রানা প্লাজা ধ্বসের ৬ বছরে যেমন আছেন ক্ষতিগ্রস্থরা

৬ বছর আগে ২০১৩ সালের ২৩ এপ্রিল ঢাকার সাভারে রানা প্লাজা ধ্বসে মৃত্যু হয় ১,১৫৩ জন শ্রমিকের৷ বিশ্বে তৈরি পোশাক শিল্পের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী এ দুর্ঘটনার পর বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে দেশের প্রধান রপ্তানি খাতটিকে৷

রানা প্লাজা, আট তলা একটি ভবন, যার চারতলাই নির্মাণ করা হয়েছে অনুমোদন ছাড়া৷ ভবনটির নকশা করা হয়েছিল দোকান আর অফিসের জন্য, কিন্তু সেখানে গড়ে ওঠে একাধিক কারখানা৷ ভারি যন্ত্রপাতি আর সেগুলোর কম্পন বহন করার সক্ষমতা ছিল না ভবনটির৷ রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানা ছিলেন স্থানীয় যুবলীগের সদস্য৷

দুর্ঘটনা, না হত্যা?

২৩ এপ্রিল, ২০১৩ সাল৷ ফাটল দেখা দেয়ায় ভবনটি খালি করে দেয়া হয়৷ বন্ধ করে দেয়া হয় নীচ তলার দোকান আর ব্যাংকের কার্যালয়৷ স্থানীয় গণমাধ্যমে সোহেল রানা তখন দাবি করেন, ভবনটি সম্পূর্ণ নিরাপদ৷ বেতন কাটার হূমকি দিয়ে পরের দিন জোর করে কাজে যোগ দিতে বাধ্য করা হয় শ্রমিকদের৷ সেদিন সকালেই ধসে পড়ে রানা প্লাজা৷

২৪ এপ্রিল, ২০১৩ সাল৷ ৩১২২ জন শ্রমিক রানা প্লাজায় ব্যস্ত ছিলেন পোশাক তৈরিতে৷ তাঁদের নিয়েই ধসে পড়ে বিশাল ভবনটি৷ প্রাণ হারান ১১৫৩ জন শ্রমিক৷ বাকিরা বেঁচে গেলেও, অনেকেই পঙ্গু হয়ে যান৷ অনেকে আজও ভুগছেন মানসিক যাতনায়৷

যেমন আছেন ক্ষতিগ্রস্থরা

আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা অ্যাকশনএইড সম্প্রতি একটি জরিপ করেছে৷ তাদের জরিপ অনুযায়ী রানা প্লাজা ধসে আহত শ্রমিকদের ৫১ ভাগ এখনো বেকার৷ ৭৪ ভাগ শারীরিক কারণে আর ২৭ ভাগ মানসিক দুর্বলতার কারণে এখনো কাজ করতে পারছেন না৷ আহতদের সাড়ে দশভাগ এখন ট্রমায় রয়েছেন৷

এ ঘটনায় আহত হন ২,৪৩৮ জন৷ মোট পাঁচটি পোশাক কারখানায় পাঁচ হাজারের মতো শ্রমিক কর্মরত ছিলেন৷ আহত শ্রমিকদের ৪৮ দশমিক সাত শতাংশ এখনও কোনো কাজ করতে পারছেন না৷

রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় ওই ভবনের কারখানা শ্রমিকরা কেবল পঙ্গুই হননি, হারিয়েছেন ঘর-সংসারও। কোনও কোনও আহত-পঙ্গু শ্রমিক শারীরিক সক্ষমতা হারিয়ে মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েন। এর ফলে অনেকেরই স্ত্রী ও স্বামী তাদের ছেড়ে চলে গেছেন।

আহত একজন হৃদয় জানান, ‘দীর্ঘদিন চিকিৎসা নেওয়ার পরও সুস্থ হতে পারিনি। পাঁজরের হাড় ভেতরের দিকে ঢুকে গেছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। তারওপর একটি পা অবশ হতে থাকে। ক্র্যাচে ভর দিয়ে চলতে গেলেও আরেকজনের সাহায্য লাগে। এমন অবস্থা সইতে না পেরেই, আমার স্ত্রী আমাকে ফেলে চলে গেছেন। গর্ভের সন্তানও নষ্ট করেছেন। নানাভাবে চেষ্টার পরও, ২০১৫ সালের জুন মাসে চূড়ান্ত বিচ্ছেদ ঘটিয়ে তিনি ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দিয়েছেন।’

যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে আছেন পোশাককর্মী জেসমিন আক্তার (২৮)। তিনি এখন সাভারের সবুজবাগ এলাকার খান সাহেবের বাড়িতে ভাড়া থাকেন। ক্ষতিপূরণের টাকায় একটি মুদি দোকান দিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। রানা প্লাজার দুর্ঘটনায় আঘাত পেয়েছিলেন হাত, পা ও মাথায়। ভেঙে গেছে তার মেরুদণ্ড। মাঝে-মধ্যেই পা থেকে কোমর পর্যন্ত প্রচণ্ড ব্যথায় অচেতন হয়ে পড়ে থাকেন জেসমিন। ৬ বছরের কন্যাসন্তান ছাড়া তার কাছে আর কেউ নেই। শারীরিক সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন, এটি বুঝতে পেরেই গত বছর তার স্বামী তাদের ফেলে চলে গেছেন।

