নওগাঁয় রাঘববোয়ালদের কবলে ‘বিলসুতি’, জনবিষ্ফোরণের আশংকা!

রাঘববোয়ালদের রাহুগ্রাসের অবৈধ দখলের কবলে পড়তে যাচ্ছে নওগাঁর আত্রাইয়ের উন্মুক্ত জলাশয় ‘বিলসুতি’। ইতিমধ্যে জলাশয়ে অবৈধ ভাবে স্থায়ী ভাবে বাঁধ নির্মাণ কালে উপজেলা প্রশাসন ১৯ জুন ২টি স্ক্যাবেটর জব্দ করার ২ দিন পরেই আবারো প্রকাশ্য দিবালোকে নতুন করে বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করার অভিযোগ উঠেছে। বৃহৎ জনস্বার্থে অবিলম্বে উন্মুক্ত জলাশয়ে অবৈধ বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে স্থায়ী ভাবে ব্যবস্থা গ্রহন না করলে কয়েক হাজার কৃষক ও মস্যজীবিদের ক্ষোভের আগুন জনবিষ্ফোরণের আকার ধারণ করতে পারে বলে অনেকেই আশংকা প্রকাশ করেছেন।

জানা গেছে, আত্রাই উপজেলার হাটকালুপাড়া ইউনিয়ন ও রাজশাহী বাঘমারা উপজেলার কিছু অংশ নিয়ে ঐতিহ্যবাহী এই উন্মুক্ত জলাশয় ‘বিলসুতি’র অবস্থান। বিলসুতির আয়তন প্রায় ১০০ বিঘা । মাছের অভয়অরন্য ,মৎস্য আহরোন,কৃষি জমিতে সেচ ব্যবস্থা ও পানির গতি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে ৭ বছর পূর্বে এই উন্মুক্ত জলাশয়ের অংশে বরেন্দ্র বহুমূর্খী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) খাল খননও করে। এই খাল খনননের ফলে বলসুতি’র পানি প্রবাহের নতুন গতিপথ সৃষ্টি হয় এবং গজমতখালি খাল দিয়ে শুটকিগাছা হয়ে আত্রাই নদীর মূল অংশের সাথে গতিপথের মিলনমেলার সৃষ্টি হয়েছে। জলাশয়ে আষাঢ় থেকে অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত পানি থাকে। বিলের পানি দিয়ে ওই ইউনিয়নের বড় শিমলা, চকশিমলাসহ কয়েকটি গ্রামের কৃষক প্রায় ৩ হাজার বিঘা জমির বোরো ও আউশের আবাদ করে থাকেন। এছাড়া ওই এলাকার প্রায় ৫শ মৎসীজীবি এ বিলে মাছ শিকার করে জীবন জীবিকা নির্বাহ করেন।

অভিযোগ রয়েছে, গত দুই বছর থেকে ওই জলাশয়ে স্থানীয় বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী বাঁশের বেড়া দিয়ে মাছ চাষ করছেন। বেশকিছু দিন থেকে চক্রটি নতুন ভাবে এই বিল দখলের পাঁয়তারা শুরু করে। এক পর্যায়ে উন্মুক্ত জলাশয়ের অংশে বরেন্দ্র বহুমূর্খী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের খননকৃত খালের মুখ বন্ধ করে ১৫/২০ দিন ধরে অব্যাহত ভাবে দুইটি স্ক্যাবেটর দিয়ে স্থায়ীভাবে বাঁধ নির্মানের কাজ করছেন। স্থায়ীভাবে এই বাঁধ নির্মান করা হলে বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের খাল খননের উপকার থেকে বঞ্চিত হবে এলাকাবাসি তেমনি জলাশয়ের মৎস্য ও মাৎস্য সম্পদের উপর ব্যাপক প্রতিকুলতার প্রভাব পড়াসহ জলাবদ্ধার চিরস্থায়ী দুঃখ হতে পারে বলে সতেচন মহল আশংকা প্রকাশ করছেন।

