ভারতে পাটপণ্য রফতানিতে ধস; কমেছে ৯০ শতাংশ

বাংলাদেশ থেকে পাটপণ্য আমদানিতে ভারতের উচ্চ হারে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কের প্রভাবে দেশটিতে রফতানি কমেছে ব্যাপক হারে। গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রফতানি ৯০ শতাংশ কমে হয়েছে মাত্র এক কোটি ৭০ লাখ ডলার। এর আগের অর্থবছরে রফতানি হয় ১৮ কোটি ডলারের কিছু বেশি। পাট ছাড়া অন্যান্য পণ্যেরও রফতানিও আগের বছরের তুলনায় আড়াই শতাংশ কমে হয়েছে ৬৭ কোটি ২৪ লাখ ডলার।
গত জানুয়ারিতে পাটপণ্যে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করা হয়। সম্প্রতি সচিবালয়ে পাট উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে এত বেশি হারে রফতানি কমে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক প্রত্যাহারে করণীয় আরও কিছু থাকলে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয় বৈঠকে।

এদিকে, অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ রেখেই বাংলাদেশের সঙ্গে সমঝোতামূলক অংশীদারিত্ব চুক্তি করার প্রস্তাব দিয়েছেন ভারতের বেসরকারি পাটকল মালিকদের সংগঠন ইন্ডিয়ান জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন (আইজেএমএ)। তাদের অভিযোগের ভিত্তিতেই শাস্তিমূলক শুল্কারোপ করা হয়। অংশীদারিত্ব চুক্তির বিষয়ে ভারতের প্রস্তাবে দ্বিমত না করলেও বাংলাদেশের কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে আগের অভিযোগ তুলে নিয়ে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক প্রত্যাহারের সুপরিশ করার শর্ত দিয়েছে বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশেন (বিজেএমএ)। এ শর্তে আইজেএমএ রাজি না হওয়ায় অংশীদারিত্ব চুক্তি আর সামনে এগোচ্ছে না।

২২ বছর ধরে ভারতে পাটের সুতা, ব্যাগ ও কার্পেট ব্যাকিং ক্লথ (সিবিসি) রফতানি করছে উত্তরা জুট মিল। ছয় মাস আগে অ্যান্টি ডাম্পিং ডিউটির কারণে দেশটিতে তাদের পণ্য রফতানি এক রকম বন্ধ। ভারতীয় বাজারকে টার্গেট করে উৎপাদিত এক হাজার টন সিবিসি ও এক হাজার বেল বস্তা নিয়ে বিপাকে পড়েছে কারখানা কর্তৃপক্ষ। কারখানার পরিচালক বিজয় কুমার মোদি বলেন, দেশটির একরোখা সিদ্ধান্তের কারণে বন্ধ হতে বসেছে তাদের কারখানা। অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক আরোপের পর রফতানি হয়েছে খুব সামান্যই। যা গেছে তাতেও লোকসান গুনতে হয়েছে। মজুদ পাটপণ্য এখন বিকল্প বাজার হিসেবে শ্রীলংকা ও মিয়ানমারে রফতানি করে ক্ষতি কিছুটা কমিয়ে আনার চেষ্টা করছেন তারা। তিনি বলেন, অ্যান্টি ডাম্পিং শুল্ক আরোপের আগে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাদের মিলের যাবতীয় তথ্য চায়। কিন্তু মিলের লাভ-ক্ষতির তথ্য অন্য দেশকে জানাতে হবে কেন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, তথ্য না দেওয়ায় তার কারখানার উৎপাদিত পণ্যে টনে ১৬৫ ডলার শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। তার মতো অবস্থা অন্য রফতানিকারদেরও।
বাংলাদেশ পাটপণ্য উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় কম দামে রফতানি (ডাম্পিং) করছে- এমন অভিযোগে টনপ্রতি সর্বোচ্চ ৩৫২ ডলারসহ বিভিন্ন হারে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করেছে ভারত। ভারতীয় উদ্যোক্তাদের দাবি, বাংলাদেশের ডাম্পিংয়ের কারণে ভারতের স্থানীয় পাটশিল্প সংকটে পড়ে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা। তারা বলছেন, উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় কম দরে রফতানির কোনো যুক্তিই থাকতে পারে না।
বিভিন্ন ধরনের পাটপণ্য হোসিয়ান (চট), সেকিং (বস্তা), সিবিসি (কার্পেট প্যাকিং) ও পাটের সুতা রফতানি হয় ভারতে। উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে পাটপণ্য আমদানিতে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপের কারণে ভারতীয় আমদানিকারকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তারাও চান একটা শান্তিপূর্ণ সমাধান।
বিজেএমএ সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববাজার থেকে সুবিধা আদায়ে সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করতে আইজেএমএর প্রস্তাবটি গত মঙ্গলবার বিজেএমএ সচিবালয়ে এসে পেঁৗছেছে। তবে আরও মাসখানেক আগে এ বিষয়ে একটি ই-মেইল পাঠানো হয় আইজেএমএর পক্ষ থেকে। এতে বলা হয়, বিশ্ববাজার থেকে সুবিধা আদায়ে দু’দেশ সহযোগিতার ভিত্তিতে একসঙ্গে কাজ করতে পারে। বিজেএমএর সচিব আবদুল বারেক খান জানান, ই-মেইল পাওয়ার পর আলোচনার জন্য গত মাসেই ভারত গেছেন সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ সামসুজ্জোহা। কলকাতায় প্রাথমিক আলোচনায় বসে দুই পক্ষ। আলোচনায় তিনি বাংলাদেশের কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তুলে নেওয়ার অনুরোধ জানান। তবে এ প্রস্তাবে রাজি হয়নি আইজেএমএ। তাদের প্রস্তাব, অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক বহাল অবস্থায়ই বাংলাদেশকে সহযোগিতা চুক্তিতে আসতে হবে। দুই পক্ষ শর্তের বিষয়ে অটল থাকায় আলোচনা আর সামনে এগোয়নি। এ কারণে আর দিলি্ল না গিয়ে কলকাতা থেকে ফিরে আসেন বিজেএমএর সভাপতি।

 

(সমকাল/ঘাটাইল.কম)/-