প্রসঙ্গ তুলতেই জেসমিন আক্তার প্রচণ্ড ক্ষোভে থরথর করে কাঁপতে থাকেন। ফের শান্ত হয়ে জানান, ‘এখন আমার মেজাজ খিটখিটে হয়ে গেছে। সবসময় মেয়েটাকে গাল-মন্দ করি। শব্দ হলেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। সারারাত ঘুমাতে পারি না। খালি পায়চারি করি।’ আবেগ-তাড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, ‘আমি যখন চাকরি করতাম, তখন ছিল আমার সুখের সংসার। এখন আমি দরজা বন্ধ করে হু-হু করে কাঁদি। কাউকে বলতে পারি না আমার কষ্টের কথা। মনে হয়, আমি মরে গেলেই শান্তি পেতাম। কিন্তু মেয়েটার কথা ভেবে মরতেও পারি না।’

ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়া

আহত ও নিহতদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য রানা প্লাজা ধসের ৬ মাস পর জেনেভায় একটি উদ্যোগ নেয় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও৷ পরবর্তীতে সরকার, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডসহ বিভিন্ন পক্ষকে নিয়ে গঠিত হয় ‘রানা প্লাজা কো অর্ডিনেশন কমিটি’, যার মাধ্যমে ২০১৫ সালে এসে ক্ষতিপূরণ দেয়ার প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত হয়৷ মোট ৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার দেয়া হয়েছে নিহতদের পরিবার ও আহতদের৷

রানা প্লাজায় যে ৫ টি কারখানা ছিল, সেগুলোর ক্রেতাদের মধ্যে ছিল ওয়ালমার্ট, সিঅ্যান্ডএ, কিক-এর মতো কয়েকটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ড৷ পোশাক কারখানাগুলোর কর্মপরিবেশ নিয়ে এ সময় তারা ব্যাপক সমালোচনার মধ্যে পড়ে৷ ইউরোপ, অ্যামেরিকার সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংগঠন এসব ব্র্যান্ডের স্টোরের সামনে বিক্ষোভ করেন৷

সমালোচনার মুখে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলো পরিদর্শন ও সংস্কারের উদ্যোগ নেয় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও বিভিন্ন সংগঠন৷ ইউরোপীয় ব্র্যান্ডগুলোর নেতৃত্বে গঠিত হয় অ্যাকর্ড আর অ্যামেরিকার ব্র্যান্ডগুলোর প্রাধান্যে গড়ে ওঠে অ্যালায়েন্স৷ যেসব কারখানা থেকে ব্র্যান্ডগুলো পোশাক কেনে, সেগুলোর ত্রুটি বের করে সংস্কারের নির্দেশনা দেয় এই দুটি জোট৷

নিরাপদ কর্মপরিবেশের নিশ্চয়তা, অ্যাকর্ড নিয়ে জটিলতা, শক্তিশালী রপ্তানি প্রবৃদ্ধি

অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের অধীনে আছে ২২৫৪ টি কারখানা৷ ৫ বছরে তারা ত্রুটির প্রায় ৯০ ভাগই সারিয়েছে৷ যেসব কারখানা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, সেগুলো বন্ধ করে দিয়েছে সরকার৷ সংস্কার না করায় ১৯৪ টি কারখানাকে ব্যবসার অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে৷ ৬২৫ টি কারখানা প্রাথমিক সংস্কারের কাজ পুরোপুরি শেষ করেছে৷

সরকারের সাথে চুক্তি অনুযায়ী গত বছর পর্যন্ত কাজের মেয়াদ ছিল অ্যাকর্ড ও অ্যলায়েন্সের৷ এর মধ্যে অ্যালায়েন্স নিজেদের গুটিয়ে নিলেও মে ২০২১ সাল পর্যন্ত মেয়াদ বৃদ্ধি করেছে অ্যাকর্ড, যার বিরোধিতা করে আসছেন কারখানা মালিকরা৷ মামলাও করেছে একটি প্রতিষ্ঠান৷ কয়েক দফা পেছানোর পর ১৯ মে যার পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করেছে সুপ্রিম কোর্ট৷

রানা প্লাজা ধসের পর অনেকেই মনে করেছিলেন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে এর বড় ধরণের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে৷ তেমনটা না হলেও পোশাক কারখানা সংস্কারের উদ্যোগ আর অনেক কারখানা বন্ধ হওয়ায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি তলানিতে নেমে যায়৷ তবে গত দুই বছরে তার গতি আবার বেড়েছে৷ চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত রপ্তানি বেড়েছে সাড়ে ১২ ভাগের বেশি৷

(ডয়চেভেলে বাংলা, ঘাটাইলডটকম)/-

310total visits,1visits today