‘বাংলার ২ নক্ষত্র চ্যাগা মিয়া ও দূখু মিয়া, এক নক্ষত্রের দৃষ্টিতে আরেক নক্ষত্র’

দুই এতিম দামাল কিশোর চ্যাগা মিয়া ও দূখু মিয়া একদিন এলো এই বাংলায়, আর তাঁরা পরবর্তীতে হয়ে উঠলো এই বাংলার দুই ধ্রুব নক্ষত্র। এক নক্ষত্রের দৃষ্টিতে আরেক নক্ষত্র; কবি নজরুলের সম্পর্কে মওলানা ভাসানী কি বলেছিলেন তাই এখানে আলোচ্য বিষয়। আসুন একটু জেনে নেওয়া যাক এই ঐতিহাসিক বিষয়ে।

(পুনশ্চঃ যদিও এই পার্থিব জীবন থেকে এই দুই নক্ষত্রের প্রস্থান হয় ১৯৭৬ সালেই মাত্র কয়েকমাসের ব্যবধানে কিন্তু বড়ই দুঃখজনক সেই প্রস্থান, আজ‌ও এই অভাব অপূরণীয় রয়ে গেল যদিও!)

কবি নজরুলের সম্পর্কে মওলানা ভাসানীর সহিত আলাপ-সালাপ করিয়া যতদূর বুঝিতে পারিয়াছি তাহাতে আমার বদ্ধমূল ধারণা হইয়াছে যে, কবিকে মওলানা ভাসানী কেবল কবি হিসাবে ভালোবাসিতেন না, কবির অন্যবিধ প্রাপ্তিও ছিল যাহার সন্ধান হুজুর পাইয়াছিলেন এবং তাহা সযতনে গোপন ও অকথিত রাখিয়া চলিয়াছেন। সেই জন্য আমার মনে বারবার একটি চিত্তাকর্ষক দৃশ্য দেখিবার লোভ ছিল। তাহা হইল নজরুলের সহিত সাক্ষাত ঘটিলে হুজুর কি করেন।

১৯৭২ সালের মে মাসে নজরুলকে ঢাকায় আনা হইলে, সত্য বলিতে কি, আমি হুজুরের পিছু লইলাম। কবে কোথা হইতে নজরুলকে দেখিতে যাইবেন কেবল তাহাই স্মরণ করাইয়া দিতাম। এই সময় হুজুর দুর্বোধ্য কিছু বলিতেন। বলিতেন, ‘নজরুল যে দেখা দেখিতে গিয়া আজকে কেবল দেখার মানুষ তার খোঁজ কর না ক্যান।’ নজরুল কি দেখিতে চাহিয়াছিলেন এবং আজ কী-ই-বা দেখিতেছেন তাহা বুঝিবার পরিভাষা হয়ত জিহ্বাশ্রিত নয় বলিয়া হুজুর কখনো তাহা বলেন নাই । তাঁহার মতে নিজেকে নজরুলের বিচরণ জগতে আগে পৌঁছাইতে হইবে; অতঃপর বুঝা যাইবে নজরুল কি উপলব্ধি লইয়া এতদিন বাঁচিয়া আছেন। এই কয়টি কথাই তো ব্যতিক্রম হিসাবে যথেষ্ট।

নজরুল এমন যুগের মানুষ যখন চিকিৎসা বিজ্ঞান মানব সভ্যতার আপন ধন। তখন নজরুলের রোগ নির্ধারণ লইয়া বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কেবল মত বিরোধই হয়। অবশেষে এমন একটি রোগের নাম আবিষ্কার হয় যাহা চিকিৎসা করিয়া সারিয়া উঠিবার নহে।

মওলানা ভাসানীর মতে নজরুলের অবস্থান কোন রোগে নয়- বিশেষ করিয়া ১৯৩৯ সাল হইতে তাহার দেহ-মনোজগতের অবস্থান আধ্যাত্মিক ও জাগতিক জগতসমূহের এক প্রচন্ড সংঘর্ষ স্থলে। নজরুল সেই দশকের শেষ ভাগে আধ্যাত্মিক সাধ্যসাধনায় লিপ্ত হন। তজ্জন্য তিনি গুরুর আশ্রয়ে অথবা প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে যান নাই। বৈদিক তন্ত্র-তন্ত্রের চর্চা এতদসঙ্গে সূফিদের তরিকা অনুশীলন, উভয়ের সংমিশ্রনে তিনি কি পাইয়াছেন তাহা তিনিই জানেন।

তবে এতটুকু অনুধাবন করা যায়, নজরুলের একক আত্মশক্তি প্রসূত অভিযাত্রা তাহাকে নির্মমভাবে পাকড়াও করিয়া ১৯৪২ সাল হইতে হতবাক ও নির্বাক করিয়া দিয়াছে।

আমাদের নিকট নজরুলের শেষ জীবনের রহস্য সম্পর্কে হুজুরের তরফ হইতে এতটুকুই প্রকাশ পাইয়াছে। হয়তো আরো বলার আছে, বুঝিবার মতো আমরা নই, তাই বলেন নাই।

একদিন আমি হুজুরকে বলিয়াছিলাম, অতৃপ্ত অশান্ত কত মানুষকে ঐশী জগতের চিকিৎসা বিধান প্রয়োগ করিয়া ভাল করা হইতেছে। নজরুলকে ভাল করতে কেহ আগাইয়া আসিল না কেন?

