বর্তমানের চলচ্চিত্র ও গানে কি কোন বার্তা পাওয়া যায় তরুণ প্রজন্মর জন্য?

মোহাম্মদ হান্নান পরিচালিত ‘বিক্ষোভ’ চলচ্চিত্রে ‘বিদ্যালয় মোদের বিদ্যালয়, এখানে সভ্যতারই ফুল ফোটানো হয়’ ও ‘একাত্তরের মা জননী, কোথায় তোমার মুক্তি সেনার দল’ শিরোনামে দুটি ভিন্নধর্মী গান ছিল। কাজী হায়াতের ‘ত্রাস’ চলচ্চিত্রে ‘একতা শান্তি শৃঙ্খলা, জ্ঞানের পথে এগিয়ে চলা’ শিরোনামে একটা গান ছিলো। শহিদুল ইসলাম খোকনের ‘ঘাতক’ চলচ্চিত্রে ‘যদি মানুষের মতো মানুষ হতে চাও, তবে ভালোবাসো এদেশকে’ শিরোনামে একটা গান ছিল। শাহ আলম কিরনের ‘আসামী বধূ’ চলচ্চিত্রে ‘গানে গানে বলি শোন সকলে, এসো কলেজের এই প্রাঙ্গণে’ শিরোনামে একটি গান ছিলো। এমন আরও অনেক সিনেমার অনেক গানের কথা আমি বলতে পারবো যে তালিকাটা দিলে লিখাটি অনেক বড় হয়ে যাবে। উল্লেখিত সকল গানগুলো ছিলো সেই সময়ের তরুণ প্রজন্মকে দেয়া একটি বার্তা।

চলচ্চিত্র বিনোদনের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম, যা দিয়ে চাইলে একজন পরিচালক বিনোদনের মাধ্যমে অনেক বার্তা দর্শকদের কাছে পৌছাতে পারেন এবং সেই কাজটিই করেছিলেন আমাদের সেই সময়ের মেধাবী পরিচালকরা। সমাজ সচেতনমূলক অনেক বার্তা তাঁরা কখনও ছবির গল্প, কখনও ছবির গান, সংলাপের মাধ্যমে দিয়ে থাকতেন। ৯০ দশকের শুরুতে আমাদের সিনেমা হলের দর্শকদের মধ্য বড় একটি অংশ ছিল সেই সময়ের কিশোর তরুণরা যারা নিয়মিত পাগলের মতো সিনেমা হলে ছুটে যেতো। নতুন প্রজন্মের সেইসব দর্শকদের কাছে আমাদের পরিচালকরা উদ্দিপনামুলক সমাজ সচেতনের অনেক বার্তা দিয়ে দিতেন। সিনেমার গান ছিল বার্তা দেয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশল, কারণ একটি শ্রুতিমধুর গান সিনেমা শেষ হলেও তা রয়ে যায় দর্শকদের মুখে মুখে, মনে মনে। এই কারণে আর্টিকেলের শুরুতে উল্লেখিত গানগুলোর মতো অনেক গান সেইসময় আমাদের চলচ্চিত্রে ব্যবহার করতেন পরিচালকরা আর প্রতিটি গানের কথা ও সুরও ছিল মৌলিক এবং নান্দনিক।

বিক্ষোভ সিনেমার ‘বিদ্যালয় মোদের বিদ্যালয়’ গানটিতে যেমন তরুণ প্রজন্মকে শিক্ষাঙ্গনকে ভালোবাসার একটি বার্তা দেয়া হয়েছে ঠিক তেমনি ‘একাত্তরের মা জননী, কোথায় তোমার মুক্তি সেনার দল’ গানটিতে দেশের অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ার সাহস জাগিয়ে তোলার একটি বার্তা দেয়া হয়েছে। কারণ আমাদের তরুণ সমাজরাই পারে সকল অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে এই দেশটাকে ভালোবেসে গড়তে।

