‘ঢাল্লা মিয়া, কিংবদন্তী এই রাজনীতিবিদদের এখন গোপালপুরবাসী স্মরণে রাখে না’

টাঙ্গাইলের গোপালপুরে নতুন আওয়ামী প্রজন্মের অনেকেই হয়তো প্রয়াত এ মানুষটিকে চেনেন না। নাম ও হয়তো শোনেননি। কারণ বিবর্তনের রাজনীতিতে অতীত ঢাকা পড়ে যায়। ধূঁসর হয়ে যায় অনেকের নাম। অবদান। ছবির মানুষটির নাম আমজাদ হোসেন ঢাল্লা মিয়া। গোপালপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি এবং মুশুদ্দী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। জন্মস্থান পার্শ্ববর্তী ধনবাড়ী উপজেলার ইসপিঞ্জারপুর-কেরামজানি। তখন মুশুদ্দী ইউনিয়ন ছিল গোপালপুর উপজেলাধীন।

১৯৮৮ সালে মুশুদ্দী ইউনিয়নকে গোপালপুর থেকে ব্যবচ্ছেদ করে মধুপুর উপজেলার অন্তর্ভূক্ত করা হয়। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং বর্তমান কৃষি মন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক এটি করেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। ব্যবচ্ছেদ এতো গোপনীয় ছিল যে, মিডিয়া তো দূর, কাকপক্ষীও টের পায়নি। তাই কোনো বাদপ্রতিবাদও হয়নি।

মুশুদ্দী ইউনিয়ন প্রথমে মধুপুর এবং পরে নবগঠিত ধনবাড়ীর অন্তর্ভূক্ত হলে গোপালপুরের সাথে এ জনপদের দূরত্ব বাড়ে। তবে আমজাদ হোসেন ঢাল্লা মিয়া গোপালপুরের সহিংস রাজনীতির প্রতি ক্ষুব্দ হয়ে পঁচাত্তর সালের পর অবসরে যান।

তিনি বিখ্যাত হয়ে উঠেন ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময়। সেই নির্বাচনে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, আবুল মনসুর আহমেদ ভেঙ্গুলা বাজারে জনসভা করেন। এর স্থানীয় আয়োজক ছিলেন সাবেক এমপি হাতেম আলী তালুকদার এবং আমজাদ হোসেন ঢাল্লা মিয়া। সেই নির্বাচনে মুসলিমলীগের প্রার্থী ছিলেন ধনবাড়ীর নবাবজাদা হাসান আলী চৌধুরী, আর যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী মধুপুর উপজেলার কুড়ালিয়ার আজাহার আলী। নির্বাচনে নবাবজাদা হাসান আলী বিপুল ভোটে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থীর নিকট হেরে যান।

আমার এ লেখা স্থানীয় কোনো প্রবীণ বন্ধু যদি পড়েন, তাহলে হয়তো তিনি আরও বিস্তৃত স্মরণ করতে পারবেন। যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের তিন দিন আগে কেরামজানি বাজারে, মুসলিমলীগ আয়োজিত জনসভায় ধনবাড়ীর নবাবজাদার আহব্বানে, ঢাকার নবাব পরিবারের এক সদস্য বক্তৃতায়, যুক্তফ্রন্টকে গালিগালাজ করেন। যুক্তফ্রন্টের প্রতীক নৌকায় ভোট দিলে, পূর্ব বাংলা ভারতের অঙ্গরাজ্য হবে এবং ইসলাম হুমকীর মুখে পড়বে বলে হুঁশিয়ার করা হয়। মুসলিম লীগের জনসভায় ওই বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন যুক্তফ্রন্ট কর্মী ঢাল্লা মিয়া। ধনবাড়ী থেকে আগত মুসলিম লীগের কয়েক পান্ডা আমজাদ হোসেনকে অপদস্ত চেষ্টাকালে স্থানীয়রা ক্ষুব্দ হন। একপর্যায়ে জনসভা ভেঙ্গে যায়। ক্ষুব্দ জনতা পঁচা ডিম আর কাঁদা ছুঁড়ে নবাবজাদা ও পান্ডাদের প্রতিঘাত করেন।

