ইউএনও গ্রেপ্তারের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর নিন্দা

ঘাটাইল.কম সংবাদ: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি বিকৃতর অভিযোগে বরগুনার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) গ্রেফতারের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুবই বিস্মিত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার পত্র-পত্রিকায় এই খবর দেখে প্রধানমন্ত্রীর দফতরের কর্মকর্তারাও বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান। ঘটনার পরপরই তারা বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনেন।

এই প্রতিযোগিতার প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী দুটি ছবির জন্য তাদেরকে পুরস্কৃত করা হয়। আর ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদযাপনে উপজেলা প্রশাসনের আমন্ত্রণপত্রে ছবি দুটি ব্যবহার করা হয়। প্রথম স্থান পাওয়া জ্যোতি মণ্ডলের ছবিটি আমন্ত্রণপত্রের কভারে ব্যবহার করা হয় এবং অদ্রিজা করের দ্বিতীয় ছবিটি আমন্ত্রণপত্রের পেছনের পাতায়।

ওই ছবি আঁকার জন্য দুই শিশুর হাতে পুরস্কার তুলে দিয়েছিলেন উপজেলা চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম মোর্তজা খান স্বয়ং। অথচ এর একটি ব্যবহারের জন্যই বরিশাল আওয়ামী লীগেরই ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সৈয়দ ওবায়েদ উল্লাহ সাজু ইউএনও গাজী তারিক সালমানের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃতের অভিযোগে মামলা করেন।

এই মামলায় বুধবার বরিশালের একটি আদালতে হাজির হলে ইউএনওকে প্রথমে জেল হাজতে পাঠান বিচারক। পরে আদালতে ছবি উপস্থাপনের পর তাকে জামিন দেয়া হয়। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে তিনি ০২ ঘণ্টার মতো জেল হাজতে ছিলেন।

বিবিসিবাংলাকে এক সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও প্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম জানিয়েছেন, ‘আমরা সবাই, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আজ যতো কর্মকর্তা ছিলেন, এটি দেখে আমরা সকলেই বিস্মিত হয়েছি। যে ব্যক্তি এই মামলা করেছেন, আমরা মনে করি তিনি অত্যন্ত ঘৃণিত কাজ করেছেন।’

এইচ টি ইমাম প্রধানমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে বলেন, ছবিটি দেখে তিনি বিস্মিত হলেন। প্রধানমন্ত্রী বললেন, ক্লাশ ফাইভের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে প্রতিযোগিতার আয়োজন করে এই অফিসার সুন্দর একটি কাজ করেছেন। এবং সেখানে যে ছবিটি আঁকা হয়েছে, সেটি আমার সামনেই আছে, আপনারা দেখতে পারেন। এবং এই ছবিটিতে বিকৃত করার মতো কিছু করা হয়নি। এটি রীতিমত পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। এই অফিসারটি রীতিমত পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। আর সেখানে উল্টো আমরা তার সঙ্গে এই করেছি, এই বলে প্রধানমন্ত্রী তিরস্কার করলেন। বললেন, এটি রীতিমতো নিন্দনীয়।

প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারীকে কিভাবে গ্রেফতার করা হলো কোনো রকম অনুমোদন ছাড়া? এ প্রশ্নের উত্তরে এইচ টি ইমাম বলেন, এটি করা যায় না। কারণ ইউএনও হচ্ছেন উপজেলা পর্যায়ে সরকারের সবচেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তাকে কোন শাস্তি দিতে হলে বা তার বিরুদ্ধে কোন মামলা বা কোন রকম কিছু করতে হলে সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন।

এইচ টি ইমাম এই ঘটনার জন্য বরিশালের ডিসি, এসপিকে দায়ী করেন। বলেন, ‘পুলিশ যে ব্যবহার করেছে এই ছেলেটির (ইউএনও) সঙ্গে, যেভাবে তাকে নিয়ে গেছে, এ নিয়ে আমি ওখানকার ডেপুটি কমিশনার, পুলিশ সুপার, এদের প্রত্যেককে আমি দায়ী করবো। এদের বিরুদ্ধেও আমাদের বোধহয় ব্যবস্থা নিতে হবে।’

কিভাবে পুলিশ এরকম একটি মামলা নিল আর জেলা জজই কিভাবে এই মামলা গ্রহণ করলেন, সেটা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।

এইচ টি ইমাম বলেন, এই ঘটনায় মাঠ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে তিনিও তাদের সঙ্গে একমত। বলেন, ‘আমাদের অফিসারটিকে যেন হেনস্থা করার জন্য পুলিশ যেভাবে গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছে, এই পুরো ঘটনায় যেরকম তীব্র ক্ষোভ ফেটে উঠেছে, আমি তার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত।’

এইচ টি ইমাম বলেন, ঘটনাটি শোনার পরপরই প্রধানমন্ত্রী জানতে চেয়েছিলেন, যে ব্যক্তি এই মামলা করেছে, সে কে?

