারা রাসেল।

কুমারজানীতে রাসেল স্কুলে যাওয়া শুরু করলেও গত পাঁচ বছরে নানার বাড়িতে থেকে বর্ণটাও এখন রাসেলের কাছে অচেনা। নানার অর্থনৈতিক অবস্থাও ভালো না। সরকারি জায়গায় ঝুপরি তুলে বিনা ভাড়ায় রুটির দোকান করে সংসার চালাচ্ছে আব্দুল আজিজ। এরপর সংসারে যোগ হয়েছে মেয়ে নাজরিন ও রাসেলসহ তিন নাতি-নাতনি।

কিন্তু নিজের গ্রাম ছেড়ে নানার বাড়িতে তার মন ভালো লাগত না। একা একা গ্রামে ঘুরে বেড়াতো রাসেল। দেখত প্রকৃতির সৌন্দর্য।

দুমুঠো খাবার যেন দারিদ্র পরিবারে অনেকটাই দুষ্প্রাপ্য। এই সময়ে হাতেখড়ি শিক্ষাটুকুই যেন শেষ পড়ালেখা। সাত বছর বয়সেই তাকে লেখাপড়া ছেড়ে আয়ের পথ খুঁজতে হয়েছে। তাই রাসেলকেও নিয়মিত থাকতে হয় রুটির দোকানে। মাকেতো অন্তত খাবার দিতে হবে। রুটি তৈরির বেলুন টানতে গিয়ে কলম টানাটা ভুলেই গেছে রাসেল। প্রতিদিন কতো ক্রেতা দোকানে যায় আসে। কারো চোখ পড়েনি এতো ছোট বয়সের শিশুটি কেন এই রুটির দোকানে। এটা যে নিতান্তই শিশুশ্রম কোনো ক্রেতা কখনো হিসাব করেই দেখেননি।

সংসারের অভাব অনটনের জন্য অর্থ রোজগার করতে হলেও রাসেলের পড়ার আগ্রহ কমেনি। তার খুব ইচ্ছা স্কুলে পড়ার। কিন্তু লেখাপড়া করার মতো সুযোগ কোথায় তার। এদিকে এই কাজে তেমন রোজগার নেই। নিজের পেট চালাতে হবে, মায়ের খরচের টাকাও জোগাড় করতে হবে। কিন্তু এত কষ্টের কাজ আর কতো দিন। তবুও ভেঙে পড়েননি রাসেল। গত পাঁচ বছর ধরে চলছে এই কাজ।

গত নভেম্বরের মাঝামাঝি সময় ওই সড়ক ধরেই যাচ্ছিলেন দেলদুয়ার উপজেলা প্রাক্তন নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহাদত হোসেন কবির। স্থানীয় দুই স্কুল শিক্ষার্থীর মাধ্যমে শিশু শ্রমের বিষয়টি নজরে আসে ইউএনওর। রুটির দোকানে হারিয়ে যাওয়া রাসেলের শৈশব দেখে ক্রেতা হয়ে রুটির দোকানে গেলেন ইউএনও। রাসেলের কাজ দেখছেন ওই কর্মকর্তা। নানাকে রুটি বানানোতে সাহায্য করছে রাসেল। তারপর গরম রুটি প্লেটে করে পরিবেশন। কথা বললেন রাসেলের নানার সঙ্গে। শোনালেন ওর কষ্টের কাহিনি। বাপ নিরুদ্দেশ। নানাই এখন রাসেলের অভিভাবক।

নানাকে বললেন, ‘আপনার নাতির শৈশব গরম পরোটার সঙ্গে ভাজতে ভাজতে পুড়িয়ে দিচ্ছেন। আর পোড়ানো যাবে না। নাতিকে দিতে হবে স্কুলে।’ নানা অসহায়ের হাসি হাসেন। ‘স্যার, আমার বয়স হইছে। একা তো কিছু করবার পারুম না। আর রুটির দোকানটাই তো ভরসা।’ ওই কর্মকর্তা রাসেলের নানাকে বললেন, ‘আপনার জন্য একটা বয়স্ক ভাতার ব্যবস্থা করি। প্রয়োজনে আরও দেখব। কিন্তু কোনোভাবেই রাসেলকে আটকাতে পারবেন না। ওকে ওর ভবিষ্যৎ ডাকছে।’ নানা আবার হেসে ওঠেন। তবে এবার আর অসহায়ের মতো নয়।

তখন তিনি দেলদুয়ার সরকারি মডেল স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. আ. হালিম মিয়ার সঙ্গে রাসের ভর্তির বিষয়ে কথা বললেন। বছরের শরুতে মডেল স্কুলের প্রধান শিক্ষক রাসেলকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করে নিয়েছেন। রাসেলের হাতে এখন নতুন বই। রুটির দোকান থেকে রাসেল এখন বই-ব্যাগ নিয়ে শ্রেণি কক্ষের ব্রেঞ্চে। ওই কর্মকর্তা শিশুশ্রমমুক্ত দেলদুয়ার গড়তে নানা পদক্ষেপ হাতে নিয়েছিলেন। ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, পথশিশুদের আনন্দময় শৈশব।

