খাদ্য নিরাপত্তায় কৃষির বহুমুখীকরণ

জমি কমলেও খাদ্যশস্য উৎপাদন বাড়ছে। প্রতিবছর এক শতাংশ হারে ৫০ হাজার হেক্টর আবাদি জমি কমে যাচ্ছে। অপরদিকে জনসংখ্যা প্রতি বছর ১.৫৪% হারে বাড়ছে। ক্রমহ্রাসমান জমি থেকে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণের জন্য দেশে বিদেশি হাইব্রিড বীজ আমদানি করে চাষাবাদ করা হচ্ছে। এ কারণে পরনির্ভরশীলতা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। দেশে গড়ে বছরে ১ লাখ টনের মতো খাদ্যশস্য ঘাটতি থাকে। হাইব্রিড ফসল ছাড়াও নিচের প্রযুক্তি বা পদ্ধতিতে আমাদের খাদ্য ঘাটতি পূরণ সম্ভব।

জাত উদ্ভাবন : ফলন বেশি দেয়, খরাসহিষ্ণু, লবণাক্ততা সহিষ্ণু, বন্যা সহিষ্ণু, স্বল্প জীবনকাল ও পোকা-মাকড় রোগ প্রতিরোধীজাত উদ্ভাবন করা প্রয়োজন। ইতিমধ্যেই কিছু জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে।
আন্তঃফসল চাষাবাদ : একই জমিতে একই সঙ্গে একাধিক ফসল চাষাবাদই হচ্ছে আন্তঃফসল চাষ। যেমন তুলা অথবা আখের সঙ্গে পেঁয়াজ, আদা, রসুন, ডালজাতীয় শস্য, শাক-সবজি, তেলজাতীয় শস্য, গম ইত্যাদি চাষ করা যায়। ধানের জমিতে মাচা করে শাক-সবজি চাষ করা যায়।
মিশ্র ফসল চাষাবাদ : প্রধান ফসলের সঙ্গে যে কোনো একটি শস্য একই জমিতে একই সময়ে উৎপাদন করলে মিশ্র ফসল চাষ হবে। পাটের সঙ্গে ডাঁটা, লালশাক, পুঁইশাক, ডালজাতীয় সবজি চাষ করা যায়। এতে একই জমি থেকে একই সঙ্গে একই খরচে একাধিক ফসল পাওয়া যায়।
রিলে ফসল : কোনো ফসল সংগ্রহ করার সঙ্গে সঙ্গে বিনা চাষে ডাল, শাক, ধনিয়া, ইত্যাদি স্বল্পকালীন সময়ে পরবর্তী ফসল চাষ শুরুর আগে চাষ করা যায়। সাধারণত আমন ধান কাটার পর বিনা চাষে ফসলের বীজ বপন করে রিলে ফসল উৎপাদন করা যায়।
রেটুন ফসল : প্রধান ফসল কাটার পর গাছের গোড়া থেকে কুশি গজায়। এই কুশি থেকে বিনাচাষে ও বিনা খরচে ফসল উৎপাদন করা যায়। আখ, কাঁকরোল, কলা ইত্যাদির মুড়ি ফসল উৎপাদন করা যায়।
ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি : খাদ্যশস্য উৎপাদন বাড়াতে হলে ফসলের নিবিড়তা বাড়াতে হবে। বর্তমানে দেশে ফসলের নিবিড়তা ১৮০%। ২০ বছর আগে ছিল ১৬৬%। ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধির জন্য যে জমিতে বর্তমানে বছরে একটি ফসল হয় সে জমিতে দু’টি ফসল, যে জমিতে দু’টি সে জমিতে তিনটি এবং যে জমিতে তিনটি ফসল চাষ হয় এমন জমিতে চারটি ফসল উৎপাদন করতে হবে। এ জন্য স্বল্পজীবনকালের ফসলের জাত উদ্ভাবন করা প্রয়োজন। এ ছাড়াও সেচের আওতার জমি বাড়ানো, শস্য বিন্যাস ও শস্য পর্যায় অবলম্বন করা ও জমির উলম্ব ব্যবহার করা।
