ফের নির্বাচন দাবি ডাকসু ভিপি নুরসহ ৫ প্যানেলের

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের হল সংসদ নির্বাচনের ফল বর্জন করে পুনঃনির্বাচনের দাবিতে ফের পাঁচটি প্যানেল একসঙ্গে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। রোববার (১৭ মার্চ) সন্ধ্যায় মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এ দাবি জানান ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ থেকে ডাকসু নির্বাচনে সহকারী সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ফারুক হাসান।

তিনি বলেন, ১১ মার্চ যে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তাতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হয়নি। নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি মানুষের যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, সেটা থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য ডাকসু নির্বাচনকে একটি রোল মডেল হিসেবে উপস্থাপন করা যেত। কিন্তু ১১ মার্চ অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে অনিয়ম কারচুপিসহ অস্পষ্টতা দৃশ্যমান হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক ধারাকে সমুন্নত রাখতে এই নির্বাচনকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রেখে সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবির আলোকে ১১ মার্চের বিতর্কিত নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় নির্বাচনের জন্য তফসিল ঘোষণার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি তিনি দাবি জানান।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেনে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের প্যানেল থেকে নির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নুর, একই প্যানেলের জিএস পদে প্রতিদ্বন্দ্বীতাকারী রাশেদ খান ও ফারুক হাসান, স্বতন্ত্র জোট থেকে ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী অরণি সেমন্তি খান, স্বাধিকার পরিষদ থেকে জিএস পদে  প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী আসিফুর রহমান, ছাত্র ফেডারেশনের জিএস প্রার্থী উম্মে হাবিবা বেনজীরসহ অন্যরা।

স্বতন্ত্র জোটের অরণি সেমন্তি খান সংবাদ সম্মেলনে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলো হলো— জালিয়াতির ডাকসু নির্বাচন বাতিল, পুনঃতফসিল ঘোষণা, ব্যর্থ ভিসির অপসারণ, মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং হামলাকারীদের ডাকসু ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ প্যানেল থেকে নির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নুর বলেন, আমার আগের অবস্থানে আমি এখনও অনড়। এই নির্বাচনে অনিয়ম-কারচুপি হয়েছি। আমি পুনরায় নির্বাচন চাই।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতে গিয়ে গণভবনে দেওয়া বক্তব্য প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নুর বলেন, সৌজন্যতাবোধ থেকে কথা বলেছি। পুনঃনির্বাচন চাওয়ার কোনো বিষয় সেখানে ছিল না। তবুও আমি নির্বাচনে অনিয়মের বিষয়ে বলেছি এবং কারচুপি তদন্ত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলার দাবি জানিয়েছি।

সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নুর বলেন, শুরু থেকেই আমি আমার বক্তব্য স্পষ্ট করেছি। জাতির জনকের একটি কথার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে বলতে চাই, ‘যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে এবং তারা যদি সংখ্যায় একজনও হয়, সেটা আমাদের বিবেচনা করা উচিত।’ সেই ধারণা থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা যে দাবি তুলেছে, আমরাও দেখেছি যে এই নির্বাচনে অনিয়ম-কারচুপি হয়েছে। সেই জায়গা থেকে আমরা বিভিন্ন প্যানেলের সঙ্গে একাত্মতা পোষণা করেছি। ২৮ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে নির্বাচন হয়েছে, এই নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। বরং এই নির্বাচনের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি কালিমা লেপে দেওয়া হয়েছে। সে কারণেই আমরা বলেছি, এই নির্বাচন পুনরায় দিতে হবে, যেখানে অবাধ-সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে। এবং এই নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তা, যারা বিভিন্ন বিতর্কিত ভূমিকা রেখেছেন, তাদের পদত্যাগ করতে হবে। সেই জায়গা থেকেই আমি শুরু থেকেই বক্তব্য দিয়ে আসছিলাম। এখনও আমি একই দাবি পুনরায় ব্যক্ত করছি।