‘ত্রাস’ সিনেমায় গল্পটি যেমন ছিল সমসাময়িক ছাত্ররাজনীতির অন্ধকারের উপর ঠিক তেমনি ‘একতা শান্তি শৃঙ্খলা, জ্ঞানের পথে এগিয়ে চলা’  গানটি ছিলো ছাত্রসমাজকে ঐক্যবদ্ধ থেকে ঘুণে ধরা রাজনীতির অন্ধকার দূর করে আলোর পথ দেখানোর একটা বার্তা। যা দিয়ে উপকৃত হবে এই সমাজ, এই জাতি ও এই দেশ।

শহিদুল ইসলাম খোকনের ঘাতক সিনেমায় ‘যদি মানুষের মতো মানুষ হতে চাও, তবে ভালোবাসো এই দেশকে’ গানটির মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছিল এই দেশের রাজনীতির সকল মহান পুরুষদের। যেখানে মওলানা ভাসানী, শের-ই-বাংলা ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সরোয়ার্দি, শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান যারা গানের কথার মাঝে যার যার কাজের জন্য স্বীকৃতি পেয়েছেন। গানটি ছিলো বিভেদ বিভাজন ভুলে এদেশের মানুষ ও দেশকে ভালোবেসে মানুষের মতো মানুষ হওয়ার জন্য একটি উদ্দিপনামুলক বার্তা।

শাহ আলম কিরনের ‘আসামী বধূ’ সিনেমায় গানে গানে বলি শোন সকলে গানটির মাধ্যমে আবারো শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র সমাজের ঐক্যবদ্ধ থেকে শিক্ষাঙ্গনকে পবিত্র রাখার একটি বার্তা। গানটির কথার প্রতিটি লাইনে লাইনে ছিলো ছাত্রদের জন্য বার্তা, যেমন ‘অস্ত্র ফেলে কলম নাও তুলে’ লাইনটিতে ছাত্ররাজনীতির নামে শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসকে বয়কট করে কলম দিয়ে রাজনীতি করার কথা বলা হয়েছে। আবার ‘শিক্ষক সেতো পিতারই মতো’ লাইনটিতে নস্ট রাজনীতির নষ্ট ছাত্রদের ইঙ্গিত করে শিক্ষকের মর্যাদা সম্পর্কে একটি বার্তা দেয়া হয়েছে।

এমন করে বলতে গেলে আরও অনেক গানের কথা বলা যাবে যে গানগুলো আমরা সিনেমা শেষে সিনেমা হল থেকে বের হতে হতে গুনগুন করতাম। যে গানগুলোর কথা আমাদের ভাবিয়ে তুলতো। গত ১৫ বছরে নির্মিত এদেশের চলচ্চিত্রগুলোর মাঝে এমন একটি গান আমাকে কেউ কি দেখাতে পারবেন যে গানটি দিয়ে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে কোন বার্তা দেয়া হয়েছে? জানি পারবেন না দেখাতে। কারণ এখনকার চলচ্চিত্রে তরুণ প্রজন্মকে সমাজ সচেতন মূলক কিছু দেখানো হয় না, বরং দেখানো হয় কিভাবে মোবাইলে একাধিক নারীর সাথে কথা বলে প্রেম করা যায়, কিভাবে পরকীয়া করা যায়, কিভাবে লিটনের ফ্ল্যাটে গিয়ে ডেটিং করা যায় এমন সব নষ্ট কিছু।

তরুণ প্রজন্মকে বিনোদনের মাধ্যমে তাঁদের মাঝে কিভাবে সমাজ, দেশ গঠনের বার্তা দেয়া যায় এমন মেধাবী পরিচালকও এখন আর নেই । যুগটা যখন নষ্টদের দখলে যায় তখন সবকিছু তো নষ্ট হবেই।

(ফজলে এলাহী, ঘাটাইলডটকম)/-

260total visits,1visits today