বাঘ হত্যা কীটনাশক দিয়ে

ফসলের কীটনাশক এখন সুন্দরবনের বাঘ মারতে ব্যবহার করা হচ্ছে। মহাবিপন্ন এই প্রাণীকে মারতে কয়েক বছর ধরে ফুরাডন নামের ওই কীটনাশক ব্যবহার করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। হরিণ মেরে তাতে ফুরাডন মাখিয়ে বনের মধ্যে টোপ হিসেবে রেখে দেওয়া হচ্ছে। বাঘ ওই বিষ মাখানো হরিণ খেয়ে বিষক্রিয়ায় মারা যাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং সেই সঙ্গে যুক্তরাজ্যের দুটি ও যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক যৌথ গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক আবদুল আজিজের পিএইচডি গবেষণার একটি অংশ হিসেবে এই গবেষণা হয়েছে। গত জানুয়ারিতে এটা প্রকাশিত হয়।

তবে এই গবেষণায় সুন্দরবনের ভেতরে কীভাবে বাঘ হত্যা করা হয়, শুধু সে ব্যাপারেই তথ্য দেওয়া হয়েছে। হত্যা করা বাঘ কীভাবে অন্যত্র পাচার হয়, সে সম্পর্কে বিস্তারিত গবেষণা করেছে পুলিশের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারপোল। গত বছরের জুনে তারা বাঘ হত্যা ও চোরাচালানে জড়িত ব্যক্তিদের ব্যাপারে একটি প্রতিবেদন বাংলাদেশ সরকারের কাছে জমা দেয়।

‘সুন্দরবনের বাঘ হত্যা’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী এলাকার ৩২ জন রাজনীতিবিদ ও প্রভাবশালী ব্যক্তি ওই বাঘ হত্যায় মদদ দেওয়া ও চোরাচালানে জড়িত। সাতক্ষীরা-৪ আসনের সরকারদলীয় সাংসদ এস এম জগলুল হায়দার এবং আওয়ামী লীগ-সমর্থিত চারজন ও বিএনপি-সমর্থিত দুজন ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যের নামও ইন্টারপোলের তালিকায় উঠে আসে। তবে প্রতিবেদনটি প্রকাশের পরপরই যোগাযোগ করা হলে তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। ইন্টারপোলের প্রতিবেদনে বলা হয়, সুন্দরবনের বাঘ হত্যা করে এর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ চীন, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়াসহ বেশ কিছু দেশে পাচার করা হচ্ছে। যেভাবে বাঘ
হত্যা করা হচ্ছে, তা অব্যাহত থাকলে খুব দ্রুত এই প্রাণী সুন্দরবন থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

বাঘ হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছেন জানতে চাইলে পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা পুলিশ-র‍্যাবসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বাঘ রক্ষায় নিয়োজিত করেছি। তারা কাউকে ছাড় দেবে না। তবে সুন্দরবন অনেক বিশাল জায়গা, সেখানকার সব স্থান আমাদের পক্ষে পাহারা দেওয়া সম্ভব নয়।’

গত জানুয়ারিতে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনের বিভিন্ন পয়েন্টে সরেজমিন অনুসন্ধান করে গবেষক আবদুল আজিজ ফুরাডন বিষ মাখানো মোট ছয়টি হরিণের মৃতদেহ পেয়েছেন। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের দোবেকি বন ফাঁড়ির কাছে বাঘের মৃতদেহের কিছু অংশ ও হাড় পেয়েছেন তিনি। বাঘের জন্য টোপ হিসেবে ব্যবহার করা বিষ মাখানো হরিণের মৃতদেহ পরীক্ষা করে তাতে দানাদার কীটনাশক ফুরাডনের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন তিনি।

ফুরাডন কার্বামেট-জাতীয় একটি দানাদার কীটনাশক। আমেরিকার এএমসি নামক কোম্পানি এটি তৈরি করে। রাসায়নিকভাবে এটি কার্বোফুরান নামে পরিচিত হলেও বাজারে এটি ফুরাডন নামে বিক্রি হয়। কৃষিক্ষেত্রে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। খুচরা দোকানিরা ছোট ছোট পলিথিন প্যাকেটে এ কীটনাশক বিক্রি করেন।

বন বিভাগ ও বন্য প্রাণীবিষয়ক সংস্থা ওয়াইল্ড টিমের হিসাবে, ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে ৩০টি বাঘের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২২টি ছিল বাঘের চামড়া। ওই চামড়াগুলোর মধ্যে মাত্র একটিতে গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। বাকি ২১টি চামড়ায় কোনো ধরনের গুলি বা অন্য কোনো ক্ষতচিহ্ন পাওয়া যায়নি।

