‘বাড়ির পাশে আরশিনগর, আঞ্চলিক রাজনীতিতে ভারত (দ্বিতীয় পর্ব)’

“ফুলে ফুলে ফলে ফলে সাজানো চমৎকার একটি ট্রেন রওনা দেয় জাফনার উদ্দেশ্যে। মিসেস কুমারাতুংগা নিজে পতাকা নেড়ে সেই ট্রেনকে বিদেয় দেন এবং আশা করেন তাঁর সরকার পজিটিভ এবং যে কোন বিষয়ে যে কোন স্থানে তিনি প্রভাকরনের সাথে কথা বলতে চান। শ্রীলংকাকে শান্তির স্থাপনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। শান্তির ট্রেন জাফনার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় সত্যি, কিন্তু শান্তি?

ট্রেনের এই মিছিল কি শান্তি ফেরাতে পেরেছিল ১৯৭৮ সাল থেকে শুরু হওয়া এই গৃহযুদ্ধের? দেখা যাক, পরের পর্ব কি বলে।”

জাকারিয়া চৌধুরীর ‘আরশিনগর’ শিরোনামের প্রথমপর্ব লেখার শেষটা ছিল এমন। দ্বিতীয় পর্ব শুরুর আগে প্রথম পর্বর লেখাটি এখান থেকে পড়ে নিতে পারেন।

ফলে ফুলে, ডাক্তার-নার্স আর ওষুধে ভরা ট্রেন জাফনায় গিয়ে পৌঁছেছিল বিনা বাঁধায়। কিন্তু কোন এক বিচিত্র কারনে প্রভাকরন সেই ট্রেনটি খালি ফেরত পাঠালেন। সেদিন সেই ট্রেনে প্রভাকরন যদি একটি চিরকুটও পাঠাতেন তাহলেও শ্রীলংকার ইতিহাস আজ অন্য রকম হতে পারতো। চন্দ্রিকার ট্রেন কুটুনীতিতে এমন আহামরি কিছু সন্দেহের ছিল না যা প্রভাকরন কোনরকম যাচাই বাছাই ছাড়াই ছুড়ে ফেলে দেন। প্রভাকারন সেদিন সম্ভবত মনে রাখেনি যে, সে নিজেও শ্রীলংকার সন্তান। শ্রীলংকার স্বার্থ আগে- এ হিসেব প্রভাকরনের মাথায় খেলেনি। তাঁর মাথায় ছিল তাঁর কথিত প্রভুদের খুশি অখুশির বিষয়টি। সাউথ এশিয়ান পলিটিক্সে আমরা এমন আরও একই রকম কিছু কান্ড দেখব যা হুবুহু প্রভাকরনের মতই মঞ্চস্ত হয়েছে, আগে বা পরে। আগের ঘটনা থেকে কেউ শিক্ষা গ্রহন করেনি।

আরেকটা কথা, প্রথম পর্বে যা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম তা হলো, চন্দ্রিকার রানিংমেট প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিলেন মি প্রেমাদাসা (আজকে যে প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে আমরা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট দেখি)। ট্রেন কুটনীতি ভন্ডুলের পর পরই আমরা চন্দ্রিকার দলে কিছু অস্থিরতা দেখতে পাই। রাজাপাকসে নামের একজন অসম্ভব মেজাজী নেতাকে দেখানো হচ্ছিলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে। চন্দ্রিকা দলীয় কোন্দল সামলে কোনরকমে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট ইলেকশনে দাঁড়ান। তিনি পাশ করে যান দুইটি কারনে। (ইলেকশনে পাশ করতে গিয়ে চন্দ্রিকা তামিলদের বোমা হামলার স্বীকার হন, তিনি প্রানে বেঁচে গেলেও একটি চোখ হারিয়ে ফেলেন চিরস্থায়ীরুপে)।

এক- শ্রীলংকার নির্বাচন কমিশন যথেস্ট কার্যকর

দুই- বিরোধী দলের আসন চিরস্থায়ী করে নিয়েছেন রনিল বিক্রমাসিঙ্ঘে নামের একজন রাজনৈতিক নেতা। যিনি মাইনরিটি পলিটিক্স করেন। আদেশ নির্দেশের জন্যে তাকিয়ে থাকেন হিন্দুস্থানের দিকে। ৮% খৃষ্টান আর ৭% হিন্দু হচ্ছে তাঁর ভোট ব্যাংক। অন্যদিকে এলটিটিই বা তামিল অধ্যুষিত জাফনার কিছু ভোট তিনি পেয়ে থাকেন। স্বাভাবিক নির্বাচনে তিনি যে কোনকালে জিততে পারবেন না এটা মোটামুটি নিশ্চিত। তিনি অস্বাভাবিক পরিস্থিতির স্বপ্ন দেখেন। তামিল বিদ্রোহীরা সরকারী কিংবা বেসরকারী কোথাও বড় ধরনের আঘাত হানলে তিনি সরকারের সমালোচনা করে বলেন- সরকার স্টিম রোলার চালিয়ে তামিল সমস্যার সমাধান করতে চায়।

শ্রীলংকার জাতীয়তাবাদ টিকে যায় রনিলের এই নতযানু আচরনের কারনেই। অবস্থা যখন এমন দাঁড়ায়- ঘরের শত্রু বিভিষন’ তখন একজন স্বাচ্চা জাতীয়তাবাদী আসলেই বড্ড কোনঠাসা হয়ে পরে। শ্রীলংকা জরুরী ভিত্তিতে চায়নার কাছে সাহায্যের হাত পাতলো।

