বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ ॥ আল মাহমুদ

…সন, তারিখ আমি বলতে পারব না। সহসা একদিন কবি শামসুর রাহমানের বিবাহের দিন ধার্য হওয়ায় আমরা যারা তার আশপাশে ছিলাম, আমি, শহীদ কাদরী ও ফজল শাহাবুদ্দিন বিবাহের ভােজসভায় উপস্থিত হয়েছিলাম। কথাটি এখানে আকস্মিকভাবে উল্লেখ করলেও এটা আমার কাব্য জীবনের একটা উল্লেখযােগ্য ঘটনা ছিল। হয়তাে ঘটনাটা ছিল আমার বিয়ের পরে। কিংবা আগে। কিন্তু ঘটনাটি স্মৃতির মধ্যে আছে বলে দিন, তারিখ ছাড়া উল্লেখ করছি। এখানে একটা কথা অকপটে স্বীকার করি যে, শামসুর রাহমানের সাথে আমি কখনাে গভীর সম্পর্ক সৃষ্টি করতে পারিনি। মনের ভেতর থেকে তা চাইওনি এবং এর জন্য আমার কোনাে আক্ষেপও নেই।

তাছাড়া পরবর্তী জীবনে শামসুর রাহমানের সুচতুর বন্ধুদের সাথেও আমার কোনাে ঘনিষ্ঠতা কাঙিক্ষত ছিল না। আজও নেই। আমি লক্ষ্য করেছি, তারা সব সময় চেষ্টা করেছেন শামসুর রাহমানের জীবনের আলােকে আলােকিত হয়ে নিজের সার্থকতা পেতে। নির্ভয়ে বললে হয়, তাদের একজন হলেন জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। তিনি সব সময় আমার প্রতি বিরূপ। কেন বিরূপ আমি তার কোনাে কারণ খুঁজে পাইনি। হয়তাে জীবনের ব্যর্থতাই তাকে এই বিরূপতার মধ্যে আটকে ফেলেছে। তিনি কবি হতে চেয়েছিলেন, হতে পারেননি।

কবিরা যখন ব্যর্থ হয় তখন তার থেকে অন্য কবিদের শত যােজন দূরে থাকাই শ্রেয়। আমি সেটাই করতে চেয়েছি।

এখানে আমি একটি ঘটনার উল্লেখ করতে পারতাম। সেটা এই রচনার সাথে সম্পৃক্ত হবে না বলে নিবৃত্ত থাকলাম। পরে কোনাে ঘটনায় জিল্লুর রহমান, রশীদ করিম, কায়সুল হক ও সর্বশেষ রাহমান প্রবণ আবু হাসান শাহরিয়ারের বৃত্তান্ত ও আমার প্রতি ঘৃণার উৎসবগুলাে সাধ্যমতাে লিপিবদ্ধ করব।

… এখানে একটি কথা হঠাৎ মনে পড়ল, আমি চট্টগ্রাম আসার আগে শহীদ কাদরী আমাকে রায়সাহেব বাজারের চশমার দোকান থেকে ধরে গুলিস্তান রওনা হয়েছিলেন। তিনি সােজা এসে তখনকার গুলিস্তান এলাকার সবচেয়ে ভালাে কাবাব প্রস্তুতকারক রেকস রেস্তোরায় এসে ঢুকলেন। এখানে এ সময় ছিল কাদরী সাহেবের আড্ডার আসর। এ আসরে বসলে রাত ১২টার আগে ওঠা যেত না। এখানে ঢুকে কিছুক্ষণ গালগল্প করতে গল্পকার ও কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক এসে প্রবেশ করলেন। হাসান প্রগতিশীল লেখক হিসেবে তখন বেশ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। কী একটা বিষয় নিয়ে যেন কাদরী সাহেবের সঙ্গে বেধে গেলে হাসান মার্কসবাদী আদর্শের ওপর তার আস্থার কথা সুন্দরভাবে ব্যক্ত করলেন। কাদরী সাহেবের তখন প্রকৃতপক্ষে কোনাে আদর্শ ছিল না। ছিল ইউরােপীয় সাহিত্যের কিছু জ্ঞান এবং কিছু দার্শনিক পড়াশােনা। কাদরী সাহেব হাসান আজিজুল হককে নানা রেফারেন্স উল্লেখ করে জব্দ করতে চাইলেন। কিন্তু হাসান ছিলেন অনড়। নিজের আদর্শগত রাজনৈতিক আশ্বাসের ওপর অত্যন্ত অবিচল।

যে কোনাে কারণে হােক আমিও তখন হাসান আজীজুল হককে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেছিলাম। আমি জানতাম যে কাদরী সাহেবের কোনাে আদর্শ নেই। তিনি কেবল পাশ্চাত্য সাহিত্যের দোহাই দিয়ে এ দেশের কম ইংরেজি জানা লেখকদের মাথা ঘুরিয়ে দিতে চাইতেন। হয়তাে আজও তার সে অভ্যাস যায়নি। তবে এদেশে বসে জগৎকে জানা আর নিউইয়র্কে বসে জানা – এই দুই জানার মধ্যে আমি কোনাে পার্থক্য দেখি না।