এ থেকে গবেষক আবদুল আজিজ মনে করছেন, মূলত ওই বিষ মাখানো হরিণের মাংস খেয়ে বাঘগুলো মারা গেছে। এ ব্যাপারে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন ডাকাত দল ও তাদের সঙ্গে যুক্ত জেলেরা এসব বিষটোপ স্থাপন করে থাকে। তবে বিভিন্ন সময় যে কটি বাঘের মৃতদেহ পাওয়া গেছে, তা মারা পড়া বাঘের বড়জোর ২০ শতাংশ। বাকিগুলো অন্যত্র পাচার হয়ে যায়।

বন বিভাগের খুলনা সার্কেলের বন সংরক্ষক আমির হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও স্বীকার করেন, বাঘ হত্যায় টোপ হিসেবে চোরা শিকারিরা বিষ মাখানো হরিণ ব্যবহার করে থাকে। তবে দুই বছর ধরে বন বিভাগের সহযোগিতায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সুন্দরবনে অত্যাধুনিক টহল জোরদার করেছে। ফলে গত এক বছরে সেখানে কোনো বাঘ হত্যার ঘটনা ঘটেনি।

বিশ্বে বাঘ বাড়ছে, বাংলাদেশে কমছে

২০১০ সাল থেকে আইইউসিএনের লাল তালিকায় বিপন্ন প্রাণী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত বেঙ্গল টাইগার। সুন্দরবনে প্রতিবছর বাঘ হত্যার কারণে বর্তমানে বাঘের সংখ্যা কত দাঁড়িয়েছে, তার কোনো হালনাগাদ তথ্য বন বিভাগের কাছে নেই। ২০০৪ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ও বন বিভাগ পায়ের ছাপ গণনার পদ্ধতি (পাগমার্ক) প্রয়োগ করে জরিপ চালিয়ে সুন্দরবনে ৪৪০টি বাঘ আছে বলে তথ্য দেয়। ২০১৫ সালে বন বিভাগ বাঘের ওপর আরেকটি জরিপ করে। ক্যামেরায় ছবি তুলে করা ওই জরিপে বেরিয়ে আসে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১০৬। এর আগে ২০০৬-০৭ সালে ক্যামেরা ট্রাফিক পদ্ধতি ব্যবহার করে একটি জরিপ চালিয়েছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বাঘ গবেষক মনিরুল এইচ খান। এই জরিপে সুন্দরবনে ২০০ বাঘ আছে বলে জানানো হয়েছিল। ফলে একই পদ্ধতির ফলাফলের তুলনা করলে বলা যায়, ১০ বছরে বাংলাদেশে বাঘের সংখ্যা অর্ধেক কমে গেছে।

সে সময় পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা কত, তা নির্ধারণে তারা আরেকটি জরিপ করবে। কিন্তু গত দুই বছরেও এ ধরনের কোনো জরিপের তথ্য প্রকাশ করেনি বন বিভাগ। সুন্দরবনে বাঘের ঘনত্ব নিয়ে একটি জরিপ হলেও তা এখনো তারা প্রকাশ করেনি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সুন্দরবনের যেসব এলাকায় বাঘ নেই বলে মনে করা হতো, সেসব স্থানে আমরা জরিপ করে দেখেছি যে সেখানে বাঘ আছে। আর আমরা বরিশাল, হাতিয়াসহ বেশ কিছু স্থানে নতুন করে সুন্দরবন সৃজন করছি। এতে সেখানে বাঘের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আমরা আশা করছি।’

জানতে চাইলে মনিরুল এইচ খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০১০ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবুর্গের বিশ্ব বাঘ সম্মেলনে ঘোষণা করা হয়েছিল, ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বের সব দেশ বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করবে। ভারত, নেপাল, ভুটান ও রাশিয়ায় ইতিমধ্যে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে। আমাদের দেশে বেড়েছে নাকি কমেছে, সেই আত্মজিজ্ঞাসা করার সময় এসেছে। সত্যিকার অর্থে আমরা বাঘ রক্ষা করতে চাইলে সরকারের রাজস্ব খাত থেকে বাঘ রক্ষার উদ্যোগ বাড়াতে হবে। কিন্তু আমরা দেখছি, প্রকল্পভিত্তিক ও বিদেশি অর্থায়ন ছাড়া বাঘ রক্ষার কোনো উদ্যোগ নেই।’

সুন্দরবনে বাঘের এই নতুন বিপদের প্রেক্ষাপটে কাল শনিবার পালিত হতে যাচ্ছে বিশ্ব বাঘ দিবস। নানান কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিনটি পালিত হবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।