‘ভাইটি আমার হাড়িয়ে গেল, আর কোনোদিন কইবে না কথা’

আমার অনুজ বরেণ্য সাংবাদিক, পরিবেশকর্মী, বহু গ্রন্থপ্রণেতা, টেলিভিশন টকশোর আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব মাহফুজ উল্লাহ আজ আর ইহজগতে নেই। পরপারের ডাকে তার প্রিয়জন, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং গুণমুগ্ধদের ছেড়ে চিরকালের জন্য পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে ২৭ এপ্রিল। তার বয়স হয়েছিল ৬৯ বছর। তিনি চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। ১০ মার্চ তার বাসায় জনাপাঁচেক মানুষ কেক কেটে তার জন্মদিন পালন করেছিলাম। এ সময়ে তার পুত্র-কন্যা-স্ত্রী কেউই তার সঙ্গে ছিল না। তার পুত্রসন্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি কোম্পানিতে চাকরি করে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকেই সে গ্র্যাজুয়েশন করেছিল। তার নাম মুজতবা হাবিব। তার ডাক নাম অন্তিক। তার ছোট মেয়ে নুসরাত অস্ট্রেলিয়ায় শিশু রোগের ওপর পিএইচডি করে সেখানকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার হিসেবে কর্মরত। বড় মেয়ে মুশাররাতও অস্ট্রেলিয়ায় সোশ্যাল ওয়ার্কে মাস্টার্স ডিগ্রি করার জন্য পড়াশোনা করছিল। তার স্ত্রী দিনারজাদী বেগম বেশ কিছুদিন ধরে তার মেয়ের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছিল। এক কথায় পারিবারিক জীবনে সে এক ধরনের নিঃসঙ্গতায় ভুগছিল।

নানা কাজকর্মে জড়িয়ে সে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করত। নিয়মিত টকশোতে অংশগ্রহণ করেও তার কিছু সময় কাটত। আমাদের দুই ভাইয়ের বসবাস ছিল পাশাপাশি ফ্ল্যাটে। রাত হলে নিঃসঙ্গতা কাটানোর জন্য সে আমাদের সঙ্গে বসে কিছুক্ষণ গল্প-সল্প করত। কিন্তু ভেতরে ভেতরে কোনো একটা রোগ জটিল আকার ধারণ করছিল। গত ৩ মাসে তাকে মাঝেমধ্যেই ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হতো। যেদিন সে খুব অসুস্থবোধ করছিল সেদিনও আমাকে ব্যাপারটা না জানানোর জন্য সে তার কাজের মেয়েটিকে বারবার বলছিল।

যখন সত্যি সত্যিই জানতে পারলাম তখন কালবিলম্ব না করে স্কয়ার হাসপাতালে জরুরি বিভাগে পাঠানোর ব্যবস্থা করলাম। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে লাইফ সাপোর্টে নিতে হল। ৯ দিনের মাথায় তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে উন্নত চিকিৎসার জন্য ব্যাংককের বামরুনগ্রাড হাসপাতালে পাঠানো হল। সেখানেও মৃত্যু পর্যন্ত সে ছিল লাইফ সাপোর্টে। সেখানে তার দেখভাল করত তার ছোট মেয়ে নুসরাত এবং বড় জামাতা মিনহাজ। সব চেষ্টা করেও তাকে বাঁচানো গেল না। আল্লাহর ইচ্ছাকে খণ্ডন করার শক্তি বান্দার থাকার তো কথা নয়। অসুস্থতার শেষ পর্যায়ে তার স্ত্রীও ব্যাংককে গিয়েছিল।

মাহফুজ উল্লাহর মৃত্যুতে ব্যক্তিগতভাবে আমি খুব ক্ষতিগ্রস্ত। সে ছিল আমার শক্তির বড় উৎস। জীবনে সে বেশ ক’বার বড় রকমের অসুস্থতায় পড়েছিল। বামরুনগ্রাড হাসপাতালেই তার বাইপাস সার্জারি হয়েছিল ২০০২ সালে। সেই সময়ও সার্জারি সম্পন্ন করার পর তার হৃৎপিণ্ডে একটি ক্ষুদ্র যন্ত্র থেকে গিয়েছিল। আবারও সেলাই কেটে সেই যন্ত্রটি বের করতে হয়েছিল। টেলিফোনে সংবাদটি পাওয়ার পর আমার মা এবং পরিবারের সদস্যরা প্রচণ্ডভাবে মুষড়ে পড়েছিল। হায়াত ছিল বলে সে যাত্রায় সে সুস্থ হয়ে দেশে ফেরে।

