যমুনাপারের মানুষদের কান্দন ছাড়া উপায় কই’

ত্রাণের গাড়ি এসেছে। গাড়ি থেকে যেই ত্রাণের প্যাকেট বের করা হয়, হুড়োহুড়ি পড়ে যায় বন্যাদুর্গতদের মাঝে। জামালপুরের সরিষাবাড়ী পৌরসভার ঝালোপাড়া থেকে গতকাল দুপুর ১২টায় তোলা ছবি l

‘বাপু, বিয়ানবেলা থেকে খাইনি। আমার নামটি লিহেন। স্বামী নেঙ্গা (পা ভাঙা) মানুষ। কিছু একটা দিলে তাঁরে খাওয়াতাম। কাছে কোনো খাউন নাই। তিন-চার দিন ধইরা এক বেলাও খাইয়া থাকতে হইতেছে। রিলিফ ছাড়া আমগরে চলবে কেমনে। বেশি করে রিলিফ দেন। আমগরে বাঁচান।’

কথাগুলো জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার গুঠাইল এলাকার ছবুরা বেগমের। তিনি আশ্রয় নিয়েছেন পূর্ব বামনা বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধে। সেখানে পলিথিন ও বাঁশের বেড়া দিয়ে ছোট ছোট ছাপরা তুলে তিন শতাধিক পরিবার বাস করছে।

গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে নৌকায় করে পূর্ব বামনা বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধে যান এ প্রতিবেদক। সেখানে একটি মসজিদের সামনে নৌকা থামাতেই ত্রাণপ্রত্যাশী মানুষ তাঁদের নাম লেখানোর জন্য আকুতি জানান।

এ সময় জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘যমুনাপারের মানুষগর কান্দন ছাড়া উপায় কই। প্রতিবছর বান আমগরে ভাসায়। পরে নদী ভাঙে। টানা এক হপ্তাহ ধইরা ঘরবাড়ি ছাইড়া বান্দের ওপর আছি। রিলিফ পাইছি একবার। ওই দিয়ে কি আমগরে চলে? বানের পানির লগে যুদ্ধ কইরে বাঁইচে রইছি। নদী কয়বার ঘরবাড়ি ভাঙছে। বছরে দুইবার করে বান তো আছেই। তাই বান্দের ওপরেই পড়া আছি।’

সরেজমিনে ইসলামপুরের গুঠাইল, পূর্ব বামনা, জারুলতলা, বেলগাছা ও মাঝিপাড়া গ্রামে দেখা যায়, নদীর পানি কিছুটা কমতে শুরু করেছে। তবে এখনো বাড়িঘরে বুকসমান পানি। গ্রামগুলো মানুষশূন্য। তবে নৌকা দেখলেই মানুষ ত্রাণের জন্য ছুটে আসে।

গুঠাইল বাজারে আশ্রয় নিয়েছে পাঁচ শতাধিক পরিবার। এখানে আশ্রিত বেলগাছা গ্রামের সুক্কুর আলী বলেন, ‘এবারের বান আমগরে সব শেষ করছে। ঘরবাড়ি ও কষ্ট করে গড়ে তুলা মাঠের ফসল নষ্ট হইল। বানের কারণে সব হারিয়ে এই বাজারে পরিবার নিয়ে পইড়ে আছি। আমগরে যে পরিমাণ ক্ষতি হয়ছে পাঁচ বছর চেষ্টা করেও হসুল করতে পারব না। বানের পানি বেশি থাহার সময় এমপি-মন্ত্রীরা বলে সব ক্ষতি পুষিয়ে দিবে। কিন্তু পরে আমরা আর কিছুই পায় না। কইদিন ধরে এখানে পইড়ে আছি। একদিন কিছু চিড়া ও গুড় পায়ছি। এরপর আর কেউ খুঁজও নেয়নি।’

স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার থেকে জামালপুরে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। জেলায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলা ইসলামপুর। এখানে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৭০০ মানুষ বন্যাদুর্গত। এ পর্যন্ত এখানে ১৪৫ মেট্রিক টন চাল ও ৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকার ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া মেলান্দহ ও মাদারগঞ্জের সব ইউনিয়ন, সদরের কিছু অংশ, দেওয়ানগঞ্জ, সরিষাবাড়ী, বকশীগঞ্জসহ পুরো জেলায় ৬ লাখ ৬০ হাজার ৫০২ জন মানুষ এখন বন্যাকবলিত।

জানতে চাইলে ইসলামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ বি এম এহসানুল হক গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিদিন কোনো না কোনো গ্রামে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৫০ থেকে ৬০ হাজার মানুষ ত্রাণসামগ্রী পেয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব দুর্গত মানুষকে ত্রাণ দেওয়া হবে।

75total visits,1visits today

Leave a Reply