খালেদার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের গল্প নেই এবং ডা. এনাম

০১

খালেদা জিয়া দুই মাসের জন্য লন্ডন গেছেন। সেখানে তিনি চোখ ও পায়ের চিকিৎসা করাবেন। থাকবেন তার বড় ছেলে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বাসায়। দীর্ঘদিন পরে মা ছেলের মিলন হবে। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর অকাল মৃত্যুতে বেগম জিয়া ঢাকায় এক প্রকার নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করে আসছিলেন।

 

বয়স হয়েছে উনার। এখন উনার নাতি, নাতনীদের সাথে আনন্দের সময় কাটানোর কথা! কিন্তু তার কপালে সেটা নেই! তার নিজের ব্যক্তিগত সুখ দুঃখকে জনগণের সাথে একাকার করে ফেলেছেন। বিনা ভোটের জবরদখলকারী সরকার, তার স্বামীর স্মৃতি বিজড়িত বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে, বেগম জিয়াকে একপ্রকার একাকিত্ব বরণে বাধ্য করেছে। অথচ গণভবনে আত্মীয়স্বজন নিয়ে তিনি কত উল্লাস করেন, কত রোশনাই গণভবনে! আর গুলশানের বেগম জিয়ার বাড়িতে কত শূন্যতা, কত হাহাকার!

 

অল্প বয়সে ছোট ছেলেকে হারিয়েছেন। এটা যে কত বড় শোক! সেটা, যিনি না হারিয়েছেন তার পক্ষে বোঝা কঠিন। অথচ তিনি লন্ডন পাড়ি জমানোর পরদিনই শাসককুল তাকে নিয়ে নানা গুঞ্জন শুরু করেছে। বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রিপরিষদের নিয়মিত বৈঠক শেষে অনির্ধারিত আলোচনার সূত্রপাত করেন একজন মন্ত্রী। এ সময় ওই মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করে খালেদা জিয়ার লন্ডন সফরের বিষয়টি উত্থাপন করেন। এ সময় ওই মন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেন, দেখেন উনি (খালেদা জিয়া) ফিরে আসেন কিনা?

 

এ সময় আলোচনায় অংশ নিয়ে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, উনি (খালেদা জিয়া) মামলার ভয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেন কিনা? যিনি মামলার তারিখ পেছানোর জন্য ১৫০ বার আবেদন করেন তার বেলায় এ প্রশ্ন ওঠাটাই তো স্বাভাবিক যে উনি কি তাহলে মামলার ভয়ে আর দেশে ফিরে আসবেন না। এর পরদিন ওবায়দুল কাদের সচিবালয়ে প্রকাশ্যেই বেগম জিয়া পালিয়ে গেছেন বলে রাজনীতির সকল শিষ্টাচার বর্জিত উক্তিটি করেন।

 

এখানে অনেক কিছু বলা যায়। কারা, কোন নেত্রী কখন কিভাবে পালিয়ে যান, সে তথ্য একটু হাতড়ালেই বেরিয়ে আসবে অনায়াসে। এ প্রসঙ্গে ওয়ান ইলেভেনের একটি ঘটনা স্মরণ করতে চাই। ০৩ সেপ্টেম্বর ২০০৭ ভোর রাতে বেগম জিয়াকে গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করা হলে, ৮টা ২৫ মিনিটে ১২ মিনিটব্যাপী একটি মর্মস্পর্শী বক্তৃতা প্রদান করেন।

 

খালেদা জিয়া বলেন- ‘… আমাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। ইতিপূর্বে আমাকে দেশ থেকে বাইরে পাঠিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। এখন আমাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমি বাইরে চলে গেলে আজ আমাকে এভাবে গ্রেফতার হতে হতো না। আমি বলতে চাই, এই দেশের মাটি ছাড়া আমি এবং আমার পরিবারের কোনো ঠিকানা নেই। এই দেশ আমার ঠিকানা, এই দেশেই আমি মরব।’

 