বছরতিনেক যেতে না যেতেই তার হৃদস্পন্দনে অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ে। এ সমস্যার সমাধানের জন্য তার বুকে একটি শক্তিশালী পেসমেকার বসাতে হয়। এজন্য খরচ হয়েছিল ১৬ লাখ টাকা। এ পেসমেকারটি সিআরটি নামে পরিচিত। হৃদরোগ ছাড়াও তার ছিল ডায়াবেটিস। অফুরন্ত প্রাণশক্তির বলেই সে বহু কাজকর্মে জড়িয়ে থাকত। জীবনের শেষ বছরগুলোতে সে বেশ ক’টি গবেষণাধর্মী গ্রন্থ রচনা করেছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন- গৌরবের দিনলিপি, প্রেসিডেন্ট জিয়া : এ পলিটিক্যাল বায়োগ্রাফি, বেগম খালেদা জিয়া- হার লাইফ হার স্টোরি।

এছাড়াও উত্তরপূর্ব ভারতের উলফার আন্দোলনের ওপর মৌলিক দলিলভিত্তিক ইংরেজি ভাষায় আরেকটি বই লিখেছিল। তার লেখা ৫০টিরও অধিক গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হল- Environmental Politics in Bangladesh, পরিবেশ শব্দকোষ, স্বাধীনতার প্রথম ১০ বছর, পাঠকের চোখে জাসদের রাজনীতি। এছাড়া তার লেখা একটি ব্যতিক্রমধর্মী গ্রন্থ হল ‘এ কী কেবলই প্রেম’। রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী দেবব্রত বিশ্বাসের অপ্রকাশিত চিঠি এই গ্রন্থের উপজীব্য। তার পরিবেশকেন্দ্রিক এনজিও Center for Sustainable Development থেকে পরিবেশবিষয়ক ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় লেখা অনেক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এক জীবনে এতগুলো মূল্যবান গ্রন্থ এদেশের অনেক পণ্ডিত ব্যক্তিও রচনা করতে পারেননি। মৃত্যুর কিছুদিন আগে তিনি জেনারেল এমএজি ওসমানীর জীবনী লেখার কাজ শুরু করেছিলেন।

মাহফুজ উল্লাহ ছিল অত্যন্ত প্রতিভাবান। এসএসসি পরীক্ষায় সে কুমিল্লা জিলা স্কুল থেকে বোর্ডে নবম স্থান অধিকার করেছিল। তারপর সে ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়। এ সময় সে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে এবং আন্দোলন করার অপরাধে কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হয়। তার সঙ্গে একই সময়ে বহিষ্কৃত হয়েছিল বর্তমান সিপিবি নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এবং সাংবাদিক আবদুল কাইয়ুম মুকুলসহ চারজন।

এরপর সে জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হয়ে এইচএসসি বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র হিসেবে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়। ওই সময় আমি নিজেও ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছিলাম। একদিন ছাত্রাবাসে সে কেমন করে থাকে দেখার জন্য পুরান ঢাকায় গিয়েছিলাম। তখন জগন্নাথ কলেজের বেশক’টি ছোট ছাত্রাবাস ছিল। সে থাকত এসআর হল নামে একটি ছাত্রাবাসে। এ ছাত্রাবাসটি ছিল পুরনো জরাজীর্ণ একটি দালান। ভেতরের পরিবেশ ছিল স্যাঁতসেঁতে এবং অপরিচ্ছন্ন। জগন্নাথ কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স করে। তার নাম করা শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন ড. ইন্নাস আলী, ড. আবদুল মতিন চৌধুরী এবং ড. শমসের আলী।

মাহফুজ উল্লাহ বিজ্ঞানশাস্ত্র অধ্যয়নে খুব উৎসাহী ছিল না। এ সময় তৎকালীন পূর্ববাংলার স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলন তার চিন্তা-চেতনাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। ১৯৬৯-এ ১১ দফা আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সাহসী। পরবর্তীকালে সে ‘অভ্যুত্থানে ঊনসত্তর’ নামে একটি তথ্যভিত্তিক গ্রন্থও রচনা করে। সে তারিক আলীর লেখা গ্রন্থ ‘পাকিস্তান : পিপলস পাওয়ার অর মিলিটারি রুল’ বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে এবং এই অনুবাদ গ্রন্থটি বাংলা একাডেমি থেক জান্তা না জনতা নামে প্রকাশিত হয়।

বিজ্ঞানের পাট চুকিয়ে দিয়ে সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তি হয় এবং উজ্জ্বল সাফল্য লাভ করে। এ সময়ে সে রচনা লিখে চ্যান্সেলরস গোল্ড মেডেল লাভ করে। ছাত্রজীবন থেকেই সে সাংবাদিকতায় রিপোর্টার হিসেবে কাজ করতে শুরু করে। সান্ধ্য দৈনিক আওয়াজে সাংবাদিকতায় তার হাতেখড়ি হয়। এ পত্রিকাটির প্রথম সম্পাদক ছিলেন মরহুম আনোয়ার জাহিদ এবং তারপর সম্পাদক হলেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। মাহফুজ উল্লাহ বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্রে কাজ করেছে।

এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- The Morning Sun এবং The Daily Star. সে দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেছে। তবে সাংবাদিকতা পেশায় তার উজ্জ্বলতম অধ্যায় হল সাপ্তাহিক বিচিত্রার দিনগুলো। মরহুম শাহাদাত চৌধুরীর সম্পাদনায় প্রকাশিত বিচিত্রাকে তার ঐকান্তিকতার ফলে রম্য পত্রিকা থেকে একটি সমাজমনস্ক পত্রিকা হিসেবে রূপান্তরিত করা সম্ভব হয়। বাংলাদেশোত্তরকালে সব বয়সের মানুষের মানসজগৎ গঠনে সাপ্তাহিকটির ভূমিকা ছিল অপরিসীম।

মাহফুজ উল্লাহ সাংবাদিকতা সম্পর্কে ব্রিটেনের টমসন ফাউন্ডেশন এবং ফিলিপাইন থেকে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। এর ফলে সাংবাদিকতার রীতি-নীতি ও পেশাদারিত্ব সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গিও উন্নত হয়। তার বহুল আলোচিত রিপোর্টিংয়ের মধ্যে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন ছিল বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রথম রাজনৈতিক সাক্ষাৎকার। সাক্ষাৎকারটি ভারতের রাজধানী দিল্লিতে গ্রহণ করা হয়। এ সময় তিনি সেখানে প্রবাস জীবনযাপন করছিলেন।

এর কিছুদিনের মধ্যেই শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময় মাহফুজ উল্লাহ শেখ হাসিনার যে ছবিটি ক্যামেরায় ধারণ করেছিলেন, সেটাই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকারী শেখ হাসিনার সংবর্ধনার জন্য ছাপানো পোস্টারে ব্যবহার করা হয়। আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ তার কাছ থেকে ছবিটি চেয়ে নিয়েছিলেন। তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক অত্যন্ত উষ্ণ ছিল। মাহফুজ উল্লাহর শেষ জানাজায় তিনি শরিক হয়েছিলেন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কিছুদিন আগে মাহফুজ উল্লাহ আমাকে শেখ হাসিনার একটি বাঁধানো ছবি দেখিয়েছিল। আমার দৃষ্টিতে এ ছবিটি শেখ হাসিনার শ্রেষ্ঠ ছবিগুলোর একটি। ছবিটি ছিল শেখ হাসিনার আরও কম বয়সের। তার চোখ ও মুখে জড়িয়েছিল বিষণ্ণতাময় এক ধরনের সৌন্দর্য।

মাহফুজ উল্লাহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণের জন্য অনেক ওয়ার্কশপ করেছিলেন। এর ফলে বাংলাদেশের সব প্রান্তের সব মতের সাংবাদিকরা তার প্রিয়ভাজন হয়ে উঠেছিল। সব ধরনের মানুষকে আপন করে নেয়ার সক্ষমতা ছিল তার অপরিসীম। সদাহাস্য মুখ এ মানুষটির অন্য মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের ক্ষমতাও ছিল বিরল।

তার শেষ শয্যা হয়েছে বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে। এ গোরস্থানের দুটি অংশ, একটি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এবং অপরটি সাধারণ বুদ্ধিজীবীদের জন্য। তার কবরের স্থান নির্ধারণের প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন আমাকে মোবাইল ফোনে জিজ্ঞাসা করেছিলেন মাহফুজ উল্লাহ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কিনা। আমি বলেছিলাম, তিনি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, তবে কখনও সনদ নেয়ার প্রয়োজন অনুভব করেননি। ২৫ মার্চে গণহত্যা শুরুর পর ঢাকাতেও প্রতিরোধ শুরু হয়েছে, তা বিশ্ববাসীকে জানানোর জন্য মাহফুজ উল্লাহ লালবাগের মজনু ও অন্য কয়েকজন মিলে তৎকালীন গভর্নর হাউসের ফটকের সামনে বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। ওই সময় আমি ছিলাম কারারুদ্ধ।

মজনু পাকিস্তান আর্মির হাতে ধরা পড়ে এবং তার ওপর প্রচণ্ড নির্যাতন করা হয়। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে মজনু মাহফুজ উল্লাহর নাম গোয়েন্দাদের কাছে প্রকাশ করে দেয়। এরপর মজনুকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের পাঠিয়ে দেয়া হয়। কারাগারে মজনু আমাকে খবর দিয়ে জানায়, সে মাহফুজ উল্লাহর নাম বলে দিয়েছে। সম্ভব হলে আমি যেন তাকে চিরকুট পাঠিয়ে সাবধান করে দিই। প্রায় কাছাকাছি সময়ে মাহফুজ উল্লাহ বাংলা একাডেমির দু-একজন কর্মকর্তার সঙ্গে একত্র হয়ে একাডেমির সাইক্লোস্টাইল মেশিনে প্রচারপত্র ছাপিয়ে জনগণকে শক্তি-সাহস জোগাতে গোপনে এগুলোর বিতরণেরও ব্যবস্থা করে।

