কর্মজীবীদের ঢাকার বাইরে স্থানান্তর করা না গেলে কি যানজট নিরসন সম্ভব?

ঢাকার যানজট এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সবাই বলাবলি করেন এই শহর বসবাসের অযোগ্য হয়ে গেছে। শুনলে প্রথমত আমার দুঃখ হয়, দ্বিতীয়ত পুরোপুরি একমত হতে পারি না। আমরা কতোগুলো ফ্লাইওভার বানালাম, মেট্রোরেল বানাচ্ছি, কিন্তু যানজট যাবে না। আমার বিবেচনায় রেল লাইনের ওভারপাস যেগুলো, সেগুলো ছাড়া বাকীগুলো এবং মেট্রোরেল প্রজেক্ট – সবই অর্থের অপচয়। লুট বলতে চাই, কিন্তু সাহস হয় না। এখন আমরা সাবওয়ে বানাবো; ভালকথা, কিন্তু আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, প্রস্তাবিত যে রুট, এতে যানজট দূর হবে না।

বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার যানজটে শহরটির বাসিন্দাদের দৈনিক ৩ দশমিক ২ মিলিয়ন অর্থাৎ ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। বিগত ১০ বছরে যান-চলাচলের গড় গতি ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার থেকে কমে ৭ কিলোমিটারে পর্যন্ত নেমে এসেছে, যেখানে পায়ে হেঁটে চলার গড় গতি হচ্ছে ৫ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা। ১৯৮০ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিলো ৩ মিলিয়ন বা ৩০ লাখ; বর্তমানে সে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ মিলিয়ন বা ১ কোটি ৮০ লাখে। এর মধ্যে সাড়ে তিন মিলিয়ন লোক বস্তিতে বসবাস করে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সালে ঢাকায় বসতি দাঁড়াবে ২৫ মিলিয়ন।

মাস ট্রান্সপোর্ট এর প্রথম যে এডভানটেজ, শহর থেকে লোকজনকে শহরতলীতে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়া, সেটা এই প্রস্তাবিত রুটের কারণে সম্ভব হচ্ছে না, যানজট থাকবেই। খেয়াল করে দেখুন, এয়ারপোর্ট থেকে কমলাপুর, এটা কিছু হলো? রুট হওয়ার কথা ত্রিশাল থেকে মাওয়া ঘাট, আরিচা থেকে দাউদকান্দি এবং ঢাকার ভিতরে সার্কুলার। প্রস্তাবিত সেকেন্ড রুট হবে নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল! না, এটা ভৈরব পর্যন্ত না গেলে কেমন হয়! বাংলাদেশ এখনও যথেষ্ট অনুন্নত অবস্থায় আছে, একেবারে ঢাকার ভিতরে ছাড়া, বাহিরে পুরোটাই মাটির উপরে ট্র্যাক বসাতে অসুবিধা হবে না।

মাস র‍্যাপিড ট্র্যান্সপোর্ট এর উদ্দেশ্যই হলো, ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ শহরে কাজ করতে আসবে, কাজ শেষে চলে যাবে; রাজধানী মূলত কাজের জায়গা হিসেবে থাকবে। ওয়ার্কিং ক্লাসের লোকজন এখন আট-দশ-পনের-বিশ হাজার টাকা ভাড়ায় রাজধানীতে গাদাগাদি করে অস্বাস্থকরভাবে শেয়ারে থাকেন, তারা তখন কম ভাড়ায় ঢাকার বাইরে এরচেয়ে ভালভাবে থাকতে পারবেন। এতে শহরে গাদাগাদি কমবে, বাজার ও দোকানের প্রয়োজনে স্থিতিস্থাপকতা আসবে।

কর্মজীবী মানুষেরা ঢাকার আশেপাশে সরে গেলে, বাজার-দোকান-স্কুল-ক্লিনিক-বিভিন্ন সার্ভিস সেন্টার এসব ওদিকে বিকশিত হবে। অর্থনৈতিক কার্যকলাপের একটি যৌক্তিক বিন্যাস ও বিস্তার ঘটবে।

রাজধানীর সাথে যোগাযোগের সব মহাসড়ক চারলেন করে ফেললেও, এইসব উপকার ধরা দিবে না। ট্রেন সময়মতো একসাথে অনেক মানুষ আনা-নেয়া করতে পারে। নির্ভরতার ক্ষেত্রে “নির্ধারিত সময়ে”, এই বিষয়টির প্রভাব অনেক। ট্রেনে চড়ে মতিঝিলে অফিস করতে আসার জন্য কারো হয়তো একঘন্টা, কারো সোয়া ঘন্টা হিসেব করে বের হলেই চলবে, কিন্তু সড়কপথে সময়ের কোনো নির্ভরযোগ্য অনুমান করা যায় না।