পাশাপাশি আরো একটি ঘটনার কথা এখানে উল্লেখ করা জরুরী বলে মনে করছি।

জলে, স্থলে অন্তরীক্ষে আপনি নন গ্রাটা! আপনি বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারবেন না! এই আপনি হলেন শেখ হাসিনা! দেশের বাইরে যাবার পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এমনি একটি প্রেস নোট জারি করেছিলো ওয়ান ইলেভেনের সরকার।

বিপরীত দৃশ্য হচ্ছে, এটিএম বারি একদিন এলেন তার সংসদ ভবনের সেই বিশেষ ঘরে! বেগম জিয়া তাকে দেখা মাত্র, চিৎকার দিয়ে, আইজি প্রিজন্স শামসুল হক হায়দারিকে খোঁজেন! হায়দারি বেগম জিয়াকে বোঝান, ‘শেখ হাসিনা অলরেডি দেশ ছেড়ে গেছেন।’ আপনি যদি না যান, তবে অনেক সমস্যা হবে আমার! আমাদের। বেগম জিয়া, মইন ইউ আহমেদকে দুটো গালি দিয়ে বললেন, এই দেশ আমার, আমার স্বামী দেশের স্বাধীনতার ঘোষক আমি পালিয়ে যেতে শিখেনি!

 

এ দেশে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের গল্প আছে বেশ কয়েকটি। এর মধ্যে অন্যতম বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। কিন্তু শেখ হাসিনার আছে দুইটা। একটা একাশিতে ভারত থেকে দেশে ফেরার দিনকে আওয়ামী লীগ স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস হিসেবে পালন করে। আবার ওয়ান ইলেভেনের সময় দেশ ছাড়ার পর ফের যখন ফিরে আসলেন, সেদিনটাকেও আওয়ামী লীগ স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস হিসেবে পালন করে।

 

কিন্তু খালেদা জিয়ার কোন স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের গল্প নেই। কারণ খালেদা জিয়ার পালিয়ে যাবার কোন রেকর্ড নাই।

খালেদা জিয়ার বিদেশ সফর নিয়ে কিছু বলার, কোন ধরনের মন্তব্যের আগে আওয়ামী লীগ নেতাদের এ বিষয়গুলি স্মরণ করা উচিৎ নয় কি?

 

 

০২.
ডা. এনামকে মানুষ প্রথম জানে সাভারে রানা প্লাজা ট্রাজেডির পর। তিনি যে এনাম মেডিকেল কলেজের মালিক সেটাও সেই প্রথম মানুষ জানতে পারে। রানা প্লাজা ধসের পর হতাহত মানুষকে সেবা দিয়ে তিনি প্রথম সবার আলোচনায় আসেন। অবশ্য ধারে কাছে এনাম মেডিকেল কলেজ ছাড়া আর কোন হাসপাতাল না থাকায় অনেকটা বাধ্য হয়েই এই হাসপাতালকে নিতে হয়, আহত অধিকাংশ মানুষের চিকিৎসার দায়িত্ব। ওই রানা প্লাজা ট্রাজেডিই তাকে রাতারাতি নিয়ে আসে পাদপ্রদীপের নীচে।

 

আর ওই ঘটনাই কাল হয়ে দাঁড়ায় স্থানীয় এমপি তৌহিদ মুরাদ জং এর। মুরাদের বিরুদ্ধে রানা প্লাজার মালিক রানাকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার ব্যাপক অভিযোগ উঠলে অভিযোগের দায় নিয়ে তিনি চলে যান আত্মগোপনে। আর তাতেই ভাগ্যের শিকে ছিড়ে ডা. এনামের। সরকার প্রধান খুশী হয়ে তাকে সাভারে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেন। পাঁচ জানুয়ারির ভোটারবিহীন সে নির্বাচনে কোন শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বি না থাকায় এক প্রকার বিনা ভোটে রাতারাতি এমপি বনে যান ডা. এনাম।

 

