ঘাটাইলে ৩৭ ইটভাটার নাই অনুমোদন, উজার হচ্ছে বন ও গিলে খাচ্ছে ফসলী জমি

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলায় রয়েছে ৬০টির বেশি ইটভাটা, যার মধ্যে ৩৭টি ভাটার নাই অনুমোদন। এর অধিকাংশ ভাটাই গড়ে উঠেছে তিন ফসলী জমিতে। কৃষি অধিদপ্তরের ছড়পত্রে তিন ফসলী জমি হয়ে হচ্ছে অনাবাদী। আর এজন্য প্রশাসনের উপরের মহলে মোটা অংকের টাকা দিয়ে মালিক পক্ষ হরহামেশাই স্থাপন করে যাচ্ছে নতুন ইটের ভাটা। ফলে ফসলী জমি ও ইট তৈরির কাজে ব্যবহৃত জমির উপরের অংশের মাটি গিলে খাচ্ছে এসব ভাটা।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, ঘাটাইলে আবাদি জমির পরিমাণ ৩০ হাজার ১৫০ হেক্টর। বিভিন্ন স্থানে ইটভাটা স্থাপনে চলে গেছে কমপক্ষে ৪০০ একর আবাদি জমি।

উপজেলা প্রশাসন  সূত্রে জানা যায়, ৬০টি ভাটার মধ্যে ২৩টির অনুমোদন রয়েছে। বাকী ৩৭টি ভাটা ইট পোড়াচ্ছে অনুমোদনহীন এবং অবৈধভাবে। অবৈধ ভাটার কেউ কেউ উচ্চ আদালতে রিট করে বছরের পর বছর ধরে ব্যবসা করে যাচ্ছে। বৈধ ভাটাগুলোর লাইসেন্সও দেওয়া হয়নি ভাটা নিয়ন্ত্রণ আইন মেনে।

প্রশাসনের নাকের ডগায় চলা এমন অনিয়ম পরিনত হয়েছে নিয়মে। নূন্যতম ব্যবস্থা নিতে দেখা যাচ্ছে না বন ও পরিবেশ বা উপজেলা প্রশাসনকে।

উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখা যায়, তিন ফসলী জমি, বনের ভেতর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংলগ্ন এবং আবাসিক এলাকায় গড়ে উঠেছে এসব ভাটা।

ধলাপাড়া ইউনিয়নে বনের ভেতর গড়ে উঠেছে ১০টি, রসুলপুর ইউনিয়নে ১১টি, দেউলাবাড়ী ইউনিয়নে ১০টি, ঘাটাইল সদর ইউনিয়নে দুটি, জামুরিয়া ইউনিয়নে আবাসিক এলাকা, তিন ফসলি জমি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংলগ্ন ১৬টি ভাটা রয়েছে।

এ ছাড়া লোকেরপাড়া, আনেহলা, দিগড়, দেওপাড়া ও দিঘলকান্দি ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে দুই ও তিন ফসলি জমিতে ইটভাটা গড়ে উঠেছে।

অথচ ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ আইনে বলা আছে, বন বিভাগের তিন কিলোমিটার, বসতভিটা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছে, তিন ফসলি জমিতে এবং পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কোনো স্থানে ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না।

ভাটার গ্রাম নামে খ্যাত উপজেলার চানতারা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, এক গ্রামেই গড়ে উঠেছে আটটি ভাটা। এ গ্রামের প্রায় সব আবাদি জমিই চলে গেছে ভাটার পেটে।

অন্যদিকে ভাটায় মাটির যোগান দিতে যা জমি অবশিষ্ট্য ছিল সেগুলো পরিণত হয়েছে ছোট ছোট ডোবা এবং দিঘীতে। ফসলি জমির পাশাপাশি ভাটার কালো ধোঁয়ায় এলাকার পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।

এর বিরূপ প্রভাব পরছে ফসলের উপর। ফসলের সাথে নষ্ট হচ্ছে মৌসুমি ফল। উর্বরতা হারাচ্ছে অবশিষ্ট্য থাকা ভূমি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শাহপুর গ্রামের কৃষক বোরো ধান লাগাচ্ছেন সচল ইটভাটা সংলগ্ন জমিতে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘আগের মত জমিতে ফসল হয় না। ভাটার ধোঁয়ায় ফসলের অনেক ক্ষতি হয়। ভাটায় যেভাবে আবাদি জমির মাটি চলে যাচ্ছে তাতে করে আগামী পাঁচ বছরে আবাদ করার মত কোন জমি থাকবে না। জমির একজন মালিক মাটি বিক্রি করলে সেই জমি থেকে এমনভাবে মাটি কাটা হয় যেন পাশের জমির মালিক বাধ্য হয়ে মাটি বিক্রি করে।’

বেলদহ গ্রামের রানা ব্রিক্স, খিলগাতি গ্রামের এমআরবি ব্রিক্স ও মাকড়াই গ্রামের কেআরবি ব্রিক্স এদের কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই তবুও চলছে কার্যক্রম। বেলদহ গ্রামের রানা ব্রিক্সটি বন্ধের দাবিতে সম্প্রতি এলাকায় মানববন্ধনও করেছে এলাকাবাসী। ইটভাটা তিনটি স্থাপিত হওয়ায় এলাকার কৃষিজমির ক্ষতিসহ পরিবেশের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে হবে বলে জানায় এলাকাবাসী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ভাটার মালিক জানান, টাকা দিলেই ইটভাটা করার জন্য কৃষি অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পাওয়া যায়। জমি তিন ফসলী না অনাবাদী তা জানা বা দেখার প্রয়োজন হয় না।

তিন ফসলি জমিতে ইটভাটার অনুমতি ও জমির উপরিভাগের মাটি ভাটায় চলে যাওয়া প্রসঙ্গে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মতিন বিশ্বাস ঘাটাইলডটকম বলেন, ‘ইটভাটার অনুমোদন দেওয়ার বিষয় কৃষি বিভাগের না। কর্তৃপক্ষের চাহিদা মোতাবেক আমরা শুধু প্রতিবেদন দাখিল করে থাকি। জমির ওপরিভাগের মাটি যে ভাটায় চলে যাচ্ছে, এর ওপর একটি প্রতিবেদন তৈরি করে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট পাঠিয়েছি।’

এ বিষয়ে ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেন ধলা বলেন, ‘অনেকের লাইসেন্স না থাকলেও ইটভাটা বৈধ। কারণ যেহেতু সবাই উচ্চ আদালতের অনুমতি নিয়ে এবং অনুমতি চেয়ে আবেদন করে ভাটা পরিচালনা করছে।’

ঘাটাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দিলরুবা আহমেদ বলেন, অবৈধভাবে স্থাপন করা এবং লাইসেন্সবিহীন ভাটার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও অনুমতি না থাকায় নতুন স্থাপিত দুটি ভাটার কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

(মো.মাসুম মিয়া, ঘাটাইল ডট কম)/-