‘ছয়শত ৩৮ শব্দে নার্গিসকে লেখা নজরুলের প্রথম ও শেষ চিঠি’

নজরুলের পত্রাবলিতে নার্গিসকে লেখা ছয়শত ৩৮ শব্দের এই চিঠিটি তাঁদের বিয়ের পনেরো বছর পর লেখা হয় ১৯৩৭ সালের ১ জুলাই কলকাতার গ্রামোফোন কোম্পানির মহড়াকক্ষে বসে। চিঠি পাঠ করলে চীরচেনা বিদ্রোহী নজরুলকে যেমন মিলিয়ে নেওয়া যায়, একইসঙ্গে নজরুলের পত্রসাহিত্যের প্রেমিক অবয়বের নন্দনতত্ত্বও চোখে উদ্ভাসিত হয়।

১৩২৮ সনের ৩রা আষাঢ় কবির বিয়ের দিন ধার্য হয়। জানা যায় বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে কাবিনের শর্ত উল্লেখ করার সময় ঝামেলা বাঁধে। আলী আকবর খান শর্ত জুড়ে দিতে চান, নজরুলকে ঘরজামাই থাকতে হবে। বাঁধন হারা নজরুল এই শর্ত প্রত্যাখ্যান করেন। আকদ্‌ হয়ে যাবার পর আনুষ্ঠানিক অন্যান্য কাজে যখন সবাই ব্যস্ত তখন নজরুল অন্তর্দ্বন্দ্বে বিক্ষুব্ধ। অপমানে, লজ্জায় তিনি সেই রাতেই দৌলতপুর থেকে কুমিল্লা চলে আসেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন বিরজা সুন্দরী দেবীর ছেলে বীরেন্দ্রকুমার।

নজরুলের জীবনে নার্গিস পর্ব সেখানেই শেষ।

ভাগ্যিস কবি ঘরজামাই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, তা না হলে বাংলা সাহিত্যের একটি পর্ব নিশ্চিতভাবেই অন্ধকার থাকতো। এতে হয়তো বিত্ত মিলতো কিন্তু চিন্তন মিলতো না। নজরুল আসলে এমনই হয়।

কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনে হঠাৎ করেই এসেছিলেন নার্গিস। কবির সঙ্গে তার বিয়ে নিয়ে যত বিতর্কই থাকুক, কবি যে তার প্রেমে পড়েছিলেন এতে ভুল নেই। তার প্রমাণ এই চিঠি। নার্গিসকে কাজী নজরুল ইসলাম এই চিঠি লিখেছিলেন এবং এটিই ছিল কবির লেখা নার্গিসকে প্রথম ও শেষ চিঠি।

ঘাটাইলডটকমের পাঠকদের জন্য নার্গিসকে লেখা প্রেমিক নজরুলের সেই চিঠিটি হুবুহু তুলে ধরা হল:

১ জুলাই ১৯৩৭

কল্যাণীয়াসু!

তোমার পত্র পেয়েছি সেদিন নববর্ষার নবঘন–সিক্ত প্রভাতে। মেঘ–মেদুর গগনে সেদিন অশান্ত ধারায় বারি ঝরছিল। পনের বছর আগে এমনি এক আষাঢ়ে এমনি বারিধারার প্লাবন নেমেছিল, তা তুমিও হয়তো স্মরণ করতে পারো। আষাঢ়ের নব মেঘপুঞ্জকে আমার নমস্কার।

… যাক, তোমার অনুযোগের অভিযোগের উত্তর দিই।… তোমার ওপর আমি কোনো ‘জিঘাংসা’ পোষণ করি না– এ আমি সকল অন্তর দিয়ে বলছি। আমার অন্তর্যামী জানেন, তোমার জন্য আমার হৃদয়ে কী গভীর ক্ষত, কী অসীম বেদনা! কিন্তু সে বেদনার আগুনে আমিই পুড়েছি–তা দিয়ে তোমায় কোনো দিন দগ্ধ করতে চাইনি।

তুমি এই আগুনের পরশমানিক না দিলে আমি ‘অগ্নিবীণা’ বাজাতে পারতাম না। আমি ধূমকেতুর বিস্ময় নিয়ে উদিত হতে পারতাম না। তোমার যে কল্যাণস্বরূপ আমি আমার কিশোর বয়সে প্রথম দেখেছিলাম, যে রূপকে আমার জীবনের সর্বপ্রথম ভালোবাসার অঞ্জলি দিয়েছিলাম, সে রূপ আজও স্বর্গের পারিজাত– মন্দারের মতো চির অম্লান হয়েই আছে আমার বক্ষে। অন্তরের আগুন বাইরের সে ফুলহারকে স্পর্শ করতে পারেনি।

তুমি ভুলে যেও না, আমি কবি, আমি আঘাত করলেও ফুল দিয়ে আঘাত করি।

…আমার অন্তর্যামী জানেন (তুমি কী জানো বা শুনেছ, জানি না) তোমার বিরুদ্ধে আজ আমার কোনো অনুযোগ নেই, অভিযোগ নেই, দাবিও নেই।

আমি কখনো কোনো ‘দূত’ প্রেরণ করিনি তোমার কাছে। আমাদের মাঝে যে অসীম ব্যবধানের সৃষ্টি হয়েছে, তার ‘সেতু’ কোনো লোক তো নয়ই– স্বয়ং বিধাতাও হতে পারেন কি না সন্দেহ।