অরাজনৈতিক ব্যক্তিকে রাতারাতি রাজনীতির মাঠে এনে আইন প্রণেতা বানিয়ে আসলে প্রধানমন্ত্রী প্রমাণ করে দিলেন, তিনি চাইলে আমীরকে ফকির আর ফকিরকে আমীর বানাতে পারেন। সে যাই হোক। সেই ডা. এনাম সম্প্রতি ফের আলোচনায় এসেছেন। তবে এবার তার আলোচনায় আসাটা কোন ভালো কাজের জন্য নয়। একজন ল’মেকার যে কত ভয়াবহ, কত খারাপ মন মানসিকতার হতে পারেন তারই একটি উদাহরণ দিলেন ডা. এনাম।

 

নিজ নির্বাচনী এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্প্রতি মোবাইল ফোনে মানবজমিনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ডা. এনাম বলেন, সাভারে অনেক ক্যাডার আর মাস্তান ছিল। এখন সব পানি হয়ে গেছে। কারও টু শব্দ করার সাহস নেই। ৫ জনকে ক্রসফায়ারে দিয়েছি আরো ১৪ জনের লিস্ট করেছি। সব ঠাণ্ডা। লিস্ট করার পর যে দু’একজন ছিল তারা আমার পা ধরে বলেছে, আমাকে জানে মাইরেন না আমরা ভালো হয়ে যাব। [ডা. এনামুর রহমানের বক্তব্যের রেকর্ড রয়েছে আমাদের (মানবজমিন) কাছে।)এলাকায় চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখানকার ব্যবসায়ীরা ডাকলেও কেউ চাঁদা নিতে আসেন না। কারণ তারা জানে, এমপি জানলে সমস্যা হবে। ঝুট ব্যবসা নিয়ে আগে কতকিছু হতো। এখন এসব নিয়ে টু শব্দও নেই। প্রধানমন্ত্রী এসবের জন্য আমাকে ডেকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

 

গুম, খুন আইনের শাসনের সঙ্কট নিয়ে দেশ বিদেশে সরকার যেখানে প্রশ্নের মুখে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল কদিন পর পর এ ধরনের উদ্বেগের কথা বলে আসছিলো। আর এ মাসের গোড়ার দিকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিলো, বাংলাদেশে শত শত মানুষকে গুম করে রেখেছে আইন শৃঙ্ক্ষলা রক্ষাকারী বাহিনী। আটককৃতদের মধ্যে কয়েকজন বিরোধী নেতাও রয়েছেন।

 

অবিলম্বে এই প্রবণতা বন্ধ করে এসব অভিযোগের তদন্ত করা, নিখোঁজদের পরিবারের কাছে ব্যাখ্যা তুলে ধরা আর এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছিলো সংস্থাটি।

 

যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা- হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ‘বাংলাদেশ : অ্যান্ড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সেস অ্যান্ড সিক্রেট ডিটেনশান’ শিরোনামের এই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, শুধুমাত্র ২০১৬ সালেই ৯০ জনকে গুমের তথ্য রয়েছে তাদের কাছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের কাছে তথ্য রয়েছে যে, এরকম আটক ২১ জনকে পরে হত্যা করা হয়েছে আর নয়জনের কোন তথ্যই আর জানা যায়নি।

 

এছাড়া ২০১৭ সালের প্রথম পাঁচ মাসে এরকম ৪৮ জনের নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্ক্ষলা বাহিনী ২০১৩ সাল থেকে কয়েকশো মানুষকে অবৈধভাবে আটক করে গোপন স্থানে আটকে রেখেছে। নিখোঁজের বিষয়ে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ থাকলেও, বাংলাদেশের সরকার এই বিষয়ে আইনের খুব একটা তোয়াক্কা করছে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করে বলছেন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া পরিচালক ব্রাড অ্যাডামস। যেটা সে সময় ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

 

অথচ ডা. এনামের এই স্বীকারোক্তির পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখে কোন ভাষা ফুটবে কি? আইনের শাসন, মানবাধিকার এ দেশে কোন পর্যায়ে আছে একজন আইন প্রণেতার এ ধরনের স্বীকারোক্তির পর আর কারো কিছু বলার প্রয়োজন আছে কি?

 

 

(মুজতবা খন্দকার : সাংবাদিক, কলামিস্ট/ ২২ জুলাই ২০১৭/ mujtobantv@gmail.com)/-

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।