মতামত; চিকুনগুনিয়া : দায় কার, দায়িত্ব কার

সারা দেশে, বিশেষ করে ঢাকায় এখন সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম চিকুনগুনিয়া। দিন দিন ঢাকা শহরে এ রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এডিস মশার কামড়ে মানুষ এ জ্বরে বা রোগে আক্রান্ত হয়। আর এ এডিস মশাসহ সব মশা নিধনের দায়িত্ব যেহেতু সিটি করপোরেশনের, তাই ব্যর্থতা বা দায়িত্বে অবহেলার দায় সিটি করপোরেশনের ওপরই বর্তায়। সিটি করপোরেশন নিয়মিত ও সঠিকভাবে মশা নিধন করছে না বলে নগরবাসীর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের বিষয়টি জানা যাচ্ছে টেলিভিশন ও পত্রপত্রিকার মাধ্যমে। এ দিকে ঢাকা উত্তরের মেয়র গণমাধ্যমে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, কোনো মহামারীর জন্য সিটি করপোরেশন দায়ী নয়। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। নগরবাসীকেও সচেতন হতে হবে। আমরা কারো ঘরে গিয়ে মশারি টাঙিয়ে দিতে পারব না। মেয়র মহোদয়ের এ বক্তব্যও উড়িয়ে দেয়া যায় না। তাহলে চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধের দায়িত্ব কার এবং ব্যর্থতার দায় কার?
সিটি করপোরেশন ও সরকারি-বেসরকারি সংস্থা যে সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে তাতে নগরবাসীর কারো বিষয়টি অজানা থাকার কথা নয়। এডিস বা চিকুনগুনিয়ার ভাইরাসবাহিত মশা কোথায় জন্মে, কত দিনের মধ্যে জন্মে এবং প্রতিরোধ বা নিধনের জন্য কী কী ব্যবস্থা নিতে হয়Ñ এর সবই গণমাধ্যমে প্রচার হচ্ছে নিয়মিত। ছাদে, টবে, ডাবের খোসায় বা যেকোনো পাত্রে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে এ মশা বংশ বিস্তার করে। তিন দিনের মধ্যে এই মশা জন্ম নেয় বলে জমে থাকা পানি যেন তিন দিনের বেশি সময় না থাকে সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। কিন্তু যেসব মশা ইতোমধ্যেই রোগ ছড়াচ্ছে সেগুলো তো নিধন করতে হবে। এখানেই দায়টা সিটি করপোরেশনের। জনসচেতনতার পাশাপাশি মশা নিধন কার্যক্রম ব্যাপকহারে চালানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে, সিটি করপোরেশনকে। গণমাধ্যমে অনেকেই অভিযোগ করেছেন, লোক দেখানো স্প্রে করা হচ্ছে, ওষুধের বদলে শুধু পানি স্প্রে করা হচ্ছে, অনেক মহল্লায় স্প্রে করা হচ্ছেই না ইত্যাদি। এসব অভিযোগের সত্যতা খতিয়ে দেখা উচিত। নগরবাসীর জন্য স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। তাই ব্যর্থতার দায় নগরবাসীর ওপর চাপিয়ে দিয়ে সিটি করপোরেশনের দায়মুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই।