জবাবে বলিলেন, ‘ভাল করা বলতে কি বুঝাতে চাও? তুমি মনে কর তুমিই ভাল আছ। মনসুর মনে করতেন, তিনিই ভাল আছেন, আর বাকি সব নাদান। সত্য কোনটা?’

মওলানা ভাসানীর প্রবীণ ভক্তদের কাছে বিশেষ করিয়া তোরাব ফকিরের মুখে নজরুল সম্পর্কে আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণে পরিপূর্ণ অনেক কথা শুনিয়াছি। হুজুরের কথানুসারে মুরিদেরা বিশ্বাস করেন, নজরুল আধ্যাত্মিক সাধনার পথে এক পর্যায়ে অথবা তাঁহার ক্ষেত্রে শেষ পর্যায়ে এমন হইয়াছিলেন।

গত সাত জুলাই (১৯৭৬) কৃষক নেতা তোরাব ফকির পিজি হাসপাতালে আসিয়া হুজুরের সহিত সাক্ষাত করেন এবং নজরুলকে দেখিবার অনুমতি প্রার্থনা করেন। গুরুর অনুমতি পাইয়া নজরুলের সামনে গিয়া বসেন এবং কিছুক্ষণ চুপ থাকিয়া তিন যুগের নির্বাক কবিকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘কি! আর কতদিন চুপ থাকবা?’

বুঝদার প্রবীণ মুরিদগণ আমাকে বলিয়াছেন, নজরুলের শৈশব কৈশোরের সহিত হুজুরের শৈশব ও কৈশোরের অনেকাংশে মিল আছে। নজরুল এই সময়টায় অভিভাবকহীন অবস্থায় এক খুঁটি হইতে অপর খুঁটিতে গিয়াছেন। চ্যাগা মিয়ার ভাগ্যও তাহাই।

সেদিনের দুখু মিয়া কালে বিদ্রোহী নজরুল হইবেন কে ভাবিতে পারিয়াছিল?

এক কালের চ্যাগা মিয়াও তেমনি অপর এক কালে মওলানা ভাসানী হইবেন কে ভাবিতে পারিয়াছিল?

কৈশোরে দুখু মিয়া ঘেটু দলের একজন হইয়াছিলেন। চ্যাগা মিয়াকেও কৈশোরের কিছুদিন ঘেটুর দলে থাকিতে হইয়াছিল। তাহা কেন কিভাবে আজ লিখিবার নহে।

মওলানা ভাসানীকে আমি জিজ্ঞেস করিয়াছিলাম, কবে কোথায় কিভাবে নজরুলের সহিত তাঁহার প্রথম সাক্ষাত ঘটিয়াছে?

হুজুর বলিয়াছেন, খিলাফত আন্দোলনের সময় কলিকাতায় প্রথম নজরুলকে দেখিয়াছেন। উভয়ের মধ্যে কথাবার্তা হইয়াছে বহুবার নানা উপলক্ষে। তাঁহার ইচ্ছা হইত আসামে কোন একটা সম্মেলনে নজরুলকে লইয়া যাইতে।

কিন্তু হুজুরের ভাষায়, ‘নজরুল কথা দিয়া খুব কমই কথা রাখত। একবার যেখানে জমে উঠত সেখানেই জীবনটা কাটিয়ে দিবে এমন মনে হত। ঘাড়ের উপর সওয়ার হয়ে যে পিছু লাগত সেই নজরুলকে পেয়ে যেত। তা কেবল আড্ডা কিংবা সমাবেশের জন্যেই নয়- ভাবধারার ক্ষেত্রেও।

নজরুল যে কোন ভাব নিজের মধ্যে আবিষ্কার ও স্থান করে দিতে পারত। এটা স্থিতিহীনতার পরিচয় দান করলেও আসলে এটা একটা বিরল গুণ।

মওলানা ভাসানী বলিয়াছেন, নজরুল ১৯২৮ সালে সিলেট (তৎকালে আসামের একটি জেলা) আসিয়া ছিলেন। সিলেট গমন প্রসঙ্গে নজরুলের সহিত হুজুরের আলাপ হইয়াছিল। ইহার চেয়েও ঘনিষ্ঠভাবে মনের আদান প্রদান হইয়াছিল ১৯৩২ সালে।