ভুক্তভোগী কৃষকদের অভিযোগ, পেশি শক্তির জোড়ে তাদের জমির মাটি কেটে নিয়ে প্রভাবশালীরা বাঁধ নির্মাণ করছেন। এই বাঁধ নির্মান করা হলে বর্ষা মৌসুমে বিল থেকে পানি নামতে পারবেনা। এতে করে সামান্য বৃষ্টিতে বন্যার সৃষ্টিসহ ফসল ডুবে ক্ষতির অশংকাসহ মৎসজীবিদের পরিবার পরিজন নিয়ে থাকরত হবে অর্ধাহারে অনাহারে।

বড়শিমলা গ্রামের কৃষক মোতাহার হোসেন বলেন, এই মাঠে আমার ৭ বিঘা ফসলি জমি আছে। ওই জমিতে আবাদ করে আমার সারা বছরের ভরন পোষন হয়ে থাকে। একটি মহল প্রজেক্টের নাম করে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য জোরপূর্বক জমি দখল করে স্থায়ীভাবে বাঁধ নির্মান করছেন। যে বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে পানি বেরিয়ে যাওয়ার কোন উপায় না থাকায় বর্ষা মৌসুমে আমাদের ফসল ডুবে যাবে। আবার যে জমি থেকে মাটি কেটে বাঁধ তৈরী করা হচ্ছে সেই জমিও নষ্ট হচ্ছে।

একই গ্রামের কৃষক শাহজাহান, মোজাম্মেল আলী, আজিজুর রহমান, মোখলেছার রহমান, সত্যেন্দ্রনাথসহ কয়েকজন বলেন, বরেন্দ্র বহুমূর্খী যে খাল খনন করেছে তার মুখ বন্ধ করে দিয়ে মাছ চাষ করতে প্রভাবশালীরা যেভাবে বাঁধ তৈরী করছে এতে করে নিচের জমিগুলো ডুবে যাবে। কোন ফসল হবেনা। গরু ছাগলকে ওই মাঠে ৩ মাস ঘাস খাওয়ানো হয় সেটাও বন্ধ হয়ে যাবে। গত তিন বছর ধরে জলাশয়ের পানি দিয়ে সেচ দিতে পারছিনা।

হাটকালুপাড়া গ্রামের মৎসীজীবি বয়তুল্লাহ ও আব্দুল করিম বলেন, আমরা দীর্ঘ বছর এই জলাশয় থেকে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকি। গত তিন বছর জলাশয় থেকে কোন মাছ শিকার করা তো দূরের কথা প্রভাবশালীরা আমাদের জলাশয়ে নামতে পর্যন্ত দেয় না।

এ বিষয়ে হাটকালুপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মোঃ আমজাদ হোসেন বলেন, বিলসুতি বিলে গত কয়েক বছর যাবৎ মাছ চাষ করা হচ্ছে। ইতোপূর্বে বাঁশের বেড়া (বানা) দিয়ে মাছ চাষ করা হতো। এবারে সেটা কয়েকশ সদস্য মিলে স্থায়ীভাবে বাঁধ নির্মান করে মাছ চাষ করার লক্ষে এই বাঁধ নির্মান করা হচ্ছে। এতে কৃষক ও মৎস্যজিবীদের কোন ক্ষতি হবে না বরং তারা উপকৃত হবেন।

আত্রাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো: ছানাউল ইসলাম বলেন, বিলে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসন স্ক্যাবেটর মেশিন জব্দ করেছে। বাঁধ নির্মাণ কাজ বন্ধে আইনগত ভাবে যা যা করা দরকার, সেভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। এটি একটি অবৈধ কাজ। উন্মুক্ত জলাশয়ে বাঁধ নির্মাণ করা হলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টিসহ স্থানীয় কৃষক ও মৎসজীবীদের সমস্যায় পড়তে হবে।

(রাজেকুল ইসলাম, রাণীনগর, নওগাঁ/ ঘাটাইলডটকম)/-