আজ শিশু দিবস; কেমন আছে আমাদের শিশুরা?

বাংলাদেশে আজ ১৭ মার্চ শিশু দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। এটি শিশুদের নিয়ে উদযাপিত একটি দিবস। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময় পালিত হয়ে থাকে দিবসটি। শিশু দিবসটি প্রথমবার তুরস্কে পালিত হয়েছিল সাল ১৯২০ সালের ২৩ এপ্রিল। বিশ্ব শিশু দিবস ২০ নভেম্বর-এ উদযাপন করা হয়, এবং আন্তর্জাতিক শিশু দিবস জুন ১ তারিখে উদযাপন করা হয়। তবে বিভিন্ন দেশে নিজস্ব নির্দিষ্ট দিন আছে শিশু দিবসটিকে উদযাপন করার। বাংলাদেশে ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিনটিকে শিশু দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

শিশুদের জন্য কতটুকু ভাবছে আর করছে রাষ্ট্র? আড়াল বা ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে না তো কিছু? পত্রিকায় প্রকাশিত এক সমিক্ষায় দেখা গেছে, গত ২০১২-১৬ সালের পাঁচ বছরে নির্যাতনের শিকার ১৩ হাজার ১২ শিশু এবং হত্যার শিকার ১ হাজার ৫২৬ শিশু। একই সময়ে আত্মহত্যা করেছে ৭২৭ এবং ধর্ষণের শিকার ১ হাজার ৪৭৫ শিশু। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম ১৪টি জাতীয় দৈনিক থেকে প্রকাশিত ঘটনার সমন্বয়ে এই পরিসংখ্যান তৈরি করেছে। (ইত্তেফাক, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭)

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু হত্যার কারণগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাবা-মা বা পরিবারের সদস্যদের সাথে বিরোধ এবং শত্রুতার বলি হচ্ছে নিরীহ শিশুরা। এ ছাড়াও দরিদ্র শ্রমজীবী শিশুদের তুচ্ছ কারণে বা চুরির অপবাদ দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলার মতো ঘটনা অব্যাহতভাবে ঘটছে। আর বড়দের কু-প্রবৃত্তির শিকার হচ্ছে শিশুরা। ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনসহ গৃহকর্মী শিশুরা সহজে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তবে এসব ঘটনায় সচেতনতার অভাব। ৯০ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্ন না হওয়া; অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া এবং রায় দ্রুতগতিতে কার্যকর না হওয়াকে দায়ী করেন তারা।

এদিকে শিশুরা কি শুধু বই-খাতার ভারী ব্যাগ টেনে নিয়ে স্কুলে যাবে আর কোচিং সেন্টারের তৈরি করে দেয়া প্রশ্নপত্রের উত্তর অবিরাম মুখস্থ করে পরীক্ষায় ’গোল্ডেন এ প্লাস’ নেয়ার আকাঙ্খায় দৌড়াদৗড়ি করবে?

পুকুরে-নদীতে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতার কাটা, মাছ ধরা তারপর চোখ লাল রঙা করে শিশুদের সেই পাখির কিচিরমিচির শব্দের মতো কথা বলতে বলতে বাড়ি ফেরা, অবিরাম বৃষ্টি ঝরা দিনে পুকুরে নদীতে ঝাঁপ দেয়ার যে আনন্দ তা কি এখনকার শিশুরা উপভোগ করবে না?

কানামাছি, ইচিং বিচিং, ডাংগুলি, লাটিম, রুমাল চুরি, ঘুড়ি উড়ানো, এক্কা দোক্কা, বুড়িছুট, হা-ডু-ডু, দড়িলাফ, ফুলটোক্কা, ষোলোগুটি, মার্বেল খেলা, দাঁড়িয়াবাঁধা, সাতচাড়া আরো কতো খেলা যে রয়েছে, সে সব খেলবে না এখনকার শিশুরা?

শিশুরা কীভাবে বড় হয়ে উঠবে, তাদের জীবনের রঙ কেমন হবে, তার কতটুকু রাষ্ট্র ভাবছে?

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জীবনের রঙ কি পাণ্ডুবর্ণেরই থেকে যাবে?

অন্যান্য আরো কমবেশি পঁয়তাল্লিশ জাতিগোষ্ঠীর উপেক্ষিত শিশুদের হতশ্রী জীবনমানের দৃশ্যমান অগ্রগতি আদৌ হবে তো?