মামলা দায়েরকারী ব্যক্তি সম্পর্কে সঙ্গে সঙ্গে তারা খোঁজ খবর নেন, একথা জানিয়ে এইচ টি ইমাম বলেন, এই লোক ০৫ বছর আগেও আওয়ামী লীগে ছিল না। দলের ভেতরে ঢুকে পড়া এই ‘অতি উৎসাহীরাই’ এই কাণ্ড ঘটিয়েছে, এই চাটুকাররাই আমাদের ক্ষতি করছে’।

এইচ টি ইমাম বলেন, এই ঘটনার পেছনে তিনটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, এই অফিসারের বিরুদ্ধে হয়তো তাদের কোন ক্ষোভ ছিল। তাকে অপমানিত করা ছিল তাদের লক্ষ্য। দ্বিতীয়ত বিভিন্ন সার্ভিসের মধ্যে একটি অসন্তোষ সৃষ্টি করা। আর তৃতীয়ত, সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করা।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বিবিসিকে একটি বিবৃতিতে জানান, ‘একটি শিশু তার কল্পনা শক্তি দিয়ে অনেক কিছু করতে পারে বা ভুল করতে পারে। কিন্তু একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা শিশুর আবেগকে কাজে লাগিয়ে ভুল করতে পারেন না।’

ইউএনও গাজী তারিক সালমান বলেন, ‘প্রথম পাতায় অনেক লেখা থাকায় সেখানে বঙ্গবন্ধুর ছবি দেয়া হলে ভালো লাগত না, তাই ব্যাক কভার জুড়েই জাতির জনকের ছবিটি ছাপানো হয় সিদ্ধান্ত মোতাবেক। আমন্ত্রণপত্রের কার্ডটিতে যে ছবি দুটো ছাপানো হয়েছে দুটো ছবিই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সাথে সম্পৃক্ত। এছাড়া এ আঁকা ছবিটি ছাপানোর অন্য আরো একটি কারণ ছিল, সেটা হল শিশুদের উৎসাহ দেয়া।’

ইউএনও বলেন, আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা থাকাকালে ওই এলাকায় তিনি ভ্রাম্যমাণ আদালতের বেশ কিছু অভিযান চালিয়েছেন। এতে উপজেলার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অনেকে সাজা পেয়েছে। এছাড়া টিআর (টেস্ট রিলিফ), কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য) প্রকল্পের কাজ কঠোরভাবে তদারকি করায় আমাকে কয়েকজন জনপ্রতিনিধির রোষাণলে পড়তে হয়। তারা আমার কোন দুর্নীতি খুঁজে না পাওয়ায় শিশুদের চিত্রাংকন প্রতিযোগিতায় পুরস্কৃত ছবি নিয়ে আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করেছে।

ইউএনও বলেন, ‘কিছু মস্তিষ্ক বিকৃত লোক আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে যে, আমি কার্ডটিতে বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃত করে ছাপিয়েছে। এ ঘটনায় আমার বিরুদ্ধে মামলাও করা হয়। কিন্তু আসলে জাতির জনকের এ ছবি কোথা থেকে বিকৃত হয়েছে তা অদ্যাবধি খুঁজে পাইনি। সুস্থ মস্তিষ্কের কোন লোকই এ কার্ডটিতে বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃত হওয়ার বিষয়টি খুঁজে পাবে না। আসলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা আমার উপর আগের থেকেই ক্ষিপ্ত ছিল। আমার ক্ষতি করার কোন সুযোগ না পাওয়ায় এ ধরনের ভোগান্তির মধ্যে আমাকে ফেলা হয়েছে।’

এসব জনপ্রতিনিধি কারা-এমন প্রশ্ন করা হলে কারও পরিচয় প্রকাশ করতে অনীহা জানিয়ে তারিক সালমান বলেন, ‘আপনারা জানেন এ কাজটা কে করিয়েছে, তাই নতুন করে আমি কিছু বলতে চাই না।’

ইউএনও বলেন, আমার বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার পর প্রথমে বরিশাল আদালতের কোন আইনজীবীই আমার পক্ষে মামলা লড়তে সায় দিচ্ছিল না। এক আইনজীবীর কাছে গেলেও তিনি মামলা লড়তে একজন নেতার সুপারিশ নিয়ে আসার কথা বলেন, যা আসলে সম্ভব ছিল না। পরে আমার পক্ষে আইনজীবী মোখলেছুর রহমান মামলা লড়তে রাজি হন।’

১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর সেই ছবি আঁকায় অদ্রিজা করের হাতে পুরস্কার তুলে দেয়া উপজেলা চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম মোর্তজা খানকে ‘এই ছবি মামলা হওয়ার মত কি না’- জানতে চাইলে তিনি প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান। বলেন, ‘আপনারাই এগুলো বোঝেন, আমি কিছু বলতে চাই না। এখন একটা মিটিংয়ে আছি, পরে কথা বলব।’

তবে মামলার বাদী সৈয়দ ওবায়েদ উল্লাহ সাজু এখনও তার আনা অভিযোগের পক্ষে অটল। তিনি বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসনের ওই কার্ডটিতে বঙ্গবন্ধুর যে ছবি ছাপানো হয়েছে, সেটা বিকৃত করে ছাপানো হয়েছে। জাতির জনকের ছবিতে তার মুখের উপর একটি তিল বসানো হয়েছে এবং চুলগুলো এলোমেলো করে রাখা হয়েছে। এ কারণে আদালতে মামলাটি দায়ের করা হয়।’ বঙ্গবন্ধুর ছবিটি আমন্ত্রণপত্রের পেছনের পাতায় ছাপানোও জাতির জনকের প্রতি অবমাননার শামিল বলে মনে করেন তিনি।

ঘাটাইল.কম/২০জুলাই/

88total visits,1visits today

Leave a Reply