মতামত; সালমানের কাছে সিদ্দিক কি হেরে যাচ্ছে?

বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সৈয়দ ওবায়দুল্লাহ সাজুকে বলি দিয়ে বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকতৃ করার ঘটনা নিয়ে আপাতত উত্তেজনা কেটেছে। একদা খলনায়ক ইউএনও গাজী তারিক সালমানের বিপদ শুধু কাটেইনি তাকে পুরস্কৃত করার তোড়জোড় চলছে। আর দ্রুত সব ঘটনার একের পর এক মোড় পরিবর্তনে এখন পুরো কৃতিত্ব পাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী।

বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, রাখে আল্লাহ মারে কে? ইউএনও তারিক সালমানের ক্ষেত্রে এই প্রবাদটি আসলেই পুরোপুরি মিলে গেছে। বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃত করে রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহারের জন্য যেখানে তার চাকরী নিয়ে সমুহ বিপদ হবার কথা ছিলো, ঠিক সেই অবস্থা থেকে এখন তিনি হিরো বনে গেছেন রাতারাতি। সারাদেশে তার এখন কত নাম ডাক! অথচ যার হবার কথা ছিলো হিরো, সেই মামলাকারী সাজু এখন ঘোর বিপদে আছেন। একেই তো বলে রাখে আল্লাহ মারে কে!

এই ইউএনওকে নিয়ে গত কয়েকদিনে যে লঙ্কাকাণ্ড হলো তাতে আমজনতার মনে হয়েছিলো। দেশে আর কোন সমস্যা নেই। দেশে কোন বন্যা হয়নি। কেউ না খেয়ে নেই। সিদ্দিক নামের কোন ছাত্র পুলিশের গুলিতে চোখের আলো হারায়নি। দেশে সব কিছু ঠিকঠাক মতো চলছিলো। হঠাৎ করে ইউএনও তারিক সালমানের ঘটনা, সব কিছুতে ছন্দপতন ঘটালো! আসলে ব্যাপারটি কি সেইরকম!

সময়ে সঠিক ফোঁড়টা জায়গামতো দিতে সিদ্ধহস্ত বলেই তো দলটির নাম আওয়ামী লীগ। কি চমৎকার! চোখে পানি এসে যায়! এর নামই আওয়ামী লীগ। এরা সর্প হয়ে দংশন করে, ওঝা হয়ে আবার বিষ নামায়। ইউএনও তারেক সালমানের ঘটনাটাই এর জ্বলন্ত প্রমাণ।

বঙ্গবন্ধুর বিকৃত ছবি ছাপানোর জন্য তার বিরুদ্ধে মামলা করলো আওয়ামী লীগ নেতা। তাকে জেলে দিলো জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট! এ খবর শোনার পর এইচ টি ইমাম বিবিসিকে বলেছেন, এই ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী বিস্মিত! এরপর থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু হয় মাতম। ঘটনাচক্রে মামলাকারী আওয়ামী লীগ নেতা হলেন ভিলেন, হলেন দল থেকে বহিষ্কার! ঘটনা এখন আর বঙ্গবন্ধুর ছবির কাছে নেই। ঘটনা মোড় খেয়ে এখন এসে পড়েছে আরো উপরে।

এখন প্রশংসায় ভাসছেন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের রাজন্যব্যক্তিরা। কত দ্রুত এ ঘটনায় রিঅ্যাক্ট করে ইউএনওকে প্রতিকার দেয়া গেছে, সেই জন্য ধন্যবাদ বর্ষাচ্ছেন এখন শ্রীযুক্তর করকমলে! ঘটনাটার সাথে যদি এন্ট্রি পোষ্টের ওই পেটি আমলা না হয়ে অন্য কোন পেশার কেউ হতেন, তাহলে কি সরকার বাহাদুর কিংবা ফেসবুকের তথাকথিত সেলিব্রেটিরা কি একই রকম রিঅ্যাক্ট করতো! আমি বলি করতো না!

এখানেই আমাদের মধ্যে শ্রেণি বৈষম্য, আশরাফ, আতরাফ বিভাজনের মানসিকতা প্রবল! সামনে নির্বাচন। তার আগে একজন ইউএনওকে ক্ষেপানো মানে পুরো আমলাতন্ত্রকে ক্ষেপানো। এটা ভীমরুলের চাকে ঢিল দেয়ার মত। তাই অভিজ্ঞ ধুরন্ধর সাবেক আমলা এইচ টি ইমাম দ্রুত সেটা কব্জা করে প্রধানমন্ত্রীকে ব্যবহার করে এমনভাবে কৌশল খাটিয়েছেন যে, এখন আর পেছনের গল্পটা কারো মনে নেই, কিসের জন্য কি! অনেকে ভুলে গেছেন সালমানের নামটাই।

এখন সবাই ধন্য ধন্য করছেন সরকারকে। আহা, কি দয়ার সরকার। কত দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছেন। কিন্তু মামুলি ছবি নিয়ে কেন সরকারী দলের এত মৌলবাদী ধ্যানধারনা থাকবে, সেটা নিয়ে টু শব্দটি করছি না আমরা কেউই! এর আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কটু কথা বলার অপরাধে কতজনের সাজা হলো, কত শিক্ষকের চাকরী গেলো, কই তা নিয়ে তো আমাদের কারো কোন মাথা ব্যথা হতে দেখলাম না! কারণ, তারা কেউ কোন কেউকেটা ছিলো না।