ঢাকার সাথে চার লেন মহাসড়ক দ্বারা সংযুক্ত থাকা সত্বেও ত্রিশাল থেকে বা দাউদকান্দি থেকে ঢাকা আসতে একেকদিন একেক সময় লাগে, কিন্তু ট্রেনে প্রতিদিনই একই সময় লাগবে। এবং, ট্রেন সাশ্রয়ী। কর্মজীবিরা কর্মস্থলে আসা যাওয়ার জন্যে এই সেবা নেয়ার কথা বিবেচনা করতে পারবেন।

কাজেই, মুড়ির টিনের মতো ঢাকার মানুষকে ঢাকার ভিতরেই ঝাঁকিয়ে লাভ নেই। ঢাকার অস্থায়ী মানুষকে আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ার আয়োজন করা প্রয়োজন। নিশ্চিত টাইমটেবলের-দ্রুতগতির-সাশ্রয়ী যোগাযোগ ব্যাবস্থাই পারে পুরো অবস্থাটির সুন্দর, স্বাস্থকর, অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক সমাধান এনে দিতে।

আমরা এমন হীরক রাজ্যের অধিবাসী যে, প্রজেক্ট ফাইনান্সিং নিয়ে কোনো টেনশন নেই; যতো প্রজেক্ট, ততো কন্ট্রাক্ট, ততো ফায়দা হি ফায়েদা। ঋণ কত হারে নেয়া হলো, আগামী প্রজন্ম কীভাবে তা শোধ করবে, এই নিয়ে কোনো মাথা ব্যাথা নেই।

আরেকটু খোলাসা করে বলার ঝুঁকি নিতে চাই না, ইদানীং সাহস কমে গেছে; কিন্তু এটুকু আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই যে, আমি ঢাকার সার্কুলার সাবওয়ে ও ত্রিশাল থেকে মাওয়া, আরিচা থেকে দাউদকান্দি কম্যুটার ট্রেন বিওও (BOO – Build Own Operate) চুক্তিতে জাপানিদেরকে দিতে দেখলে খুশি হতাম।

ওরা ওদের টাকায় বানাক, নেগোসিয়েশনে দশ-পনের-বিশ-তিরিশ বা যে কয় বছরে ধার্য করা যায়, ততো বছর ওরা পরিচালনা করে ওদের পুঁজি তুলে নিয়ে যাক। ঋণের টাকায় আমরা প্রজেক্ট করার চেয়ে ওদের বিনিয়োগ হিসেবে ওরা এটা করুক; না হয় দুই-পাঁচ বছর বেশী সময় পরিচালনার লাভ নিয়ে যাক। এই কয় বছর সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হবে, কিন্তু এই প্রজেক্টের কারণে অন্যান্য ফ্যাসিলিটেশনের ফলে অর্থনীতি মোট বিচারে লাভবান হবে।

ওরা যতোদিন মালিকানায় থাকবে, ততোদিন সার্ভিসের মান নিয়ে নিশ্চিত থাকা যাবে। প্রজেক্ট কস্টিংয়েও বিশ্বের সর্বোচ্চ মূল্য দিয়ে বিশ্বের নিকৃষ্টতম পণ্য ও সেবা কেনার ঝুঁকি থাকছে না।

দেশে জাপানি ব্যবস্থাপনায় জাপানি সেবার একটি নমুনা থাকলে, সেটা অন্যান্য সেবার মানের প্রশ্নে সেসবের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের উপর চাপ তৈরী করবে। এবং, জাপানিদেরকে এরকম একটি মেগা প্রজেক্ট করতে দিলে, আরো অনেক সরকারি বেসরকারি জাপানি পুঁজি এর পিছনে পিছনে আসবে।

প্রকৃতপক্ষে, আমাদের যেমন অর্থায়ন ভীষন প্রয়োজন, ওদের তেমনি বিনিয়োগের ক্ষেত্র মরিয়াভাবে প্রয়োজন। কিন্তু, ওদের কর্পোরেটগুলো এমনকি দেশের বাইরেও ঘুষ দেয়ার ব্যাপারে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। কাফকোতে অনিয়ম করে মারুবেনী নিজ দেশে অনেক ঝামেলায় পড়েছিল। বিস্তারিত জানি না, তবে, এটুকু মনে আছে, সংসদীয় কমিটিতেও ডাক পড়েছিল, না জানি কী হয় ভাব তৈরী হয়েছিল। কাজেই, জাপানি অর্থ এখানে আনতে চাইলে, কত্তাবাবুদেরকে গু খাওয়ার ব্যাপারে সংযম দেখাতে হবে।

আসলে, সমস্যা সমাধানের সামর্থ্য (আয়োজন) আছে কি না, সেটা বড় কথা নয়, সদিচ্ছা আছে কি না, সেটা মূল কথা।

(মুনতাক্বীম চৌধুরী, লেখক, কলামিস্ট/ ঘাটাইল ডট কম)/-