পতিত জমিতে চাষ : দেশে বর্তমানে ৭.৩ লাখ হেক্টর পতিত জমি রয়েছে। এর মধ্যে চাষযোগ্য পতিত জমি আছে ৩.২৩ লাখ হেক্টর। এসব পতিত জমিতে চাষাবাদের ব্যবস্থা করতে হবে। এসব ব্যক্তি মালিকানা পতিত জমিতে মালিক চাষাবাদ করতে পারে।
বাড়ির আঙিনায় চাষাবাদ : বসতবাড়ির আশপাশে অনেক জায়গা পতিত থাকে। এসব জায়গায় শাক-সবজি, ভেষজ, ফুল ও ফল আবাদ করা যায়। এতে বাড়ির মালিক ও দেশ লাভবান হবে। দেশে বর্তমানে ১ কোটি ৭৮ লাখ ২৮ হাজার কৃষি পরিবার রয়েছে। বসতভিটা আছে ১ কোটি ১৮ লাখ। এসব বসতভিটার প্রতি ইঞ্চি জায়গায় চাষ করা সম্ভব।
পাহাড়ি এলাকায় চাষাবাদ : দেশের প্রায় ১৫ শতাংশ এলাকায় পাহাড় রয়েছে। অল্প জায়গায় জুম চাষ ও মশলা চাষ ছাড়া বাকি জমি অনাবাদি থাকে।
এখানে সল্ট পদ্ধতিতে ফসল চাষাবাদ করা যায়। এ পদ্ধতিতে বনজ, ফলদ ও রাবার বৃক্ষের পাশাপাশি শাক-সবজি চাষ, মাছ চাষ, পশুপালন করা সম্ভব।
লবণাক্ত এলাকায় চাষাবাদ : দেশের মোট আবাদি জমির ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ জমি লবণাক্ত। এসব জমিতে সাধারণত ফসল ভালো হয় না। তবে কিছু লবণাক্ততা সহ্য ক্ষমতাসম্পন্ন বিভিন্ন ফসলের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। আরো কিছু জাত উদ্ভাবন করতে হবে। এ ছাড়াও লবণাক্ততা হ্রাসের পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হবে।
চর এলাকায় চাষ : বাংলাদেশের নদীর পাড়ের এলাকায় শুধু বালুচর। এসব চরে ফসল বিন্যাস করে বালি মাটির উপযোগী ফসল যেমন, তরমুজ, বাদাম, আখ, সরিষা, ভুট্টা ইত্যাদি ফসল চাষাবাদ করতে হবে।
কৃষি বনায়ন : ফসলের জমিতে, বসতবাড়ির আশপাশে, পুকুরের পাড়ে, নদী-নালা, খাল-বিলের পাড়ে মাছ, পশুপাখি ও ফসলের সঙ্গে বৃক্ষ চাষাবাদ করা যায়।
উফশীজাতের চাষ : উচ্চ ফলনশীল জাতের ফসল চাষাবাদ করলে খাদ্যশস্য উৎপাদন বাড়বে। দেশে ৫৬টি জাতের ধানসহ সব ফসলের উফশীজাত উদ্ভাবন করা হয়েছে।
শস্য বহুমুখীকরণ : দেশে ধান ছাড়া প্রায় দু’শতাধিক ফসল চাষাবাদের সুযোগ আছে। সব ধরনের ফসল চাষাবাদ করা উচিত। কারণ এতে ভাতের ওপর চাপ কম পড়বে। পুষ্টির চাহিদা পূরণ হবে। মাটির উর্বরতা বাড়বে। খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়বে।
জৈব প্রযুক্তি প্রয়োগ : আন্তর্জাতিক জৈব প্রযুক্তি সম্মেলনে কৃষি বিজ্ঞানীরা বলেছেন, শুধু জৈব প্রযুক্তি দিয়ে অতিরিক্ত ৩ কোটি মেট্রিক টন খাদ্য উৎপাদন সম্ভব। জৈব প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুত এবং প্রচুর চারা উৎপাদন করা যায়। এ ছাড়াও নতুন জাত উদ্ভাবন করে ফলন বৃদ্ধি করা সম্ভব।

 

(ঘাটাইল.কম)/-

100total visits,2visits today