ঢাকা সিটির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখনো অনিয়ন্ত্রিত। পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হয়নি এখনো। মহাসড়কের পাশে বর্জ্য নিক্ষেপের মাধ্যমে জনদুর্ভোগ বাড়ছে দিন দিন। জলাবদ্ধতার অভিশাপে নগরবাসী নাকাল হয় পুরো বর্ষা মওসুমেই। পলিথিনের উৎপাদন বন্ধ করতে পারেনি সরকার। কোনো পণ্যের ব্যবহার নিষিদ্ধ বা বন্ধ করতে হলে প্রথমে পণ্যটির উৎপাদন বন্ধ করতে হয়। কিন্তু সরকার পলিথিনের উৎপাদন বন্ধ করতে পারেনি। রাস্তার ধারে কিংবা আবর্জনার স্তূপে ছড়িয়ে থাকা পলিথিনে পানি জমে সেখানেও এডিস মশার বংশ বাড়ছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র গণমাধ্যমে বলেছেন, এক মাসের মধ্যে চিকুনগুনিয়া নিয়ন্ত্রণে আসবে। বৃষ্টির প্রকোপ কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসবে চিকুনগুনিয়া। এ ক্ষেত্রে এক মাস না-ও লাগতে পারে। তার বক্তব্য ফলবলহীন ফাঁকা বুলি। কী করে এই মহামারির প্রকোপ কমিয়ে আনা যায় তার জন্য এক মাস নয়; প্রতিনিয়ত চেষ্টা চালানো উচিত। দায়িত্ব নগরবাসীরও আছে। এ দায়িত্ব ব্যক্তিগত শুধু নয়, এটা সামাজিক দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে পাড়া-মহল্লায় ভলান্টিয়ার সার্ভিস চালু করা যেতে পারে। নারী-পুরুষ, যুবসমাজ, ছাত্রসমাজ মিলে পাড়া-মহল্লায় পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি পালন করা যেতে পারে। যৌথভাবে কাজ করলে সামাজিক দায়িত্বও পালন করা হয়। আর এভাবে ব্যক্তি সচেতনতা সামাজিক সচেতনতায় পরিণত হয়। মানুষ সামাজিকভাবে সচেতন হলে একে অন্যের মঙ্গলের জন্য এগিয়ে আসে এবং সামাজিক দায়িত্ব পালন করে। তাই চিকুনগুনিয়ার বাহক এডিস মশা নিধনে শুধু সিটি করপোরেশন নয়, এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে। এ মহামারী প্রতিরোধের দায়িত্ব সবার।
এডিস মশা শুধু চিকুনগুনিয়ার বাহক নয়, এ মশা ডেঙ্গু জ্বরের ভাইরাসও বহন করে। একসময় ঢাকায় ডেঙ্গুর মহামারী দেখা দিয়েছিল। এখনো সে আশঙ্কা রয়েছে। সুতরাং চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু নামক দু’টি মহামারীকে দমন বা প্রতিরোধ করতে চাইলে অবশ্যই মশা নিধনে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এ মশা দিনের বেলায় কামড়ায়। আর দিনের বেলা তো নগরবাসী মশারির ভেতর বন্দী থাকতে পারবে না। নগরের কর্মব্যস্ত মানুষ জীবিকার তাগিদে ছুটে চলবে সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি। তাই বর্ষা মওসুমের শুরুতেই নিতে হবে বিশেষ ব্যবস্থা।

চিকুনগুনিয়া একটি রোগ। তাই স্বাস্থ্য বিভাগের রয়েছে এ ব্যাপারে বিশেষ দায়িত্ব। প্রতিরোধের পাশাপাশি এ ব্যাপারে চিকিৎসা বা আরোগ্যলাভ পদ্ধতি কী হতে পারে, সে সম্পর্কে প্রচারণা চালাতে পারে স্বাস্থ্য বিভাগ। শুধু গণমাধ্যমের প্রচার যথেষ্ট নয়। স্বাস্থ্যকর্মীদের ঘরে ঘরে যেতে হবে এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে চিকিৎসা বিষয়ে সচেতন করে তুলতে হবে। দ্রুত আরোগ্যের জন্য বিশেষ বিধিবিধান মানার প্রয়োজন হলে সেসব বিধিবিধান সম্পর্কে অবগত করতে হবে। সিটি করপোরেশন ইতোমধ্যে সমাবেশ, শোভাযাত্রার মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়ানোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যেকোনো দুর্যোগে সরকার, বেসরকারি সংস্থা ও জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালালে সে দুর্যোগ বা মহামারী অতি অল্প সময়ের মধ্যেই মোকাবেলা করা সম্ভব। তাই আতঙ্কিত না হয়ে চিকুনগুনিয়া নামের এই রোগের বিরুদ্ধে সবাইকে সচেতনভাবে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সরকার, সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য বিভাগের দায় অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে নগরবাসীরও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সুতরাং কারো ওপর দায় না চাপিয়ে সবাইকেই দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হতে হবে।

(আলী রেজা, সহকারী অধ্যাপক, শহীদ জিয়া মহিলা কলেজ, টাঙ্গাইল)/-

(ঘাটাইল.কম)/-

107total visits,1visits today

Leave a Reply