নুর বলেন, আমি একজন ভিপি প্রার্থী হয়ে রোকেয় হলে শিক্ষকদের দ্বারা লাঞ্ছিত হয়েছি, হামলার শিকার হয়েছি। সেই জায়গা থেকেও জাস্ট একটি দৃষ্টান্ত দেখিয়েছি। সেই জায়গা থেকে আমরা বলেছি, দীর্ঘ ২৮ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা কোনো কলঙ্কিত নির্বাচন চাই না। আমরা সব ছাত্রদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং ভোটের মাধ্যমে একটি নির্বাচন চাই, যেটাতে ছাত্রদের আস্থার প্রতিফলন ঘটবে।

ভিপি হিসেবে কার্যক্রম চালানো অবস্থায় নির্বাচন চান কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি এখনও কার্যক্রম চালাইনি বা দায়িত্ব নেইনি। পরিবেশ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এবং আমরা যারা একসঙ্গে আন্দোলন করছি, তাদের সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেব— আমি দায়িত্ব নেব কি না।

পাঁচ প্যানেল আলাদা আলাদ হয়ে গেছে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে নুরুল হক নুর বলেন, গতকাল গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমার কিছু কথা হয়েছে। সেই মেসেজগুলো আমার সংগঠনের সবার সঙ্গে শেয়ার করতে হয়েছে। সে কারণেই আগের সংবাদ সম্মেলনে থাকতে পারিনি।

গণভবনে পুনরায় নির্বাচনের দাবির বিষয়টি না তোলার বিষয়ে নুর বলেন, ডাকসু নির্বাচন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়। এটি প্রধানমন্ত্রীর কেনো বিষয় নয়। নির্বাচনে যারা জয়ী হয়েছেন, তাদের ডেকেছিলেন তিনি। তার প্রতি সম্মান রেখে সেখানে গিয়েছি। নির্বাচনের এখতিয়ারের বিষয়ে কিন্তু তার কিছু করার নেই। আমি জাস্ট তার (প্রধানমন্ত্রীর) নজরে এনেছি যে নির্বাচনে অনিয়ম হয়েছে, ছাত্ররা তার সমাধান চাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর জায়গা থেকে তিনি যেন প্রশাসনকে এই বিষয়ে অবহিত করেন, সেটা বলে এসেছি।

আগামীতে যেন অনিয়ম না হয়— গণভবনের বক্তব্যে এমন প্রসঙ্গের অবতারণার অর্থ এই নির্বাচনকে মেনে নেওয়া কি না, জানতে চাইলে নুর বলেন, কাল (শনিবার) গণভবনে যেটা আমরা প্রথম শুনেছিলাম, সেখানে হল সংসদ ও কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) প্রতিনিধি থাকবে। কিন্তু সেখানে আমরা দেখেছি, হল পর্যায়ের বাইরেও ছাত্রলীগের বিভিন্ন ইউনিটের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এমনকি মহানগর উত্তর ও দক্ষিণেরও। সেখানে যাওয়ার পর এই বিষয়টি নিয়ে আমার অস্বস্তিবোধ হয়েছে। আপনারা জানেন, স্বাভাবিকভাবে মানুষের একবার কনসেনট্রেশন নষ্ট হয়ে যায়, তখন কথা বলার ওই মুডটা থাকে না। আমি ওই কথা বলতে পারিনি। ওখানে আমরা গিয়েছি জাস্ট প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্যতা দেখিয়ে।

প্রসঙ্গত, গত ১১ মার্চ নির্বাচনের দিনই পাঁচটি প্যানেল এক হয়ে ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন বর্জন ঘোষণা করে। প্যানেলগুলো হলো— কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের জোট, বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রগতিশীল ছাত্র ঐক্য জোট, স্বাধিকার স্বতন্ত্র পরিষদ, স্বতন্ত্র জোট ও ছাত্র ফেডারেশন সমর্থিত প্যানেল। তবে ১২ মার্চ রাজু ভাস্কর্যে নুর সাংবাদিকদের কাছে ভিপি ও সমাজসেবা সম্পাদক (এই দু’টি পদে কোটা আন্দোলনকারীদের জোটের প্রার্থী বিজয়ী) পদ বাদে বাকি পদগুলোতে ফের নির্বাচনের দাবি জানান তিনি। যদিও তিনি বলেন, প্যানেলের বাকি সবার সঙ্গে কথা বলেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন তিনি। পরে একাধিকবার তিনি ডাকসু ও হল সংসদের পুনঃনির্বাচনের দাবি জানান।

(সারাবাংলা, ঘাটাইলডটকম)/-

250total visits,1visits today