পোঁকামাকড় ও রোগবালাই থেকে ফসল রক্ষায় দেলদুয়ারে জনপ্রিয় পার্চিং পদ্ধতি

পোঁকামাকড় ও রোগবালাই থেকে ফসলকে রক্ষা করা, কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে আনা ও পরিবেশ সম্মতভাবে ফসল উৎপাদন- এই তিনটি স্লোগান নিয়ে ইরি-বোরো ক্ষেতে ‘ডাল পোতা উৎসব’ (পার্চিং উৎসব) শুরু হয়েছে। টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের কৃষকদের দিয়ে ইরি-বোরো ক্ষেতে ডালপালা পুঁতার কার্যক্রমের উদ্যোগটি নিয়েছেন স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। আর এ কারণে উপজেলার কৃষকের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ইরি-বারো ক্ষেতের পোকা দমন করার ‘পার্চিং পদ্ধতি’।

জানা যায়, ক্ষতিকারক পোকার আক্রমণ থেকে ইরি-বোরো ক্ষেত রক্ষায় এ পদ্ধতি একটি কৃষি বান্ধব প্রযুক্তি। সাধারণত ‘লাইভ পার্চিং’ ও ‘ডেথ পার্চিং’ নামের দুই ধরনের পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার হয়ে থাকে। কৃষকরা এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফসলের অধিক ফলন পেয়ে থাকে। এছাড়া জমিতে কীটনাশক খরচ কম ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পায়। সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গ্রামগঞ্জের কৃষকরা ধান লাগাচ্ছে, কিছু কিছু ধান ক্ষেত সবুজ হয়েছে যা বাতাসে দুল খাচ্ছে। ক্ষেতের মধ্যে একর প্রতি ১০ থেকে ১২ টি বাঁশের কঞ্চি কিংবা গাছের ডাল পোঁতা রয়েছে। ওই পার্চিংয়ে (খুঁটিতে) ফিঙ্গে, শালিক, দোয়েলসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি বসছে। সুযোগ বুঝে ধানক্ষেতে থাকা ক্ষতিকর পোকা ওইসব পাখিরা খেয়ে ফেলছে।

দেলদুয়ার উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে উপজেলার প্রায় ৯ হাজার ৫২১ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো ধানের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। রোপণকৃত ওইসব ক্ষেতে ক্ষতিকর ঘাঁসফড়িং, পাতা মোড়ানো পোঁকা, চুঙ্গি ও মাজরা পোকার আক্রমণ দেখা দেয়। তাই এ সকল পোকার আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষায় বর্তমানে উপজেলায় প্রায় ৬০ ভাগ কৃষক পার্চিং ও আলোক ফাঁদ পদ্ধতি ব্যবহার করে সুফল পাচ্ছেন। এ বিষয়ে একাধিক কৃষক জানান, পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে অনেকটা কীটনাশকের ব্যবহার কমে গেছে। তাই এ পদ্ধতিটি আমাদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

এ নিয়ে উপজেলার পাথরাইল গ্রামের কৃষক বেলায়েত হোসেন বলেন, এ বছর আমি ক্ষেতে পার্চিং পদ্ধতির ব্যবহার করেছি। এতে খরচ নেই। রুপসী গ্রামের কৃষক শাজাহান জানান, বাড়ির গাছ থেকে ডাল কেটে ক্ষেতে পুঁতে দিয়েছি। ওই ডালে বসা পাখিরাই ক্ষেতের ক্ষতিকারক পোঁকা খেয়ে ফেলছে। এতে যেমন ধান গাছের উপকার হচ্ছে, তেমনি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পাচ্ছে। উপজেলার টুকনিখোলা গ্রামের কৃষক গোলাপ খান বলেন, উৎসবের মধ্য দিয়ে আমার এক একর জমির ফসলের ক্ষেতে ১০টি গাছের মরা ডাল পুঁতেছি। কয়েকদিন ধরে ক্ষেতে গিয়ে দেখি ডালে পাখি বসে আছে, আর উড়ে উড়ে পোঁকামাকড় খাচ্ছে। এ দৃশ্য দেখতে আমার ভালো লেগেছে। এটা যদিও আগেও দেখেছি তারপরেও এবার আরও ভালো লেগেছে। দেলদুয়ার সদর গ্রামের জাহাঙ্গীর ও উপজেলার সানবাড়ী গ্রামের কৃষক মুনসুর একই ধরনের মন্তব্য করেন।

সখীপুর কৃষি কার্যালয়ের উপ-সহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, ধানক্ষেতে গাছের ডাল পুঁতে রাখলে পাখিরা ওই ডালে বসে পোঁকামাকড় খেয়ে ফেলে। ফলে ওই জমিতে কীটনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন হয়না। পরিবেশ সম্মতভাবে ফসল উৎপাদন করা যায়। কৃষকরা অনেক আগে থেকেই ফসলের ক্ষেতে গাছের ডাল পুঁতে রাখত। বর্তমান কৃষি বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে পোঁকামাকড় থেকে ফসল রক্ষার জন্য ক্ষেতে ডাল পুঁতা পদ্ধতি নতুনভাবে আবিষ্কার করেছেন। কৃষি বিভাগ এ মৌসুমে দেলদুয়ারের কৃষকদের মাঝে এ পদ্ধতি ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

দেলদুয়ার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শয়েব মাহমুদ বলেন, উপজেলার প্রায় সকল কৃষকদের পার্চিং পদ্ধতির আওতায় আনার জন্য কাজ করছি। পার্চিং পদ্ধতি কৃষকের কৃষি ও পরিবেশ বান্ধব একটি পদ্ধতি। এ পদ্ধতিটি কৃষকদের মাঝে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কোন খরচ ছাড়াই এ পদ্ধতি ব্যবহার করে ক্ষেতে পোকার আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষা করতে পারবে কৃষকরা। দেলদুয়ারে এ মৌসুমে উচ্চ ফলনশীল জাতের ৯ হাজার ৫২১ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো ধান রোপণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। আশা করি এ লক্ষ্যমাত্রার বেশি আবাদ হবে এবার। আমাদের কার্যালয় থেকে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা গ্রামে গ্রামে গিয়ে উৎসব করে ফসলের কৃষকদের নিয়ে ক্ষেতে ডালপালা পুঁতার ব্যবস্থা করেছেন। তিনি নিজেও এ কার্যক্রমের তদারকি করছেন জানিয়ে বলেন, ক্ষেতে ডালপালা পুঁতে রাখলে কী উপকার হবে; এ নিয়ে সরেজমিন গিয়ে কৃষককে বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে। এ বছর এর সুফল পেলে কৃষক প্রতিবছর নিজের উৎসাহে ফসলের ক্ষেতে ডাল পুঁতে রাখবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

(দেলদুয়ার সংবাদদাতা, ঘাটাইলডটকম)/-

97total visits,1visits today