১৯৩২ সালের নভেম্বর মাসে নজরুল বঙ্গীয় মুসলিম তরুণ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করিতে সিরাজগঞ্জ আসিয়াছিলেন। হুজুর তখন সিরাজগঞ্জের কাওয়াখোলা ময়দানে বিখ্যাত বঙ্গ-আসাম প্রজা কনফারেন্স করিয়া ছিলেন। এই কনফারেন্স ব্রিটিশ সরকার করিতে দিবে কি-না ইহা লইয়া তখন ( নভেম্বর মাসে ) বাকবিতণ্ডা চলিতেছিল।

হুজুর বলিয়াছেন, এই প্রসঙ্গে নজরুলের সহিত তাঁহার আলাপ হইয়া ছিল। নজরুল আধ্যাত্মিক সাধনার পথে নিজেকে যখন একান্তভাবে জড়িত করিয়া ফেলিতে ছিলেন তখনও ( অর্থাৎ ১৯৩৭-১৯৪০ ) হুজুরের সহিত তাঁহার সাক্ষাত ঘটিয়াছে। কবে কোথায় সাক্ষাত ঘটিয়াছে এবং কোন্‌ প্রসঙ্গে কতদূর আলাপ হইয়াছে তাহা আমি জানিয়া রাখিতে পারি নাই।

১৯৭২ সালের মে মাসের শেষে অথবা জুন মাসের প্রথম দিকের এক দুপুরে হুজুর নজরুলকে দেখিতে ধানমণ্ডির বাসায় গিয়াছিলেন। পূর্বেই উল্লেখ করিয়াছি উভয়ের সাক্ষাতমুহূর্ত নিরীক্ষণ করিতে আমি উদগ্রীব ছিলাম। নজরুল নিচের তলায় একটি লম্বা সোফায় ছেলেমানুষের মত জড়সড় হইয়া চোখ বুজিয়া শুইয়া ছিলেন। মেঝেতে কার্পেট বিছানো ছিল। হুজুর সরাসরি নজরুলের সম্মুখে গিয়া (যেভাবে নামাজে বসিতে হয়) বসিলেন।

কবি ভবনের আঙ্গিনায়, বারান্দায় ও ভিতরে মানুষ গমগম করিতেছিল।

কবির মুখাবয়বের দিকে হুজুর এক দৃষ্টিতে কতক্ষণ তাকাইয়া রহিলেন। এর মধ্যে কবি দুইবার কি তিনবার চোখ মেলিয়া তাকাইলেন। অতঃপর চোখ বুজিয়া যেভাবে শুইয়াছিলেন সেই ভাবেই শুইয়া রহিলেন।

হুজুর মিনিট তিনেক চোখ বুজিয়া বসিয়া রহিলেন। অতঃপর কাগজ কলম চাহিয়া লইলেন এবং তাহাতে কবির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করিয়া এবং তাঁহাকে দোয়া করিয়া ৭/৮ টি বাক্য লিখিলেন। ইহা সাংবাদিকদের দিবার জন্য অধুনালুপ্ত দৈনিক পয়গামের বার্তা সম্পাদক সৈয়দ আসাদুজ্জামানের হাতে দিলেন।

হুজুর যখন লিখিতে ছিলেন কবির পুত্রবধূ উমা কাজি তখন হারমোনিয়াম বাজাইতে ছিলেন। যখন বিদায় লইবেন তখন উমা কাজী হুজুরকে সালাম করিলেন এবং কবির নাত-নাতনীকে তাঁহার সহিত পরিচয় করাইয়া দিলেন। হুজুর তাহাদের কুশলাদি জিজ্ঞাসা করিয়া আদর করিলেন।

গত ৭ আগস্ট ( ১৯৭৬ ) দুপুরে পিজি হাসপাতালের ১৩২ নম্বর কেবিন হইতে চলন্ত স্ট্রেচারে করিয়া হুজুরকে ১১৭ নম্বর কেবিনের সম্মুখ দিয়া অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হইয়াছিল। রাত্রিতে হুজুর আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘একটি কেবিনের সামনে পুলিশ দেখলাম। ঐ কেবিনে কে আছে ?’

আমি বলিলাম, ‘কবি নজরুল!’

হুজুর কিছুক্ষণ চুপ থাকিয়া বলিলেন, ‘এই একটা লোকই থাকল। এ-ও গেলে একটা আমল শেষ।’

(সূত্রঃ সৈয়দ ইরফানুল বারী; ৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭৬ সাপ্তাহিক হক-কথায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের অংশবিশেষ/ সংগৃহীত: ফসিউল আলম/ ঘাটাইলডটকম)/-