যৌনপল্লীর শিশুরা কেমন আছে?

’হরিজন’ ’দলিত’ পর্যায়ের শিশুরা সারা বাংলাদেশের স্কুলগুলোতে মূলধারার শিশুদের সাখে একই বেঞ্চে বসতে পারে কি? এরা সেলুনে চুল কাটাতে গিয়ে হয়রানির শিকার হয় কিনা, সকল রেস্তোরাঁতে নির্বিঘ্নে প্রবেশের অধিকার পাচ্ছে কিনা এই শিশুরা, রাষ্ট্র সেই সুযোগ নিশ্চিত করবে কবে?

কোনো কোনো অঞ্চলের উচ্চ বর্ণের হিন্দু, মুসলিম সমাজপতি এক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ালে তার প্রতিকার সমাজ এবং রাষ্ট্র কবে এবং কখন করবে?

ক’জন শিক্ষক প্রশ্ন করা পছন্দ করেন?

আমাদের শিক্ষা কি অংশগ্রহণমূলক হতে পেরেছে?

শিক্ষকরা কি ছাত্রছাত্রীদের চিন্তার জগতে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠা এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর কোনো পদক্ষেপ নিয়েছেন কখনো?

ক’জন শিক্ষক স্বীকার করবেন, তাঁদের ছাত্রছাত্রীদের খবরের কাগজ কীভাবে পড়তে হয় তা শৈশব অথবা কিশোর বেলায় শিখিয়েছেন? ক’জন অভিভাবক তাঁদের ছেলেমেয়েকে সংবাদপত্রের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন?

আমরা কল্পনাশক্তি অর্জন করবো কোথা থেকে?

আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার কি অবস্থা?

প্রাথমিক পর্যায়ে আমরা শিশুদের জন্য কেমন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গড়ে দিতে সক্ষম হচ্ছি?

শিশু শ্রম বন্ধ হবে কবে?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিশু দিবসের এক বানীতে বলেন, শিশুদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ছিল অপরিসীম মমতা। তিনি শিশুদের কল্যাণে রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে বিশেষ বিধান সংবিধানে যুক্ত করেছিলেন। ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে শিশু আইন প্রণয়ন এবং প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করেন। বর্তমান সরকার শিশুদের কল্যাণে বিভিন্নমুখী উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে। শিশু অধিকার সংরক্ষণ ও তাদের নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে জাতীয় পর্যায়ে ‘বিশ্ব শিশু দিবস’ এবং ‘শিশু অধিকার সপ্তাহ’ পালন করা হচ্ছে। জাতীয় শিশু নীতি-২০১১, শিশু আইন-২০১৩, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৭ প্রণয়ন করা হয়েছে। জাতীয় শিশু দিবস, বাল্যবিবাহ নিরোধ দিবস পালন, পথশিশুদের পুনর্বাসন এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের নিয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।

আমরা চাই, আমাদের শিশুরা নির্বিঘ্নে বেঁড়ে উঠুক। দেশের ধনী-গড়িব সকল শিশুরা যেন লেখাপড়ার সমান সুযোগ পায়, রাষ্ট্র সেই ব্যবস্থাটা মনেপ্রাণে করুক। প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের দেশে যথেষ্ট পরিমাণের আশা জাগানিয়া হলেও, প্রাথমিক বা মাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়া শিশুদের সংখ্যা রীতিমতো ভয়াবহ। প্রাথমিক সমাপনীর পর থেকে জেএসসিতে আসা পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়েছে।এর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে- ১. সামাজিক অস্থিরতা। ২. অর্থনৈতিক ভারসাম্যের অভাব। ৩. প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরের কারিকুলামের সমন্বয়হীনতা। ৪. বাল্যবিবাহ। ৫. ছেলেদের কাজে যোগদান। ৬. দুর্গম এলাকায় শিক্ষার সুযোগের অভাব। আমরা চাই, আমাদের রাষ্ট্র ও সরকার এসব প্রতিবন্ধকতা দূরীভূত করে এমন এক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলুক যেখানে আমরা আমাদের শিশুদের দেখাতে পারি একটি নিরাপদ সুন্দর অপার সম্ভাবনার সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

(নিজস্ব প্রতিবেদক, ঘাটাইলডটকম)/-

136total visits,1visits today