বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী আর কিছু কথা

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন জিয়াউর রহমান প্রথমে নিজের নামে, পরে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ও নামে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এরপর জিয়াউর রহমানের ০২’শিশু সন্তান তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানকে নিয়ে আত্মগোপনে চলে যান তাঁর স্ত্রী খালেদা জিয়া। কিছুদিন আত্মগোপন করে থাকার পর ১৬মে নৌপথে নারায়ণগঞ্জ হয়ে ঢাকায় আসেন খালেদা জিয়া। বড়বোন খুরশিদ জাহানের বাসায় ১৭জুন পর্যন্ত থাকেন এবং ০২জুলাই সিদ্ধেশরীতে জনাব এস আব্দুল্লাহ’র বাসা থেকে পাকসেনারা তাকে ও ০২ ছেলেসহ বন্দী করে। ১৫ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত তিনি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দী ছিলেন এবং ১৬ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে তিনি মুক্তি পান।

 

জিয়াউর রহমান ৩০মে ১৯৮১ চট্টগ্রামে সামরিক অভুত্থ্যানে নিহত হলে বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের চাপে ০৩জানুয়ারি ১৯৮২ বিএনপিতে যোগ দেন খালেদা জিয়া। ২৪মার্চ ১৯৮২ সেনা প্রধান এরশাদ বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করলে খালেদা জিয়া এর বিরোধিতা করেন এবং মার্চ১৯৮৩ তিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারপারসন হন। ০১এপ্রিল ১৯৮৩ দলের বর্ধিত সভায় খালেদা জিয়া প্রথম বক্তৃতা করেন এবং বিচারপতি আবদুস সাত্তার অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তীতে ১০মে ১৯৮৪ পার্টির চেয়ারপারসন নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত হন।

 

বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের আপোসহীন নেত্রী, বাংলাদেশের প্রথম ও মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী, নারী শিক্ষা প্রসারের অগ্রদূত খালেদা জিয়ার জন্মদিন আজ। বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত ০৩বারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ১৫আগস্ট ১৯৪৭ জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। ০৩ বোন এবং ০২ ভাইয়ের মধ্যে তিনি তৃতীয় এবং ভাইয়েরা সবার ছোট।

 

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই মূলত বিএনপি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। এ দলটি’র সাংগঠনিক ধারা তৃণমূলে গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত এমনকি কৃষক-শ্রমিক-হকারসহ সমাজের নিম্নস্তরে যেমন তেমনি শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, সামরিক বেসামরিক আমলা, ব্যবসায়ী শ্রেণীর মধ্যেও বিএনপি তুমুল জনপ্রিয়।
বাংলাদেশকে এরশাদের স্বৈরাচারী শাসন থেকে মুক্ত করতে ১৯৮৩ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ০৭দলীয় ঐক্যজোট গঠিত হয় এবং একইসময় এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। সেসময় তার নেতৃত্বে ০৭ দল ও আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন ১৫ দলের সাথে যৌথভাবে আন্দোলনের কর্মসূচী শুরু হয়। ১৯৮৬ পর্যন্ত ০৫দফা আন্দোলন চলতে থাকে। কিন্তু ২১মার্চ ১৯৮৬ রাতে শেখ হাসিনা এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে বাধার সৃষ্টি হয় এবং ১৫ দল ভেঙ্গে ০৮ দল ও ০৫ দল হয়। ০৮ দল নির্বাচনে যায়। অন্য দিকে খালেদাজিয়ার নেতৃত্বে ০৭ দল ও ০৫ দলীয় ঐক্যজোট আন্দোলনে থেকে যায় এবং নির্বাচন প্রত্যাখান করে। ১৯৮৭ সাল থেকে খালেদা জিয়া এক দফার এরশাদ হটাও আন্দোলন শুরু করেন, ফলে এরশাদ সংসদ ভেঙ্গে দেয় এবং পুনরায় শুরু হয় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। অবশেষে ০৬ডিসেম্বর ১৯৯০ গণঅভ্যুত্থানের মুখে এরশাদের পতন হয়। দীর্ঘ ০৮ বছর একটানা নিরলস ও আপোসহীন সংগ্রামের পর ২৭ফেব্রুয়ারি ১৯৯১ অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বিএনপি এবং মোট ০৫ টি আসনে অংশ নিয়ে ০৫ টিতেই জয়লাভ করেন খালেদা জিয়া।

 

এদিকে ২৮অক্টোবর ২০০৬ আওয়ামীলীগের সাথে লড়াইয়ে পল্টনের লগি-বৈঠা হত্যাযজ্ঞ ঘটে এবং যাকে সামনে রেখে ১১জানু ২০০৭ জরুরি অবস্থা জারি করে সেনাসমর্থিত ওয়ানইলিভেন সরকার। ২০-২২আগস্ট ২০০৭ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নেতৃত্বে জরুরি অবস্থা বিরোধী আন্দোলন হলে সকল রাজনৈতিক পক্ষই সরকারের বিরোধিতা করে। এরমধ্যেই ০৩সেপ্টেম্বর ২০০৭ খালেদাজিয়া এবং তার কনিষ্ঠ পুত্র কোকোকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং এর আগে ০৭মার্চ তারেক রহমানকেও গ্রেফতার করে ওয়ানইলিভেন সরকার। ০২ ছেলেকে গ্রেপ্তারের পর রাষ্ট্রীয় হেফাজতে নিয়ে নিষ্ঠুর নির্যাতন করা হয়, এতে তারেকের মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যায়। খালেদাজিয়া ১১সেপ্টেম্বার ২০০৮ মুক্তিলাভ করেন এবং ১১জুন ২০০৮ মুক্তি পান শেখ হাসিনা, আর হৃদযন্ত্রে আঘাত পেয়ে দীর্ঘদিন অসুখে ভুগে খালেদা জিয়ার ছেলে আরাফাত রহমান মারা যান ২৪জানুয়ারি ২০১৫ নির্বাসিত থাকাবস্থায়। তাছাড়া খালেদা জিয়া তাঁর রাজনৈতিক জীবনে ২৮নভেম্বর ১৯৮৩, ০৩মে ১৯৮৪, ১১নভেম্বর ১৯৮৭’তেও গ্রেপ্তার হন।

 

ওয়ানইলিভেন পরবর্তীতে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা সরকার গঠনের পর খালেদা জিয়া ও তার ০২’ছেলের বিরুদ্ধে বৈরি মনোভাব দেখায় এবং নিজেদের মামলা প্রত্যাহার করে নিলেও জিয়া পরিবারের মামলাগুলো বহাল থাকে। এদিকে ১৩নভেম্বর ২০১০ ঈদের ছুটির মধ্যে ঢাকা সেনানিবাসের মইনুল সড়কের ০৬নম্বর বাড়ি থেকেও তাঁকে উচ্ছেদ করা হয়, যেখানে ১৯৭২সাল থেকে অবস্থান করছিলেন।

আজকের বাংলাদেশের বর্তমান গণতন্ত্রহীন অবস্থা থেকে খালেদা জিয়া বাংলাদেশকে উত্তরণ ঘটাইতে পারলে বিশ্ব মুসলিম নারী নেতৃত্ব’র প্রথম কাতারে নিজেকে ঐতিহাসিক অবস্থানে হয়তোবা নিয়ে যেতে সক্ষম হতে পারেন।

 

(মোহাম্মদ সারোয়ার জাহান/ ঘাটাইল.কম)/-