এদেশে সবাই তেলা মাথায় তেল দিতে চায়! আর সেজন্য বলি, আমরা এখনো আশরাফ আতরাফ ভেদ রেখা অতিক্রম করতে পারিনি। তাই একজন আমলা সালমানের জন্য আমাদের চোখের অশ্রু বর্ষিত হতে হতে চোখ শুকিয়ে যায়। তার জন্য স্বয়ং সরকার প্রধান বলেন, বঙ্গবন্ধুর সঠিক ছবি কেউ আঁকতে পারেনি!  তিনি প্রশংসায় ভাসান ওই আমলাকে। কেন কিসের জন্য তা নিশ্চয় ‍বোঝার বাকী থাকে না। ব্যুরোক্রেসির শক্তিকে নির্বাচনের আগের বছর উপেক্ষা করা এত সোজা হয় কী করে!

তারপরও আমরা ধন্য ধন্য করি তাকে! সেই জন্যই তো বলি। আওয়ামী লীগ একটি রাজনৈতিক দল। যে দলটি সর্প হয়ে দংশন করে ওঝা হয়ে ঝাড়ার পরেও ফুলমার্কস পায় সবার কাছে।

তারিক সালমানের এই ঘটনার পর তথ্যপ্রযুক্তির ৫৭ ধারা এবং ১৯ ধারাসহ যে ধারাগুলো মত প্রকাশের সাথে একেবারেই যায় না তা বাতিল করা হবে কি! প্রধানমন্ত্রী তারিক সালমানের ব্যাপারে যেভাবে দ্রুত হস্তক্ষেপ করলেন, সেরকম কি তিনি আইসিটি আইনের নিবর্তনমূলক এই দুটি ধারা বাতিলে স্বয়ং উদ্যোগি হবেন?  আমরা বরং খুশী হতাম, তিনি যদি সেই দিনই তথ্যপ্রযুক্তি আইনের সংশ্লিষ্ট দুটি ধারা বাতিলের ঘোষণা দিতেন।

তারিক সালমানের এই ঘটনার দিন রাজধানীর শাহবাগে পুলিশের টিয়ারশেলে ছাত্রদের ন্যায্য দাবি দাওয়ার একটি আন্দোলন পুলিশ টিয়ারশেলের আঘাতে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ওই ঘটনায় তিতুমীর কলেজের ছাত্র সিদ্দিকের চোখের আলো নিভু নিভু করছে। আমলাগোত্রকে নিয়ে সারাদেশে যত হৈ চৈ দেখলাম শিক্ষার্থী সিদ্দিকের জন্য তার কণামাত্র চোখে পড়লো না।

যে রাষ্ট্র, যে সমাজে এত বৈষম্য, এত অবিচার। সে রাষ্ট্রের ভবিতব্য ভাল হবে তো! কেন হবে! রাষ্ট্র, সরকার যদি মানবিকতা হারায়, তবে সে রাষ্ট্র কার কাদের?

তিতুমীর কলেজের ছাত্র সিদ্দিকুর স্নাতক শেষে সরকারি চাকরির জন্য বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন। কিন্তু এখন তার কি হবে! কে দেবে মধ্যবিত্ত পরিবারকে সান্ত্বনা! কিঞ্চিত আশার কথা, সিদ্দিকের চোখের আলো ফিরিয়ে আনতে যাবতীয় চিকিৎসার ব্যয়ভার বহনে সরকার পক্ষ সম্মত হয়েছেন। সরকরের উদ্যোগে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও চলছে।

যদিও এ ঘটনার সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও এখনো এর জন্য কোন তদন্ত কমিটি গঠন হতে দেখলাম না আমরা। দেখলাম না সরকারের কোন দায়িত্বশীল ব্যাক্তিকে হাসপাতালে গিয়ে তার চোখের খবর নিতে! এমনকি শিক্ষামন্ত্রীকেও নয়।

উল্টো, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার (ডিএমপি) আছাদুজ্জামান মিয়া সোমবার তাকে দেখার পর সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন, ‘সিদ্দিকুরের কীভাবে আঘাত লাগল, তা খতিয়ে দেখা হবে। তিনি বলেন, এ আঘাত স্যাবোটাজ কি না, তা-ও দেখব।’ একেই বুঝি বলে কাটা গায়ে নুনের ছিটা!

ফেসবুকে একজন লিখেছেন, অন্ধদের কাছে আয়নার কোনো গুরুত্ব নেই, কিন্তু যারা এখনো দেখতে চান তাঁরা আয়নায় স্বদেশের মুখটা দেখুন। তাতে যা দেখবেন, তা কি শাদা ব্যান্ডেজে চোখ বাঁধা সিদ্দিকুরের মতো নয়?

তারিক সালমান আর সিদ্দিক! একই রাষ্ট্রের দুটি নাম! প্রশ্ন হল, সালমান নামের কাছে কি হেরে যাচ্ছে সিদ্দিক নামটি?

মুজতবা খন্দকার : সাংবাদিক, কলামিস্ট।

mujtobantv@gmail.com

75total visits,1visits today