যা হােক কথাটা আকস্মিকভাবে উল্লেখ করলাম এ জন্য যে, হাসানের সঙ্গে আমার আদর্শগত বিরােধ এখন যে পর্যায়ে আছে তা কোনাে অবস্থাতেই মিলবে বলে বলে মনে হয় না। আমি তার লেখালেখিরও সামান্য সমালােচনা করে থাকি। কিন্তু এ কথা ঠিক যে, তিনি তার গল্প-উপন্যাসে নতুন কিছু আমাদের জন্য যােগ করেছেন।

… আমি যখন ঢাকায় এসে সমকালে কবিতাগুলাে সমকাল সম্পাদক সিকান্দার আবু জাফরের হাতে তুলে দিই – এর আগে ওই সনেট সাতটি নিয়ে আমি সকালে শহীদ কাদরীর বাসায় গিয়েছিলাম। তিনি তখনাে চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছেন। আমি তার মুখের কাপড় সরিয়ে বললাম, কয়েকটি সনেট লিখেছি। শােনো।

কাদরী চোখ খুলে নিরাসক্ত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে ‘সােনালী কাবিনের’ প্রথম সাতটি সনেট শুনে উঠে বসে পড়েছিলেন। মুহূর্তের মধ্যে তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছিলেন, ভালাে হয়েছে। আমি চট্টগ্রামে ফিরে আসার কিছুকালের মধ্যে কাদরী সাহেব এসে আমার মেহমান হলেন। বললেন, কয়েক দিন থাকব। এ কথায় আমি মুহূর্তে আন্দাজ করে নিয়েছিলাম যে ঢাকায় কোনো অঘটন ঘটেছে। হতে পারে এটা কাদরী সাহেবের পারিবারিক কিংবা শামসুর রাহমানের সঙ্গে কোনো বিষয়ে শহীদ কাদরীর বৈপরীত্য প্রকট আকার ধারণ করেছে।

এ সময় কাদরী সাহেব চুপচাপ থাকতেন। শুধু খাওয়ার সময় খানিকটা উৎসাহ দেখেছি। মাছ-মুরগি সবই সাবাড় করেছেন। কিন্তু খাওয়ার পর বাসায় এসে চুপচাপ শুয়ে পড়তেন। আমি অনেক চেষ্টা করেও তার ভেতরের কথা বের করতে পারিনি। এর মধ্যে সুচরিত চৌধুরী এসে যোগ দিলেন। কাদরী সাহেবকে কিছু পান-টান করার আহবান জানালে তিনি দৃড়ভাবে তা প্রত্যাখান করতে লাগলেন। কিন্তু সন্ধ্যার আসরে সুচরিত বাবুর প্ররোচনায় বেশ খানিকটা মদপান করে ফেললেন। প্রথম তো খাব না, খাব না। পরে পিঁপেসুদ্ধ গলায় ঢেলে দিয়ে ভেতরের বিষ উগড়ে দিলেন। শামসুর রাহমানকে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করেছিলেন। আর যা করেছিলেন তা আমি এখানে উল্লেখ করতে চাই না।

… মানুষ তার আয়তনের চেয়ে বড় স্বপ্ন দেখতে পারে। কিন্তু তার উচ্চাকাঙ্খা যদি অতিশয় উধ্বর্গামী হয় তাহলে হতাশার মেঘ তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলবে। আমি কোনো উচ্চাকাঙ্খা নিয়ে ঢাকায় আসিনি। এসেছিলাম শুধু কবি হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। একটু স্থান, কোথাও অনেকের ফাঁকে নিজের নাম ছাপা হয়েছে এতেই আমি তুষ্ট থাকতাম। কিন্তু ব্যর্থ কবির দল সবসময় প্রকৃত কবিকে চিনে ফেলে। তাকে আর মাথা তুলতে দেয়না। সবাই শুধু মাথায় আঘাত করতে চায়। আর তাদের সঙ্গে আমার নাম উচ্চারিত হয়, যেমন শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী – তারা আমার সঙ্গী ছিলেন বটে। কিন্তু বন্ধু ছিলেন না। ছিলেন কঠোর ও নির্মম প্রতিদ্বন্দ্বী। সামান্যতম ছাড় তারা আমাকে দেননি। তবে আমি গ্রাম্য লোক বলেই অনেক বিষয়ে কারো পথ আটকে দাঁড়িয়ে থাকিনি॥”

– আল মাহমুদ (কবি) / বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ ॥ [একুশে বাংলা প্রকাশন- ফেব্রুয়ারি, ২০১০। পৃ: ৪৯/৭৯/৮৩/৮৯]

230total visits,2visits today