বিশেষতঃ চন্দিকা কুমারাতুংগা এ্যাসাসিনেশন এ্যাটেম্পট এর পর পরই। চায়নার গোটা দশ অফিসার সরকার নিয়ন্ত্রিত জাফনায় ছোট একটা অফিস খুলে প্রভাকরন বিরোদশী অভিযান পুনরায় শুরু করলো শ্রীলংকা সেনাদের নেত্রীত্বেই। এ অভিযান শ্রীলংকায় এত বিপুল জনপ্রিয়তা পায় যে, ভারত তাদের সাউথ ব্লকের একজন কুটনীতিককে বিশেষ ট্রেনিং এর জন্যে আলাদা টেবিলে ভবিষ্যতের আশায় বসিয়ে রাখা ছাড়া আর করনীয় কিছু খুঁজে পায়নি। শ্রীলংকা পুরোপুরিভাবে তাদের গ্রীপের বাইরে চলে যায়।

প্রসঙ্গত মনে করিয়ে দেই সিক্কিমের কথা। ১৯৭৫ সালে পন্ডিত জহরলাল নেহেরুর ইচ্ছেয় সে দেশ দখলের দিন পনেরো আগে সিক্কিমের রাজা নেপালে গিয়েছিলেন কোন একটা সামিটে যোগ দিতে। সেখানে পাকিস্তানী এবং নেপালী কুটনীতিকেরা তাকে পায়ে ধরতে বাকি রেখেছিলেন তিনি যেন তখনই সিক্কিম না ফেরেন। তিনি তাদের কথা বিশ্বাস করেননি বরং উদ্ধত স্বরে বলেছিলেন- ভারত আমার কেমন বন্ধু সে আমি জানি। ভারতের পক্ষ থেকে হামলার আশংকা নেই। কিন্তু তিনি জানতেন না, তিনি ও তাঁর কয়েশ বা কয়েক হাজার সেনাবাহিনী ছাড়া বাকি প্রায় সবাইকে রাস্তায় নামিয়ে দিতে প্রকাশ্যে টাকা বিলি করছিলো ভারতীয় গোয়েন্দারা যেন রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের স্ট্রাইক করা যায়।

এদিকে অরুনাচল সীমান্তে চায়না ফাইটার প্লেন গুলো স্টার্ট নিয়ে দাঁড়িয়েছিল রাজার একটা কলের আশায়।

অথচ রাজা দেশের জনগন এবং লেন্দুপ দর্জির উপরই ভরসা করে রইলেন। ফলত যা হবার তাই হলো। সিক্কিমের রাজা যাকে চ্যাগিয়াল বলে ডাকা হয় তাকে ভারতীয় সেনারা হেলিকপ্টারে করে উঠিয়ে নিয়ে চলে গেল। দেশ গেলো লেন্দুপের হাতে।

ভারত কোন দেশে হস্তক্ষেপের আগে সে দেশে অরাজকতা তৈরী করে নেয়। গত এক দশকে আমাদের দেশে শাহবাগের চেতনা আন্দোলনে ভারতীয় লোকদেরকে প্রকাশ্যে টাকা বিলি করতে দেখা গেছে। হেফাজত গণহত্যার সময় ভারত আমাদের পাশে থাকার দৃঢ় অংগীকার ব্যাক্ত করেছিলো। আরও অনেক প্রসঙ্গ আছে যা ভারত বাংলাদেশ অংশে আলোচনা করবো আশা করি।

পুনশ্চ: ভারত আন্দোলনের মুল সময়কে টার্গেট করেছিলো রাজার এক সপ্তাহ অনুপস্থিতির সময়কে।

স্বাধীন কাশ্মীরের কথা কি কারো মনে আছে ? কাশ্মীরও এক সময় ভারতীয় সেনা সহায়তা চেয়েছিলো। ভারত যখন যেখানে সেনা প্রবেশ করায় সেখান থেকে কখনো সেনা সরায় না।

প্রাসঙ্গিক এই যে, বাংলাদেশ থজেকে তো ৭২ সালে ভারত সেনা সরিয়ে নিয়েছিলো। এ কি ব্যাতিক্রম নয় ? হ্যাঁ ব্যাতিক্রম। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের ভ্রুন ডাঃ কালীদাস বৈদ্যেরা যখন ইন্দিরার সাথে দেখা করে জানতে চায়, ভারত কেন এখনো বাংলাদেশকে নিজেদের সীমানায় নিয়ে নিচ্ছে না? এর জবাবে ইন্দিরা বলেন- ইয়ে না মুমকিন হ্যায়।

কারন জাতিসংঘে ভারত রাশিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিষয়ে ১১০ বনাম ৯ ভোট বা এই জাতীয় সামান্য কয়টা ভোট পেয়েছিল এবং সারা বিশ্বই ভারতকে সন্দেহের চোখে দেখছিলো (এ বিষয়ে সুরেস রায়না বিস্তারিত লিখেছেন- ‘ইনসাইড র’ নামক বইটিতে)। এর বাংলা অনুবাদ করেছেন শ্রদ্ধেয় Abu Rushd)।

ভারতের মধ্যভাগে অবস্থিত আরেকটি মুসলিম স্টেট হায়দারাবাদ। সেটি দখলের আগে কংগ্রেস, আরএসএস প্রকাশ্যে এবং সেনাবাহিনী সাদা পোষাকে সেখানে ব্যাপক গনহত্যা চালিয়ে অরাজকতা তৈরী করে। সেখানে এমনও হয়েছে- যে পুকুর ভরা ছিল পানি আর মাছেতে সে পুকুর ভরে উঠেছিল শুধুমাত্র পচা গলা লাশে।

আরশি নগরের তৃতীয় পর্বে শ্রীলংকার সাথে করাচি ও বেলুচ রাজনীতিতে ভারতের ভুমিকা আলোচিত হবে।

(জাকারিয়া চৌধুরী, ঘাটাইলডটকম)/-