ফরাসি লিগে যাওয়া নেইমারের জন্য ক্ষতিই?

বার্সেলোনা ছেড়ে পিএসজিতে পাড়ি জমাচ্ছেন নেইমার—কদিন ধরে এমন গুঞ্জন চারদিকে। নেইমারকে জিজ্ঞেস করতেই পারেন, শক্তি-সাফল্য-ঐতিহ্যের বিচারের বার্সার চেয়ে পিএসজি কি ঢের এগিয়ে? কিংবা লা লিগার চেয়ে কি লিগ ওয়ান এগিয়ে? নিশ্চিত ‘না’-এর পক্ষেই ভোট পড়বে বেশি। তবুও নেইমার কেন বার্সা ছাড়তে চাচ্ছেন?

কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার হাতছানি তো আছেই। এক লাফে নেইমারের বেতন তিন গুণ বাড়তে পারে পিএসজিতে গেলে। তাঁর এজেন্ট হিসেবে কাজ করা বাবা নেইমার সিনিয়রেরও বেশ কিছু বড় অঙ্কের অর্থপ্রাপ্তি ঘটবে। তবে টাকাই তো শেষ নয়; নেইমারের মূল চাওয়া আসলে লিওনেল মেসির ছায়া থেকে বের হওয়া। সোজা কথায়, নেইমার বিশ্বসেরা হতে চান। জিততে চান ব্যালন ডি’অর বা ফিফা বর্ষসেরার পুরস্কার। পিকে-মাসচেরানোরদের সাম্প্রতিক কথাবার্তায়ও সেটি বোঝা গেছে।
কিন্তু পিকে-মাসচেরানো নিজে যে সতর্কবার্তা দিয়েছেন সতীর্থকে, নেইমারের আসলেই কি তা ভেবে দেখা উচিত? ফরাসি লিগে গেলে ব্যালন ডি’অর জেতার সম্ভাবনা বরং কমে যাবে কি নেইমারের? পিকে যেমন বলেছেন, চ্যাম্পিয়নস লিগ না জিততে পারলে নেইমার তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা কখনোই পাবেন না।
২৫ বছর বয়স নেইমারের, এখনো জেতা হয়নি ব্যালন ডি’অর। অথচ এই বয়সে মেসির তিনবার জেতা হয়ে গিয়েছিল পুরস্কারটা। মর্যাদার এই পুরস্কার হাতে তুলতে নেইমারকে যে পাল্লা দিতে হবে মেসি-রোনালদোর সঙ্গে, সেটি তো ইউরোপে পা দেওয়ার পরই তিনি বুঝেছেন। এই লড়াইয়ে জিততে হলে খেলতে হবে এমন ক্লাবে, যেখানে তিনিই সবচেয়ে বড় তারকা, যেখানে দলের সাফল্যে তাঁর ভূমিকাই থাকবে বেশি—এমন উপলব্ধি হয়তো নেইমারের। বার্সায় মেসি তো আছেনই, লুইস সুয়ারেজও এদিক দিয়ে এক অর্থে তাঁর বাধা।
কিন্তু পিএসজিতে গেলেই কি নেইমারের পক্ষে ব্যালন ডি’অর জেতা সম্ভব? নাকি ফরাসি লিগে গেলে উল্টো আড়ালেই চলে যাবেন বিশ্ব ফুটবল থেকে। যেমনটা গিয়েছিলেন ইব্রা-এডিনসন কাভানিরা। সেখানে গোলের পর গোল করে গেলেও কি ব্যালন ডি’অর জেতাও সম্ভব হবে নেইমারের?
ফরাসি লিগ এখনো জনপ্রিয়তা ও মানে ইউরোপে আছে ৫ নম্বরে। সত্যি বলতে কি, এক দিক দিয়ে তাদের অবস্থান ছয়ে। যেটা বোঝা যায় ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শ্যু পুরস্কারের বেলায়। ফরাসি লিগে ক্লাবের একজন খেলোয়াড়কে গোলপ্রতি পয়েন্ট দেওয়া হয় ১.৫। স্প্যানিশ, ইংলিশ, জার্মান, ইতালি এমনকি পর্তুগিজ লিগে গোলপ্রতি ২ পয়েন্ট পাওয়া যায়। ধারে-ভারে স্প্যানিশ লিগের ধারে-কাছেও নেই ফরাসি লিগ। জনপ্রিয়তা, টিভি দর্শকসংখ্যা, ম্যাচপ্রতি মাঠে উপস্থিতি—সবদিক দিয়েই পিছিয়ে। দর্শকের উন্মাদনায়, মাতামাতিতে কোনো কোনো ফুটবল বিশ্লেষক ফরাসি লিগকে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল লিগেরও পেছনে রাখেন।
দৃশ্যটা বদলাচ্ছে। কিন্তু ইউরোপীয় পর্যায়ে ইতিহাস আর ঐতিহ্যের একটা ভার আছে। এ কারণে অনেক টাকা ঢেলেও যেমন ইউরোপীয় পর্যায়ে সাফল্য পায়নি ম্যানচেস্টার সিটি। পিএসজিও একটা পর্যায়ে গিয়ে আটকে আছে, দলে তারকার পর তারকা ভিড়িয়েও। নেইমারকে আশাবাদী করতে পারে, তিনি গেলে হয়তো ছবিটা বদলাবে। কিন্তু এই বদলানোর নিশ্চয়তা থাকতে হবে। কারণ ফরাসি লিগ জিতলে বা ফরাসি লিগে ৪০-৪৫ গোল করেও নেইমার বর্ষসেরা হতে পারবেন না। চ্যাম্পিয়নস লিগ তাঁর জিততেই হবে।
ফরাসি ক্লাবগুলোর মধ্যে মার্শেই সর্বশেষ চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছে, ১৯৯৩ সালে। ফরাসি ক্লাবে খেলা মাত্র একজনই জিতেছেন ব্যালন ডি’অর—জঁ-পিয়েরে পাপাঁ। সেটিও ১৯৯১ সালে।
নেইমারের সামনে অবশ্য একটা বড় সুযোগ আছে। পাঁচবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা বার্সা ছেড়ে যদি প্রথমবারের ইউরোপ শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট এনে দিতে পারেন পিএসজিকে, তাহলেই হয়তো ইতিহাসের পাতায় উঠে যাবে তাঁর নাম। কিন্তু ইতিহাসে এভাবে নাম ওঠানো কতটা কঠিন, জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচের কাছে জানতে পারেন নেইমার।
যদি বর্ষসেরা হতে চাওয়াই ক্লাব বদলানোর কারণ হয়ে থাকে, নেইমার বরং ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের কোনো ক্লাবের কথা ভাবতে পারেন। কিংবা নিদেন জার্মান লিগ। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ২২২ মিলিয়ন ইউরো দেওয়ার সামর্থ্য এখন ইংলিশ ক্লাবগুলোর নেই। সে ক্ষেত্রে নেইমার বরং রিয়াল মাদ্রিদে যাওয়ার কথা ভাবতে পারেন। ১৮ বছর বয়সী এমবাপ্পের জন্য যারা ১৮০ মিলিয়ন ইউরো নিয়ে বসে আছে, নেইমারের জন্য ২২২ মিলিয়ন কেন খরচ করতে পারবে না!

88total visits,1visits today

Leave a Reply