… তোমার ওপর আমার কোনো অশ্রদ্ধাও নেই, কোনো অভিযোগও নেই–আবার বলছি।

আমি যদিও গ্রামোফোনের ট্রেডমার্ক ‘কুকুরের’ সেবা করছি, তবুও কোনো কুকুর লেলিয়ে দিই নাই।

…যাক, তুমি রূপবতী, বিত্তশালিনী, গুণবতী, কাজেই তোমার উমেদার অনেক জুটবে– তুমি যদি স্বেচ্ছায় স্বয়ম্বরা হও, আমার তাতে কোনো আপত্তি নেই। আমি কোন অধিকারে তোমার বারণ করব বা আদেশ দিব? নিষ্ঠুর সমস্ত অধিকার থেকে আমায় মুক্তি দিয়েছেন।

তোমার আজিকার রূপ কী, জানি না। আমি জানি তোমার সেই কিশোরী মূর্তিকে, যাকে দেবীমূর্তির মতো আমার হৃদয়বেদিতে অনন্ত প্রেম অনন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলাম। সেদিনের তুমি সে বেদি গ্রহণ করলে না। পাষাণ–দেবীর মতোই তুমি বেছে নিলে বেদনার বেদি–পীট।

…আজকার তুমি আমার কাছে মিথ্যা, ব্যর্থ; তাই তাকে পেতে চাইনে।

দেখা? নাই–ই হলো এ ধূলির ধরায়! প্রেমের ফুল এই ধূলিতলে হয়ে যায় ম্লান, দগ্ধ, হতশ্রী।

তুমি যদি সত্যিই আমায় ভালোবাস, আমাকে চাও, ওখানে থেকেই আমাকে পাবে। লায়লি মজনুকে পায়নি, শিরীন ফরহাদকে পায়নি, তবু তাদের মতো করে কেউ কারো প্রিয়মতকে পায়নি।

আত্মহত্যা মহাপাপ, এ অতি পুরনো কথা হলেও পরম সত্য। আত্মা অবিনশ্বর, আত্মাকে কেউ হত্যা করতে পারে না। প্রেমের সোনার কাঠির স্পর্শ যদি পেয়ে থাকো, তাহলে তোমার মতো ভাগ্যবতী কে আছে? তারই মায়া স্পর্শে তোমার নকল কিছু আলোয় আলোময় হয়ে উঠবে।

দুঃখ নিয়ে একঘর থেকে অন্য ঘরে গেলেই সেই দুঃখের অবসান হয় না। মানুষ ইচ্ছা করলে সাধনা দিয়ে, তপস্যা দিয়ে ভুলকে ফুলরূপে ফুটিয়ে তুলতে পারে।

যদি কোনো ভুল করে থাকো জীবনে, তাহলে এই জীবনেই তার সংশোধন করে যেতে হবে, তবেই পাবে আনন্দ, তবেই হবে সর্বদুঃখের অবসান, নিজেকে উন্নত করতে চেষ্টা করো, স্বয়ং বিধাতা তোমার সহায় হবেন।

আমি সংসার করছি, তবু চলে গেছি এই সংসারের বাধাকে অতিক্রম করে ঊর্ধ্বলোকে– যেখানে গেলে পৃথিবীর সকল অপূর্ণতা সকল অপরাধ ক্ষমাসুন্দর চোখে পরম মনোহর মূর্তিতে দেখা দেয়।

হঠাৎ মনে পড়ে গেল পনের বছর আগেকার কথা। তোমার জ্বর হয়েছিল, বহু সাধনার পর আমার তৃষিত দুটি কর তোমার শুভ্র সুন্দর ললাট স্পর্শ করতে পেরেছিল; তোমার সেই তপ্ত ললাটের স্পর্শ যেন আজও অনুভব করতে পারি। তুমি কি চেয়ে দেখেছিলে? আমার চোখে ছিল জল, হাতে সেবা করবার আকুল স্পৃহা, অন্তরে শ্রীবিধাতার চরণে তোমার আরোগ্য লাভের জন্য করুণ মিনতি।

মনে হয় যেন কালকার কথা। মহাকাল যে স্মৃতি মুছে ফেলতে পারলেন না। কী উদগ্র অতৃপ্তি, কী দুর্দমনীয় প্রেমের জোয়ারই সেদিন এসেছিল, সারা দিন রাত আমার চোখে ঘুম ছিল না।

যাক আজ চলেছি জীবনে অস্তমান দিনের শেষ রশ্মি ধরে ভাটার স্রোতে। তোমার ক্ষমতা নেই সে পথ থেকে ফেরানোর। আর তার চেষ্টা করো না। তোমাকে লেখা এই আমার প্রথম ও শেষ চিঠি হোক, যেখানেই থাকি, বিশ্বাস করো, আমার অক্ষয় আশীর্বাদ কবচ তোমার ঘিরে থাকবে। তুমি সুখী হও, শান্তি পাও এই প্রার্থনা।

আমায় যত মন্দ বলে বিশ্বাস করো আমি তত মন্দ নই–এই আমার শেষ কৈফিয়ৎ।

ইতি

নিত্য শুভার্থী

নজরুল ইসলাম

(অনলাইন ডেস্ক, ঘাটাইলডটকম)/-