তাই সনদধারীরাই কেবল মুক্তিযোদ্ধা, বিষয়টি তেমন সহজ-সরল নয়। মাহফুজ উল্লাহর কর্মজীবন বিদেশেও বিস্তৃত। সে ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত বেইজিংয়ে বিদেশি ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেছে। কলকাতায় বাংলাদেশের উপদূতাবাসে কূটনীতিক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছে। দেশ-বিদেশে বহু সেমিনারে অংশগ্রহণ করেছে। মাহফুজ উল্লাহ International Union for Conservation of Nature (IUCN)- এর নির্বাচিত আঞ্চলিক কাউন্সিল সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে। এসময় গাল্ফ টাইমস পত্রিকা তার একটি চমৎকার সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছিল।

মাহফুজ উল্লাহ দল-মত নির্বিশেষে দেশের বহু মানুষের ভালোবাসার পাত্র হয়ে উঠেছিলেন। তার অগণিত ভক্ত তার মৃত্যুতে খুবই শোকাহত। তারা বলাবলি করছে, আমাদের প্রাণের কথা বলার মানুষটি চলে গেল। শালীনতা ও সৌজন্য বজায় রেখে কীভাবে সুবচনের মাধ্যমে অন্যায় ও অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়গুলোর সমালোচনা করা যায়, সে ব্যাপারে তার কোনো তুলনা হয় না। তার জানাজা ও দোয়া মাহফিলে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সমাগম প্রমাণ করে এদেশে এখনও একই মঞ্চে বসে বিভিন্ন মতের মানুষ কথা বলতে পারে।

মাহফুজ উল্লাহ তার জীবনাচার দিয়ে এ শিক্ষাই দিয়ে গেছেন। আল্লাহ তাকে মাগফিরাত দান করুন। মাহফুজ উল্লাহর স্মরণে দোয়া মাহফিলে আমি একটি স্বরচিত শোকগাথা পাঠ করেছিলাম- এর শিরোনাম হল ‘অনুজের জন্য অগ্রজের শোকগাথা’। আমি কবি নই, ওয়াডসওয়ার্থের সংজ্ঞা অনুযায়ী কবিতা হল ‘Emotion recollected in tranquility’. আমার বুকের মধ্যে জমাটবাঁধা দুঃখবোধ ও আবেগই এই কবিতাটির জন্ম দিয়েছে।

অনুজের জন্য অগ্রজের শোকগাথা
ভাইটি আমার হারিয়ে গেল,
হেথায় খুঁজি হোথায় খুঁজি
সারা বাংলাদেশে।
সে কি এখন ঘুরে বেড়ায়
লক্ষ তারার রাত আকাশে।।
আর কোনোদিন কইবে না কথা,
দেবে না আর পথের দিশা।
পাতায় পাতায় আলোর নাচন
আনবে না সে, কাটাতে অমানিশা।।
বুদ্ধিতে জ্ঞানে সে ছিল অনন্য।
দেশের মানুষ অশ্রু ফেলে তার জন্য।।
আমরা ছিলাম দুটি ভাই
মানিকজোড় যেন।
এমন স্নেহ! এমন ভালোবাসা!
যাপিত জীবনে কথা বলিনি
বিষয় ছিল না হেন।।
পরপারে শান্তির ঘুম
তারে ঘুমাতে দাও বিরামহীন।
তার যত কাজ, যত লেখা
চিরদিন হোক অমলিন।।
মৃত্যুর মাঝেও সে হয়েছে মৃত্যুহীন
আসুক তার স্বপ্নের দেশ, আসুক সুদিন।
মোহাম্মদ রাসূল আল্লাহর
সে ছিল বিশ্বাসী উম্মত।
তার কীর্তিরে পিছে ফেলে যায়
তার জীবনের রথ।
সৌম্য কান্তি, হাসি খুশি
এমন মানুষ পাওয়া ভার।
তার জন্য সবাই কেঁদে জার জার,
প্রার্থনা করে রহমানুর রহিম আল্লাহ্র।
মানুষ যারে ভালোবাসে
আল্লাহ্রও হয় সে প্রিয়।
হে মাবুদ তারে তুমি
বরণ করে নিও।।
মাটি থেকেই জন্ম তার
মাটিতেই গেছে ফিরে
যেমন করে সন্ধ্যা বেলায়
পাখিরা ফেরে নীড়ে।।

(ড. মাহবুব উল্লাহ, লেখক: অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ/ ঘাটাইলডটকম)/-