রাসেলের নানা সেই রুটির দোকানদার আব্দুল আজিজ বলেন, কুড়িগ্রাম থেকে আসা দেলদুয়ার উপজেলার কুমারজানী গ্রামের বসবাসরত শাহজালালের ছেলে বাবলু মিয়ার সঙ্গে তার মেয়ে নারজিনের বিয়ে হয় প্রায় ১৪ বছর আগে। বিয়ের পর রাসেল (১১), রাজিয়া (৮) ও ইমু (৫) তিন সন্তান হওয়ার পর নারজিনকে ছেড়ে দেন স্বামী। পরে বাবলুর বিরুদ্ধে আব্দুল আজিজের দায়ের করা মামলার রায় বাবলুর বিরুদ্ধে গেলে বাড়িঘর বিক্রি করে নিরুদ্দেশ হয় বাবলু মিয়। গত পাঁচ বছর ধরে আজিজ মিয়ার সংসারে যোগ হয়েছে রাসেলরা চারজন।

তিনি বলেন, ইউএনও স্যারকে কথা দিয়েছি আমি রাসেলকে পড়াবো। স্কুলেও পাঠাচ্ছি। এখনো মাঝে মাঝে দোকানে রাখি সহযোগিতা করার জন্য। এই দোকাটাই তার একমাত্র আয়ের উৎস। দোকানের উপার্জনেই চলে সংসার। একা দোকান চালানো কষ্ট। দোকান না চালালেও সংসার চলে না। তাই ওকে দোকানে আনতে হয়।

রাসেলের নানা আরও বলেন, ইউএনও স্যার আমাকে একটি বয়স্কভাতার কার্ড দিতে চেয়েছিলেন। সব কাগজপত্র সমাজসেবা অফিসে জমা দিয়েছি। কিন্ত জাতীয় পরিচয়পত্রে বয়স ৬১ বছর থাকায় ভাতাটাও পাইনি। কোনো ভাতার আওতায় এনে সরকারি সহযোগিতা করলে রাসেলকে লেখাপড়া ও ফিরে আসা মেয়েসহ তিন সন্তানদের ভরণপোষন করা সম্ভব হবে বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, ওই ইউএনও বদলি না হলে হয়তো এতোদিন ওদের জন্য কোনো সহযোগিতা পেতাম।

দেলদুয়ার মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আ. হালিম মিয়া বলেন, গত নভেম্বরে জেএসসি পরীক্ষা চলাকালে প্রাক্তন ইউএনও আমাকে রাসেলকে ভর্তির ব্যাপারে কথা বলেন। নতুন বছর শুরুতেই রাসেলকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়েছে। নতুন বই পেয়ে রাসেল নিয়মিত ক্লাস করছে। আমরা ওর উপবৃত্তি নিশ্চিত করেছি।

এদিকে ওই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আল মামুন বলেন, ওর বয়স অনুযায়ী চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি করা উচিত। কিন্তু পড়ালেখায় থেকে ছিটকে পড়ায় এটা সম্ভব হয়নি। আমরা রাসেল বাড়তি যত্ন নিচ্ছি। যদি ওর অবস্থা একটু উন্নতি হয় প্রয়োজনে ওকে উপরের ক্লাসে স্থানান্তর করা যেতে পারে।

ওই সহকারী শিক্ষক আরও বলেন, এখন বিনা বেতনে পড়ছে, বাড়তি যত্ন নেওয়া হচ্ছে। প্রধান শিক্ষক খাতা কলম কেনারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে উচ্চ বিদ্যালয়ে উঠলে খরচ বাড়বে। এজন্য রাসেলের মতো অসহায় শিশুদের প্রতি সরকারের সুদৃষ্টি আশা করেন তিনি।

দেলদুয়ার উপজেলার প্রাক্তন নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহাদত কবির বলেন, ‘আমরা দেখেছি, চরম দারিদ্র্যের কারণে অনেক শিশু অভিভাবকদের চাপে অথবা কখনো নিজেরাই লেখাপড়া বাদ দিয়ে জীবিকা উপার্জনের জন্য কাজে নামতে বাধ্য হয়। ফলে যে বয়সে তাদের দলবেঁধে স্কুলে যাওয়ার কথা, সেই বয়সে তারা অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত হচ্ছে। আমরা তাদেরকে চিহ্নিত করে পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে স্কুলের পড়াশোনা ও আনন্দময় শৈশবের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছি। রাসেলের বিষয়ে স্থানীয় দুই স্কুলছাত্রের কাছে তথ্য পেয়ে আমি নিজে তার নানার রুটির  দোকানে গিয়ে কথা বলি। ওর নানাকে সবকিছু বুঝিয়ে বলায় আর না করেননি। তবে দেলদুয়ার মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এগিয়ে না এলে এটি আলোর মুখ দেখত না। এর আগেও ফাজিলহাটী ও দেউলী ইউনিয়নে একাধিক শিশুশ্রমিককে এলাকাবাসীর সহায়তায় স্কুলে ভর্তি করে দেয়া হয়েছে। সবাই যদি এভাবে সহযোগিতা করেন, তাহলে আমাদের সমাজ থেকে শিশুশ্রম দূর করা কঠিন কোনো বিষয় হবে নয়।

(রেজাউল করিম, ঘাটাইল ডট কম)/-

220total visits,2visits today