আমার জন্মের তিন বছর আগের ঘটনা এটি। স্কুলে পড়াকালে শিক্ষক ও মুরুব্বীদের নিকট এবং যৌবনকালে রাজনৈতিক বক্তৃতায় এসব শুনেছি। ঘটনাটি যেভাবে, যে আঙ্গিকে বা কারণে ঘটুক না কেন, এটি স্বতঃসিদ্ধ যে আমজাদ হোসেন ধর্ম নিয়ে রাজনীতির বিরুদ্ধে ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তার ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। এলাকার অনেককে তিনি যুদ্ধে পাঠিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সার্বিক সহযোগিতা করেছেন। স্বাধীনতার পর তিনি গোপালপুর উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতির দায়িত্ব অব্যাহত রাখেন। কিন্তু জাসদের গণবাহিনীর টার্গেটে পরিণত হয় এ সহজ সরল মানুষটি।

৭৫ সালের মে মাসে গোপালুরের গণবাহিনী তাকে হত্যার জন্য নন্দনপুরের বাসায় হামলা চালায়। নির্দয়ভাবে ছুরিকাঘাত করা হয়। মরণাপন্ন অবস্থায় তাকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। টানা দু’মাস চিকিৎসার পর তিনি কিছুটা সুস্থ হন। কিন্ত ধঁকল বঁয়ে বেড়িয়েছেন সারা জীবন। অসুস্থবস্থায়ই ৯৫ সালের ১ এপ্রিল ইন্তেকাল করেন।

বড় গৃহস্তের সন্তান ছিলেন ঢাল্লা মিয়া। রাজনীতি করতে গিয়ে বাবার জমিজমা খুঁইয়েছেন। অনেকটা টানাপোড়নের মধ্য দিয়েই শেষ জীবন পার করেছেন তিনি। দলীয় নীতি আদর্শের প্রতি অনুগত থেকে, দেশ ও দশের জন্য রাজনীতি করেছেন তিনি।

ঢাল্লা মিয়ার উপর হামলার পর, ৭৫ সালের ১৪ আগস্ট গোপালপুর পৌরসভার নির্বাচনের দিন, জাসদ তথা গণবাহিনীর হামলায় দুই পুলিশ সদস্য গুরুত্বর আহত হন। এর মধ্যে কনস্টেবল হাফিজ চিকিৎসারত অবস্থায় তিন মাস পর মারা যান।

ঢাল্লা মিয়াদের এখন আর কেউ স্মরণ করেন না। অনেকেই নাম পর্যন্ত জানেন না। রাজনীতিবিদরা এখন আর কিছু জানতেও চান না। পূর্বসূরিদের নীতি আদর্শ এখন সর্বাংশে জলাঞ্জলিত। অনেকেই বলেন, ঢাল্লা মিয়ার মতো ত্যাগী নেতাকর্মী প্রয়ানের পর, রাজনীতিতে শুধু আদর্শই নয়, অনেক কিছুরই সমাধি ঘটেছে। তাই গণবাহিনীর নামে, যারা এক সময়ে লীগ নেতাকর্মীদের রক্ত গঙ্গা বঁইয়ে দিয়েছেন, সেইসব খুনিদের কেউ কেউ, এখন দস্তকী জোব্বা আলখাল্লা পড়ে, লীগ নেতাদের আশেপাশেই ঘুরে বেড়ান। ক্ষেত্রে বিশেষ তারা মাঁসোহারাও পান । সত্যি কি বিঁচিত্র দেশ সেলুকাস!

(প্রবীণ সাংবাদিক জয়নাল আবেদীন এর ফেসবুক টাইমলাইন থেকে নিয়ে তার অনুমতিক্রমে প্রকাশিত, ঘাটাইলডটকম)/-